উইন্ডসরের ডেকে আনা মেয়েটি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পিছনে সরতে সরতে দেয়ালের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়ায়। খলীল ও তার সঙ্গী তাদেরকে ওখানেই কাবু করে ফেলে। খলীল নতুন নর্তকীকে উদ্দেশ করে বলল- তুমিও ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যাও। চিৎকার করলে শেষ করে ফেলব বলে দিলাম।
তুমি যদি খলীল হয়ে থাকে, তাহলে আমি হুমায়রা- নতুন নর্তকী বলল- আমি তোমাকে প্রথমদিনই চিনেছিলাম। আর তুমি আমাকে চিনতে চেষ্টা করছিলে।
খানিক আগে খলীল তার নাম ব্যতীত আর সব লক্ষণই বলে দিয়েছিল। হুমায়রা এখানে এসে অবধি খলীলকে অবলোকন করছিল। কিন্তু খলীলের মতো সেও সন্দেহে নিপতিত ছিল। সেও ভাবছিল, মানুষে মানুষে চেহারায় মিল থাকে, আমার ধারণা সঠিক নাও হতে পারে।
তুমিও কি গুপ্তচর- খলীল জিজ্ঞেস করে।
না- হুমায়রা জবাব দেয়- আমি শুধু নর্তকী। আমাকে সন্দেহ কর না খলীল। আমি তোমার সঙ্গে আছি এবং তোমার সঙ্গেই থাকব। যদি জীবন দিতে হয়, তোমার সঙ্গেই দেব।
***
ক্ষমতাচ্যুত খলীফা আল-মালিকুস সালিহ ভোজসভায় এসে পৌঁছান। এসে উপস্থিত হন তার সকল আমীর-উজীর ও আমন্ত্রিত অথিতিগণ। উপদেষ্টা হিসেবে আগত খৃস্টান সেনা অফিসারগণও আছেন মেহমানদের মধ্যে। তাদের চলন-বলনের ধরণ রাজা-বাদশার মতো। তাদের একজন হল রেমন্ডের সামরিক প্রতিনিধি। তারা সকলে উইন্ডসরকে তালাশ করছে। উইন্ডসর এখনো এসে পৌঁছাননি। এখানকার সকল খৃস্টান মেয়ে হলে এসে গেছে। আসেনি শুধু একজন। নর্তকীরাও সবাই এসেছে। আসেনি কেবল নতুনজন। আস-সালিহ এসে পৌঁছানোর পর সকলের অস্থিরতা বেড়ে গেছে। আর বিলম্ব সইছে না কারো। এক চাকরকে বলা হল, তুমি উইন্ডসর ও মেয়ে দুজনকে গিয়ে বল, সবাই এসে গেছেন, আপনাদের অপেক্ষা করছেন।
চল, হাত-পা বেঁধে এদেরকে এখানেই ফেলে রেখে আমরা পালিয়ে যাই। খলীলের বন্ধু বলল।
তুমি কি একটা বিষাক্ত সাপকে জীবিত রাখতে চাও? বলেই খলীল পূর্ব থেকে উইন্ডসরের ধমনী স্পর্শ করে রাখা বর্শাটা পূর্ণ শক্তিতে সেঁধিয়ে দেয়। উইন্ডসরের মাথাটা দেয়ালের সঙ্গে লাগা ছিল। বর্শার আগা তার ধমনী অতিক্রম করে পিছন দিকে বেরিয়ে যায়। উইন্ডসরের মুখ থেকে সামান্য একটু গোঙ্গানীর শব্দ বেরিয়ে আসে। পরক্ষণেই অনুরূপ একটি গড়গড় শব্দ বেরিয়ে আসে খৃস্টান মেয়েটির মুখ থেকেও। খলীলের বন্ধুও একই কায়দায় মেয়েটিকেও কাবু করে ফেলে।
বর্শা দুটো টেনে বের করে আনে তারা। উইন্ডসর ও মেয়েটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে থাকে। এবার খলীল ও তার সঙ্গী তাদের হৃদপিণ্ডের উপর বর্শা রেখে উপর থেকে সজোরে চাপ দেয়। ঠাণ্ডা হয়ে যায় দুজন। খলীল লাশ দুটিকে ঠেলে দেয় পালংকের নীচে।
কক্ষটা উইন্ডসরের। দেয়ালের সঙ্গে হেঙ্গারে তার চোগাটা ঝুলছিল। মাথা ঢাকার অংশটাও আছে সঙ্গে। হুমায়রা টান দিয়ে চোগাটি নিয়ে পরে ফেলে এবং মাথাটা ঢেকে নেয়। নিজের পোশাক খুলে দেহের নিম্নাংশে পুরুষের পোশাক পরিধান করে। পায়ের মোজা পরিবর্তন করে ফেলে এবং মুখটা ঢেকে নেয়। এখন এক নজরে কারো বুঝবার উপায় নেই যে, সে একজন মহিলা।
খলীল দরজা খুলে বাইরে তাকায়। বারান্দায় চাকর-বাকরদের আসা-যাওয়া ও দৌড়-ঝাঁপ চলছে।
তারা তিনজন বাইরে বেরিয়ে পড়ে। দরজাটা বাহির থেকে বন্ধ করে একদিকে হাঁটা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে তারা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
খলীল ও তার সঙ্গীর জানা আছে, তাদের কোথায় যেতে হবে। বুজুর্গ আলেমের বেশে তাদের কমান্ডার যেখানে অবস্থান করছেন, সেখানে লুকাবার জায়গাও আছে। ওখান থেকে পালাবার ব্যবস্থাও আছে। এ সময়ে শহর থেকে বের হওয়া নিরাপদ নয়। সঙ্গে ঘোড়াও নেই। হাল্ব থেকে পালিয়ে তাদের দামেস্কে পৌঁছতে হবে। খুনের ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর শহরে কী তোলপাড় শুরু হবে, সেই আন্দাজও তাদের আছে।
উইন্ডসরের খুনের ঘটনা জানাজানি হতে বেশী বিলম্ব হল না। একব্যক্তি উইন্ডসরের কক্ষের দরজা খুলেই চীৎকার করে ওঠে। পালংকের নীচ থেকে রক্ত বেয়ে বেয়ে দুরজা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রাসাদময় হুলস্থল শুরু হয়ে যায়। একটি নয়- দুটি লাশ! জখম দুজনের একই ধরনের!
কর্মকর্তারা ছুটে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রহরীদের কথা মনে পড়ে যায়। তাদের উপস্থিতিতে একসঙ্গে দুটি খুন কিভাবে হতে পারে? কর্তব্যরত সান্ত্রীদের তলব করা হয়। কিন্তু দুজনই উধাও। এই ভবনে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ। শাসক কিংবা গণ্যমান্য নাগরিক ছাড়া কেউ এই প্রাসাদে ঢুকতে পারে না। তাদেরকেও চেক করে ঢুকতে দেয়া হয়। রক্ষী কমান্ডারের উপর বিপদ নেমে এল। এই দুর্ঘটনার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
এই হত্যাকাণ্ড কাদের কাজ? পেশাদার ঘাতকদের, নাকি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচরদের ফেদায়ী ঘাতকদেরও হতে পারে। এই ভাড়াটিয়া ঘাতকরা অর্থের বিনিময়ে যে কাউকে খুন করতে পারে।
কর্তব্যরত প্রহরীদেরকে খুঁজে না পাওয়ায় সন্দেহ আরো ঘনীভূত হল যে, এটা সুলতান আইউবীর কাজ এবং পলাতক প্রহরীরা তারই লোক। গভীর রাত অবধি খলীল ও তার সঙ্গীকে না পেয়ে শহরে তাদের অনুসন্ধান শুরু হয়ে যায়। নতুন নর্তকী যে নেই, সে তথ্য ফাঁস হয় অনেক পরে। শহর সীল করে দেয়া হয়।
