তারা না ঘুমিয়ে জাগ্রত থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কাফেলার লোকেরা আহরাদি সেরে শুয়ে পড়ে।
ইতিমধ্যে কাফেলার দুটি মেয়ে চুপিচুপি তাদের নিকট এমনভাবে চলে আসে, যেন তারা সঙ্গীদের ফাঁকি দিয়ে এসেছে। তারা অত্র এলাকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। তারা খলীল ও তার সঙ্গীকে বলল, আমরা যদি তোমাদেরকে একটি রহস্য জানিয়ে দেই, তাহলে কি তোমরা আমাদেরকে সাহায্য করবে?
রহস্য শব্দটা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচরদের চমকে দেয়। তাদের কাজই তো রহস্য উদঘাটন করা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানো এবং বিশেষ করে এই কাফেলায় যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যই তো রহস্য জানা।
মেয়েরা বলল, কাফেলার লোকগুলো অপহরনকারী। আমরা যে চারটি মেয়ে আছি, আমাদেরকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, আমরা জানি না। মেয়েরা আরো জানায়, আমরা মুসলমান এবং এদের থেকে মুক্ত হতে চাই।
কথায় কথায় এক মেয়ে খলীলকে সরিয়ে নিয়ে যায়। মেয়েটির কথাবার্তায় সরলতা আছে, আকর্ষণও আছে। সে খলীলকে বলল, তুমি যদি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও, তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করব এবং সারাজীবন তোমার সেবা করব। মেয়েটি আরো এমন কিছু কথা বলল, যার ফলে খলীল তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। মেয়েটা খলীলের প্রতি তার ভালবাসা ও নিজের অসহায়ত্বের কথা এমনভাবে প্রকাশ করে যে, খলীল তার ও অন্যান্য মেয়েদেরকে কিভাবে মুক্ত করা যায় ভাবতে শুরু করে।
অপর মেয়ে খলীলের সঙ্গীর সঙ্গে আলাদা ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে এবং এ ধারায়ই কথা বলছে। একজন নারীর স্রেফ নারী হওয়াই একটা শক্তি। সেই নারী যখন হয় রূপসী-যুবতী এবং বিপদগ্রস্ত, তখন একজন পুরুষ না গলে পারে না। সে অবস্থায়ই হয়েছে খলীল ও তার সঙ্গীর। দুজনই যৌবনদীপ্ত যুবক। তাছাড়া একজন নারী- সে যে-ই হোক- বিপদে পড়লে সাহায্য করা তাদের সামরিক নীতির অংশ।
মেয়েরা আলাদাভাবে দুই মিশরী গুপ্তচরকে খুশী করার জন্য অত্যন্ত সুস্বাদু কি যেন খেতে দেয়। এক মেয়ে উঠে পা টিপে টিপে তাঁবুতে যায় এবং ছোট একটি মশক হাতে নিয়ে ফিরে আসে। মশক থেকে শরবত ধরনের পানীয় ঢেলে দুজনকে খাওয়ায়। অত্যন্ত সুস্বাদু শরবত। তৃপ্তি সহকারে পান করে খলীল ও তার সঙ্গী।
অল্পক্ষণ পরই দুজনের চোখের পাতা বুজে আসে। তারা ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন যখন তাদের চোখ খুলে, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবি ডুবি করছে। সারা রাত ও সারাটা দিন ঘুমিয়ে থাকে তারা। মরুভূমির বালুকা প্রান্তরের ঝলসানো রোদও তাদেরকে জাগাতে পারেনি। সন্ধ্যাবেলা যখন তারা চোখ মেলে তাকায়, তখন কাফেলাও নেই, তাদের উটও নেই। আর তারাও সেই জায়গায় নেই, যেখানে ঘুমিয়েছিল। এ অন্য এক স্থান, যার আশপাশে মাটি ও বালির টিলা।
খলীল ও তার সঙ্গী ধড়মড় করে উঠে একটি উঁচু টিলার উপর চড়ে এদিক ওদিক তাকায়। তারা চারদিকে সারি সারি টিলার চূড়া আর দূরদিগন্তে মরুভূমির বালু ছাড়া আর কিছুই দেখছে না।
***
সেই বৃদ্ধ লোকটা আমি ছিলাম, সফরের সময় তুমি যার সঙ্গে কথা বলছিলে, রেমন্ডের গোয়েন্দা কমান্ডার বললেন- আমি তোমার কথাবার্তায় বুঝে ফেলেছিলাম, তুমি গোয়েন্দা এবং জানতে চাচ্ছ আমরা কারা এবং কোথায় যাচ্ছি।
না, সে লোকটি তুমি নও- খলীল বলল- সে তো বৃদ্ধ ছিল।
ওটা ছিল আমার ছদ্মবেশ- উইন্ডসর বলল- যা হোক আমি খুশি হলাম যে, তুমি মেনে নিয়েছ, তোমরা গুপ্তচর ছিলে এবং এখনও তা-ই আছ। আরো শুন, যে দুটি মেয়ে তোমাদেরকে অজ্ঞান করেছিল, এ হল তাদের একজন।
এখন আমরা গুপ্তচর নই- খলীল বলল- আমরা এখন খলীফার, অনুগত সৈনিক।
তুমি বকওয়াস করছ- উইন্ডসর বললেন- আমি সব সময় আলী বিন সুফিয়ানের প্রশংসা করে থাকি। কিন্তু তোমাদের প্রশিক্ষণ তো অসম্পূর্ণ। তোমরা এখনো পরিচয় গোপন করা ও গঠন-আকৃতি পরিবর্তন করা শেখনি।
উইন্ডসর খলীল ও তার সঙ্গীকে জানায় আমরা সামরিক সরঞ্জাম ও প্রচুর নগদ অর্থ নিয়ে সিরিয়া যাচ্ছিলাম। কাফেলার মরুবাসী বেশের লোকগুলো ছিল সামরিক উপদেষ্টা। তারা ছিল খৃস্টান। সুদান যাচ্ছিল। তারাই সুদানী ফৌজ গঠন করে এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই তকিউদ্দীনকে এমন শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে যে, সে অর্ধেক ফৌজ সুদান ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি বিচক্ষণতার পরিচয় না দিতেন, তাহলে তকিউদ্দীনের অবশিষ্ট ফৌজও সুদান থেকে বেরিয়ে আসতে পারত না। ঐ মেয়েগুলোও সেই যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
উইন্ডসর আরো জানায়, সেদিন মিশরের উত্তরাঞ্চলে যখন খলীলদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেদিন ছাউনীতে অবস্থান করার সময় তাদের একজন লোকও ঘুমায়নি এবং তাদেরকে কথা ও নারী দেহের ফাঁদে ফেলে অজ্ঞান করার জন্য মেয়ে দুটোকে প্রেরণ করা হয়েছিল। তাদের কৌশল সফল হয় এবং খলীল ও তার সঙ্গীকে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রেখে কাফেলা রওনা হয়ে যায়।
ঘটনাটা খলীলের ভালভাবেই মনে আছে এবং অন্তরে কাঁটার ন্যায় বিদ্ধ হয়ে আছে। এমন একটি ভয়ংকর গোয়েন্দা দলের কাফেলা তার হাত থেকে ছুটে গেল! তার গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয় আরেকটি ঘটেনি। খলীল তার হেডকোয়ার্টারে এ ঘটনার রিপোের্টই করেনি। কারণ, প্রতিপক্ষের গোয়েন্দারা তাকে ধোকা দিয়ে কাবু করে ফেলেছিল। এটা তার ও তার সঙ্গীর এমন একটা অপমান, যা কাউকে বলা যায় না।
