তোমরা প্রহরী নও- উইন্ডসর বললেন- তোমাদের দুজনকে ওখানে দাঁড় করিয়ে রাখার চেয়ে বরং ভাল, ওখানে কেউ না দাঁড়াক। ওখানে তোমাদের কোন প্রয়োজন নেই। তিনি খলীলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, এখানে এসে বেশ-ভূষা পরিবর্তন করে নিলে না কেন? সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ান চরবৃত্তিতে দক্ষ বটে, কিন্তু আমরাও আনাড়ী নই। নিজেদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দিও না। ভালোয় ভালোয় বলে ফেল, আমরা মিশর থেকে আসা গুপ্তচর। তোমাদের সঙ্গে আমার ও এই মেয়েটির সাক্ষাৎ আগেও হয়েছিল। তোমরা আমাকে চিনতে পারনি। কারণ, আমি তখন ছদ্মবেশে ছিলাম। কিন্তু আমি তোমাদের চিনে ফেলেছি। কেননা, এখনও তোমরা সেই বেশেই আছ, যে বেশে আড়াই বছর আগে ওখানে ছিলে। একটু চিন্তা কর; স্মরণ এসে যাবে। তোমরা দুজন মিশরের উত্তরে একটি কাফেলায় ঢুকে গিয়েছিলে। কাফেলাটার প্রতি তোমাদের সন্দেহ ছিল। সেই কাফেলার সঙ্গে তোমরা একটি রাত কাটিয়েছিলে। কিন্তু তোমাদের দুর্ভাগ্য, যখন তোমরা চোখ খুললে, তখন মরুভূমিতে সংজ্ঞাহীন পড়ে ছিলে। কাফেলা ততক্ষণে বহুদূরে চলে গিয়েছিল।
খলীল ও তার সঙ্গীকে পরিচয়ের সূত্রটা স্মরণ করিয়ে দেন উইন্ডসর।
***
আড়াই থেকে তিন বছর আগের কথা। খলীল ও তার সঙ্গী তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ছিল। সুদানীরা সুলতান আইউবীর হাতে পরাজয়বরণ করেছিল ঠিক, কিন্তু খৃস্টানদের সহযোগিতায় মিশর আক্রমণ পরিকল্পনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তারা। মিসরের অভ্যন্তরে খৃস্টান গুপ্তচর ও নাশকতাকারীরা তৎপর। তাদেরই খুঁজে বের করার জন্য আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছিল। সীমান্তে টহল বাহিনী নিয়োজিত ছিল। মিসরের গোয়েন্দারা মুসাফির ইত্যাদির বেশে সীমান্ত এলাকাগুলোতে ঘোরাফেরা করছিল।
একদিন খলীল ও তার এই সঙ্গী মিশরের উত্তরাঞ্চলীয় এক এলাকায় ঘোরাফেরা করছিল। দুজনই উটের উপর সওয়ার। দীনহীন মরু মুসাফিরের বেশ তাদের। এমন সময়ে তারা একটি কাফেলা দেখতে পায়, যাতে অনেকগুলো উট ও দুটি ঘোড়া ছিল। কাফেলায় যুবক-বৃদ্ধ-নারী-শিশু সব বয়সের লোকই ছিল।
খলীল ও তার সঙ্গী গোয়েন্দা। তারা কাফেলা থামিয়ে তদন্ত করতে পারে না। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা গমনাগমনকারী কাফেলার প্রতি নজর রাখবে এবং সামান্যতম সন্দেহ হলে নিকটবর্তী সীমান্ত চৌকিতে সংবাদ দেবে। বাহিনী সামরিক শক্তির বলে এ কাজ আঞ্জাম দেবে। এতে বিপুলসংখ্যক লোকের কাফেলার গতিরোধ করে তল্লাশি চালানো দুজন গোয়েন্দার পক্ষে সম্ভব নয়।
খলীল ও তার সঙ্গী কাফেলার সঙ্গে এসে ভীড়ে। পরিচয় দেয়, আমরা সাফির এবং সামনে যাব। কাফেলার লোকেরা খলীল ও তার সঙ্গীকে তাদের লে নিয়ে নেয়।
খলীল ও তার সঙ্গী গল্প-গুজব ও কথোপকথনের মধ্যদিয়ে জানার চেষ্টা করে, কাফেলা কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাচ্ছে। সামনের সীমান্ত চৌকিটা কোথায়, তা তাদের জানা আছে। কিন্তু তারা দেখতে পেল, কাফেলা সেই পথ এড়িয়ে এমন এক পথ ধরেছে, যে পথে কোন চৌকি নেই। অঞ্চলটাই এমন যে, সেনা টহল চৌকি এড়িয়ে পথচলা সম্ভব। কাফেলার উটপালের পিঠে যে মালামাল বোঝাই করা আছে, তাও সন্দেহজনক মনে হল। এই বিশাল বিশাল মটকা ও পেচিয়ে রাখা তাঁবুর মধ্যে কী আছে কে জানে। মালামালও অনেক।
খলীল ও তার সঙ্গী মরু যাযাবর সেজে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করছে। কাফেলায় চারটি যুবতী মেয়েও আছে। পোশাক-পরিচ্ছদে তারা যাযাবরই নয়- রীতিমত বেদুঈনের মত। মাথার চুলের ধরণ-কাটিংও প্রমাণ করছে, সভ্যতা-ভদ্রতার ছোঁয়া তাদের গা স্পর্শ করেনি। কিন্তু তাদের মুখাবয়ব, চোখের চাহনি ও শারীরিক গঠন-আকৃতি প্রমাণ করছে, আসলে ব্যাপার অন্যকিছু এবং এটা তাদের ছদ্মবেশ।
কাফেলায় একজন বৃদ্ধ লোক আছে। তার গায়ের রং গৌর। মুখে বসন্তের দাগ। কিন্তু তার দাঁত বলছে, তার বয়স এত বেশী নয়, যতটা চেহারা দেখে মনে হচ্ছে।
এই বৃদ্ধ খলীল ও তার সঙ্গীকে নিজের সঙ্গে নিয়ে নেয় এবং অত্যন্ত মেহের সাথে জিজ্ঞেস করতে শুরু করে, তোমরা কোথা থেকে এসেছ এবং কোথায় যাচ্ছ
খলীল নিজের আসল পরিচয় না দিয়ে উল্টো জানতে চাচ্ছে, কাফেলা কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে এবং এই মালপত্রগুলো কী?
বৃদ্ধ এত হৃদয়গ্রাহী মজার মজার কথা বলতে শুরু করে যে, খলীল ও তার সঙ্গী সুযোগ পায়নি তথ্য নেয়ার।
চলতে চলতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তারপর গভীর রাত। কাফেলা চলতে থাকে। খলীল বৃদ্ধকে কাফেলার গতিপথ পরিবর্তন করার পরামর্শ দিয়ে বলল, এই পথে চলুন, তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছা যাবে। সে চেষ্টা করছে কাফেলাটি সেনা চৌকির নিকট দিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা। খলীল স্পষ্ট বুঝতে পারছে, কাফেলা সেনা চৌকি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।
খলীলের সন্দেহ পাকাপোক্ত হতে চলেছে। আমরা একটু সামনে অগ্রসর হওয়ার পর ছাউনি ফেলার উপযোগী স্থান পাওয়া যায়। কাফেলা থেমে যায়। রাত যাপনের জন্য তাঁবু খাটায়।
খলীল ও তার সঙ্গী কাফেলা থেকে খানিক দূরে সরে গিয়ে একস্থানে বসে পরামর্শ করে, কী করা যায়। দুটি পন্থা অবলম্বন করা যায়। প্রথমত, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কাফেলার মালপত্রের তল্লাশী নেয়া যায়। দ্বিতীয়ত, দুজনের একজন চুপিচুপি এখান থেকে বেরিয়ে যাবে এবং নিকটবর্তী চৌকিতে গিয়ে সংবাদ দেবে। কিন্তু দ্বিতীয় পন্থায় আশংকা আছে। তাতে কাফেলার লোকদের মনে সন্দেহ জাগবে এবং অপরজনকে হত্যা কিংবা অপহরণ করে দ্রুতগতিতে স্থান ত্যাগ করে কেটে পড়বে।
