এখন সেই কাফেলার একজন পুরুষ ও একটি মেয়ে তার সামনে দন্ডায়মান। খলীল ও তার সঙ্গী তাদের কয়েদী। তবে খলীল অন্ত্রত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়। হয়ত তাকে এখান থেকে পালাতে হবে কিংবা জীবন ত্যাগ করতে হবে।
তোমরা আমার একটা প্রস্তাব মেনে নাও- উইন্ডসর বললেন- আমি তোমাদের উপর এমন দয়া করব, যেমনটি পূর্বে কখনও কারো উপর করিনি। তোমরা উভয়ে আমার দলে শামিল হয়ে যাও। বেতন-ভাতা যা চাইবে, তা-ই দেব। বললে দামেস্কে পাঠিয়ে দেব। যদি কায়রো পাঠাতে বল, তাতেও আপত্তি করব না। সেখানে গিয়ে তোমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর লোক হয়ে থাকবে; কিন্তু কাজ করবে আমাদের। তোমাদের দায়িত্ব হবে, ওখানে আমাদের যেসব গোয়েন্দা কাজ করছে, তাদের সাহায্য করা। ধরা পড়ার উপক্রম হলে তোমরা কয়ের আগে তাদেরকে সতর্ক করে ঠিকানা থেকে সরিয়ে দেবে।
উইন্ডসর বলেই যাচ্ছেন আর খলীল ও তার সঙ্গী চুপচাপ শুনছে। তার রণা ছিল, এরা তার প্রস্তাব মেনে নেবে। তিনি বললেন, তবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয়ার আগে একটি শর্ত পালন করতে হবে। তাহল, এখানে তোমাদের যত গোয়েন্দা আছে, তাদেরকে ধরিয়ে দেবে এবং বলে দেবে তারা কে কোথায় আছে।
আপনার প্রস্তাবের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই- খলীল বলল- আর এখানে কারো গোয়েন্দা আছে কিনা, তাও আমার জানা নেই।
তোমরা সম্ভবত বুঝতে পারছ না, আমি তোমাদের কী দশা ঘটাব উইন্ডসর বললেন- তোমরা যদি এই আশা করে থাক যে, আমি হুট করে তোমাদেরকে খুন করে ফেলব, তাহলে তোমাদের সেই বাসনা পূরণ হবে না। যে জাহান্নামে আমি তোমাদেরকে নিক্ষেপ করব, সেখান থেকে অত তাড়াতাড়ি তোমরা মুক্তি পাবে না।
উইন্ডসর মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললেন- তোমরা কি আশা কর যে, আমি মেনে নেব তোমরা গোয়েন্দা নও তোমরা কি ভাবছ, আমি এখনো দ্বিধার মধ্যে আছি। তোমাদের অত জ্ঞান নেই যে, তোমরা আমাদের ধোকা দিতে পারবে। তাই যদি হত, তাহলে দুটা মেয়ের হাতে তোমরা বোকা সাজতে। তারা তোমাদেরকে তাদের যৌবন ও রূপের জালে আটকে ফেলেছিল।
শোন আমার খৃস্টান বন্ধু-কণ্ঠস্বর দৃঢ় ও কঠিন রূপ ধারণ করল খলীলের আমরা দুজন গোয়েন্দা। তবে এটা ভুল যে, আমি কিংবা আমার এই বন্ধু সেদিন তোমার মেয়েদের রূপের ফাঁদে আটকেছিলাম। আমি পাথর। কিন্তু আমার মধ্যে একটা দুর্বলতা আছে। বেশ কবছর আগে পনের-ষোল বছর বয়সের একটি মেয়ে আমার চোখের সামনে বিক্রি হয়েছিল। আমি তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলাম। এক ব্যক্তির হাত থেকে তরবারী ছিনিয়ে নিয়েছিলাম। একজনকে জখমও করেছিলাম। তারা ছিল তিনজন আর আমি একা। তারা আমাকে কাবু করে ফেলে। সেদিন যদি আমি অজ্ঞান না হয়ে পড়তাম, তাহলে মেয়েটাকে বাঁচাতে পারতাম। তারা মেয়েটাকে নিয়ে গেল। মানুষ আমাকে অচেতন অবস্থায় তুলে আমার ঘরে নিয়ে যায়।
তোমার বাড়ী কোথায়? উইন্ডসই জিজ্ঞেস করেন।
আমি কিছুই গোপন করব না। দামেস্কের সন্নিকটে একটি গ্রাম আছে। আমি সেখানকার বাসিন্দা। আর আমার এই বন্ধুর বাড়ী বাগদাদে। এসব কথা এত খোলামেলাভাবে আমি তোমার ভয়ে বলছি না। তুমি আমাকে এত সহজে পাকড়াও করতে পারবে না। সাহস থাকে তো আমার হাত থেকে বশীগুলো কেড়ে নাও। তুমি যে চুলার কথা উল্লেখ করেছ, সেখানে নিক্ষিপ্ত হলে আমার লাশ নিক্ষিপ্ত হবে।
খলীলের বক্তব্য শুনে উইন্ডসর অবজ্ঞার হাসি হাসলেন। পার্শ্ব থেকে খৃস্টান মেয়েটি হেসে বলল- এই আত্মবিশ্বাসই তোমাদের জীবনের অবসান ঘটাবে। নতুন নর্তকী খলীলের মুখপানে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আমি বলছিলাম, আমি ঐ মেয়েটাকে রক্ষা করতে পারিনি- তার স্মৃতি কাঁটা হয়ে আমার হৃদয়ে বিদ্ধ হয়ে আছে। সেই রাতে যখন আমরা দুজন তোমাদের কাফেলার সঙ্গে ছিলাম, তখন তোমার মেয়ে দুটো আমাকে বলেছিল, তাদেরকে বিক্রি করার জন্য অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন সেই মেয়েটির মুখাবয়ব আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে, আমি যাকে রক্ষা করতে পারিনি। আমি তোমার মেয়ে দুটোর চেহারায় সেই মেয়েটির নিষ্পপ চেহারা দেখতে পেয়েছি। আমার হৃদয়ে বিদ্ধ হয়ে থাকা কাঁটা আমার বিবেকের উপর পর্দা ফেলে দেয়। তখন যদি আমার সেই মেয়েটির কথা মনে না পড়ত, তাহলে তোমার মেয়েরা কক্ষনো আমাকে বোকা বানাতে পারত না।
নতুন নর্তকীর দেহ সজোরে একটা ঝাকুনী দিয়ে ওঠে। একটু পেছনে সরে গিয়ে সে পালংকের উপর ধপাস করে বসে পড়ে। চেহারাটা বিবর্ণ হয়ে যায়।
আর এখন তো মৃত্যুও আমাকে বোকা বানাতে পারবে না- খলীল বলল আর তোমার কোন প্রলোভনই আমাকে আমার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
ভোজসভার হলরুমে আগত মেহমানরা উইন্ডসরের অপেক্ষা করছে। তাদের অধীর অপেক্ষা নতুন নর্তকীর জন্য। হলরুমের দরজার বাইরে যে দুজন সান্ত্রী দন্ডায়মান ছিল, তারা এখন কোথায়, সে খবর কেউ জানে না।
বর্শা ও তরবারী এখনো খলীল ও তার সঙ্গীর সঙ্গেই আছে। উইন্ডসর যখন দেখলেন, আসামীরা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারা ঈমান ও কর্তব্যবোধে অটল, তখন তিনি বললেন- ঠিক আছে, তোমাদের অস্ত্রগুলো আমার হাতে দিয়ে দাও।
খলীল ও তার বন্ধু তাও স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে। উইন্ডসর জোরপূর্বক অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়ার জন্য উদ্যত হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যান। সম্ভবত তিনি তার দেহরক্ষীদের ডাকতে যাচ্ছিলেন। খলীল দ্রুত ছুটে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয় এবং বর্শার আগাটা উইন্ডসরের দিকে তাক করে কঠোর ভাষায় বলে উঠে যেখানে আহু, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাক; এক চুলও নড়বে না বলে দিলাম। খলীল আরো সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে বর্শার আগাটা উইন্ডসরের ধমনীর উপর স্থাপন করে। খলীলের সঙ্গীও তৎপর হয়ে ওঠে। সেও তার বর্শার আগা উইন্ডসরের ধমনীতে স্থাপন করে।
