খলীল, তার সঙ্গী ও হুমায়রা ঠিকানায় পৌঁছে গেছে। তারা কমান্ডারকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করে। কমান্ডার তাদেরকে লুকিয়ে ফেলেন এবং বলে দেন, বাইরের পরিস্থিতি অনুযায়ী তোমাদের জানানো হবে, তোমরা কবে এবং কখন এখান থেকে বেরিয়ে পড়বে।
এই কমান্ডারের উপর কারো সন্দেহ হবে না। কারণ, মানুষ তাকে একজন বিজ্ঞ আলেম ও বুজুর্গ ব্যক্তি বলেই জানে। যে দুজন শিষ্যকে তিনি সঙ্গে রেখেছেন, তারাও গোয়েন্দা। হাবের তথ্যাদি দামেকে এরাই পৌঁছিয়ে থাকে। তিনি বাইরের পরিস্থিতির উপর নজর রাখার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেন।
হুমায়রা কমান্ডারের সম্মুখে খলীলকে তার কাহিনী শোনায়—
তুমি যখন আমাকে আমার পিতা ও লোক দুজন থেকে রক্ষা করার জন্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলে, তখন আমার পিতা তোমার মাথায় কোদাল দ্বারা আঘাত হানে। আঘাতের ফলে সঙ্গে সঙ্গে তুমি মাটিতে পড়ে গিয়েছিলে। তারা তিনজন আমাকে ধরে নিয়ে একজন মৌলভী ডেকে আনে। মৌলভী সাহেব আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস না করে আমার বিবাহ পড়িয়ে দেন। তারপর লোক দুজন আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। তারা আমাকে এক রাত দামেস্কে রাখে। তারপর এমন একটি এলাকায় নিয়ে যায়, যেখানে খৃস্টানদের শাসন চলছে। তারা আমাকে নাচ-গানের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। আমি প্রথম প্রথম অমত পোষণ করি। ফলে আমার উপর এমন নির্যাতন চালানো হয় যে, আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। শুরু দিকে আমাকে উন্নত মানের খাবার দেয়া হত এবং অত্যন্ত সুস্বাদু এক প্রকার শরবত পান করাত, যার ক্রিয়ায় আমি হাসতে ও নাচতে শুরু করতাম।
তারা নির্যাতন ও নেশার ঘোরে আমাকে নর্তকী বানিয়ে নেয়। আমি উঁচুমানের লোকদের ভোগের বস্তুতে পরিণত হই। আমাকে জেরুজালেম নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওখানে দুব্যক্তি আমাকে দেখে আমার মালিককে বলল, মূল্য যা চাইবে, তা-ই দেব, মেয়েটাকে আমাদেরকে দিয়ে যাও। কিন্তু মালিক এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করে যে, আমরা একে গুপ্তচরবৃত্তি ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করে থাকি।
হুমায়রা জানায়– আমাকে বেশ কয়েকবার অপহরণ করারও চেষ্টা করা হয়েছে, যা ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে। এখন আমাকে এক আমীরের ফরমায়েশে হাবে তলব করা হয়েছে।
হুমায়রা জানায়, প্রথমদিন যখন আমি তোমাকে দেখি, তখন আমি নিশ্চিত বুঝেছিলাম যে, তুমি খলীল। কিন্তু পরক্ষণে মনে এই সন্দেহও জাগ্রত হয় যে, মানুষে মানুষে চেহারায় মিল থাকে। হয়ত তুমি দেখতে খলীলের মত অন্য কেউ। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি তোমাকে নিরীক্ষা করে দেখতে থাকি। তারপর তো নিশ্চিত হলাম তুমি খলীল ছাড়া আর কেউ নও।
হুমায়রা জানায়–
আমি নোংরা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। আমার চেতনা মরে গিয়েছিল। আমি একটি পাথরখণ্ডের ন্যায় এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতে থাকি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার চেতনা জীবিত হয়ে ওঠে। আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে, তুমি খলীল। কিন্তু তোমার গঠন-আকৃতি আমাকে সেই সময়টা স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন আমার হৃদয়ে তোমায় ভালবাসা ছিল এবং আমি তোমার সন্তানের মা হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে, সুযোগমত একসময় তোমাকে জিজ্ঞেস করব, তুমি কি খলীল? তুমি খলীল প্রমাণিত হলে তোমাকে বলব, চল আমরা পালিয়ে যাই এবং যাযাবরদের ন্যায় জীবন-যাপন করি।
হুমায়রা খলীলকে পেয়ে গেছে এবং তার সঙ্গে পালিয়ে এসেছে। কিন্তু হাল থেকে নিরাপদে বের হওয়া তাদের পক্ষে বিরাট এক সমস্যা।
***
খলীফার ভোজস এবং নাচ-গানের আসর লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ওখানে অপেক্ষা চলছিল উইন্ডসরের। কিন্তু পৌঁছে তার লাশ। খৃষ্টান সেনাবাহিনীর উর্ধতন যে অফিসার সভায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সবচে বেশি ক্ষুব্ধ হয় রেমন্ডের প্রতিনিধি।
উইন্ডসর অত্যন্ত চৌকস অফিসার ছিলেন। রেমন্ডের প্রতিনিধি আল মালিকুস সালিহ, তার আমীর ও সেনা কমান্ডারদের বকাঝকা শুরু করে দেয়। তার সম্মুখে নতশীরে চুপসে আছে সবাই। তাদের অন্তরে সালাহুদ্দীন আইউবীর শক্রতা ও ঘৃণা এত প্রবল যে, তারা খৃস্টান অফিসারদেরকে ফেরেশতা মনে করেন। তাদেরই সাহায্য-সহযোগিতায় তারা আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কাজেই তাদের তোষামোদ করা আবশ্যক। রেমন্ডের প্রতিনিধি যা-ই বলছে, তার সামনে তারা মাথানত করছে এবং জ্বি হ্যাঁ, জ্বি হ্যাঁ বলছে। রেমন্ডের প্রতিনিধি বলল
ঘাতকরা রাতারাতি শহর ত্যাগ করতে পারবে না। কাজেই ভোর থেকেই হাবের প্রতিটি ঘরে তল্লাশি চালানো হোক। এলাকার সমস্ত ফৌজকে এ কাজে লাগিয়ে দাও। মানুষ ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার আগেই ফৌজ ঘরে ঘরে ঢুকে পড়বে। এখানকার অধিবাসীদের অস্থির করে তুলতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই ঘাতকদেরকে আমাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়।
তা-ই হবে- এক মুসলমান আমীর বললেন- আমরা ফৌজকে এখনই নির্দেশ দিচ্ছি, যেন তারা রাতের আঁধারেই শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
না, এটা হতে পারে না- একজন মুসলমান কেল্লাদারের কণ্ঠ। তিনি হুংকার ছেড়ে আবার বললেন- না, এমন হতে পারে না। তল্লাশি শুধু সেই ঘরেই নেয়া হবে, যে ঘরে ঘাতকরা লুকিয়েছে বলে প্রবল সন্দেহ হবে এবং সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকবে।
কেল্লাদারের এ হুংকারে অকস্মাৎ উত্তপ্ত মজলিস ঠাণ্ডা হয়ে যায়। পিনপতন নীরবতা নেমে এলে হলরুমে। হঠাৎ চুপসে গেল প্রতাপান্বিত এতগুলো পদস্ত শাসক-কর্মকর্তা। এমন একটি জ্বলন্ত সত্য ভাষণ শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। রেমন্ডের সামরিক প্রতিনিধির নির্দেশকে কোন মুসলমান এত সাহসিকতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, তা সকলের কল্পনার বাইরে। মাথা উঁচু করে, চোখ বড় করে ও কপালে ভার্জ তুলে দেখার চেষ্টা করল, লোকটা কে।
