আজ রাতেই ভোজসভা। রেমন্ডের গোয়েন্দা বাহিনীর কমান্ডার দিন চারেক আগে এখানে এসে পৌঁছেছে। তার নাম উইন্ডসর। তারই সম্মানে এই ভোজসভার আয়োজন। উইন্ডসর একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচর। হাবের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে সুসংহত করার লক্ষ্যেই তার আগমন।
সূর্য ডুবে গেছে। সাজের আঁধারে ছেয়ে গেছে চারদিক। মেহমানরা আসছেন। আয়োজন চলছে। চলছে মদপানের ধারা। প্রধান অতিথি উইন্ডসর এখনো আসেননি। খলীল ও তার সঙ্গীর ডিউটি হলরুমের দরজায়।
কিছুক্ষণ পর উইন্ডসর এসে পৌঁছান। হলরুমের দরজা পর্যন্ত এসেই থমকে দাঁড়ান তিনি। গভীর দৃষ্টিতে তাকান প্রহরীদ্বয়ের প্রতি। তারপর খলীলের চেহারায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন।
তুমি খলীফার রক্ষীবাহিনীতে কবে ঢুকেছ? উইন্ডসর খলীলকে জিজ্ঞেস করেন। তার কণ্ঠে গাম্ভীর্য।
এখানে আসার পরই আমাকে রক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়খলীল জবাব দেয়। তার আগে আমি দামেস্কের সেনাবাহিনীতে ছিলাম।
তুমি কি মিশর গিয়েছিলে? উইন্ডসর জিজ্ঞেস করেন।
না। খলীল জবাব দেয়।
উইন্ডসর খলীলকে অপর প্রহরী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে- তুমি একে কখন থেকে জান?
আমরা দুজন দামেস্কের বাহিনীতে একসঙ্গে ছিলাম- খলীল জবাব দেয় আমরা উভয়ে উভয়কে ভালভাবেই জানি।
আর আমি সম্ভবত তোমাদের দুজনকেই ভালভাবে চিনি- উইন্ডসর মুচকি হেসে বললেন- একটু আমার সঙ্গে এস।
খলীল ও তার সঙ্গীকে প্রহরা থেকে সরিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে যান উইন্ড। লোকটা অত্যন্ত ঘাঘু ও বিচক্ষণ গোয়েন্দা। এখানে এসে পৌঁছেই তিনি গোপনে গোপনে দেহরক্ষীদের বিশ্বস্ততা যাচাই-বাচাই শুরু করে দেন। খলীলকে দেখামাত্র তার কিছু একটা মনে পড়ে যায়। মনে সন্দেহ জেগে ওঠে। পরক্ষণে খলীলের সঙ্গীকে দেখার পর তার সন্দেহ পোক্ত হয়ে যায়।
উইন্ডসর-এর সন্দেহ অমূলক নয়। খলীল ও তার সঙ্গী তিন-চার বছর যাবত সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা বিভাগে এক সঙ্গে কাজ করেছিল।
উইন্ডসর খলীল ও তার সঙ্গীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যান। এই ভবনেরই বড় রুমটির সামান্য দূরের রুমটিই উইন্ডসরের কক্ষ। কক্ষে প্রবেশ করে তিনি রাতের আলোতে তাদেরকে পুনরায় গভীরভাবে নিরীক্ষা করে দেখেন।
আমাকে যদি প্রমাণ দিতে পার যে, তোমরা এখানকার অফাদার এবং সালাহুদ্দীন আইউবী তোমাদের দুশমন, তাহলে আমি তোমাদেরকে শুধু ছেড়েই দেব না, বরং এমন পদে চাকুরী দেব যে, তোমাদের ভাগ্য ফিরে যাবে। উইন্ডসর বললেন- কিন্তু মিথ্যা বললে পরে অনুতাপ করতে হবে।
আমরা এখানকারই অফাদার। খলীল জবাব দেয়।
তোমরা অফাদারী কখন থেকে পরিবর্তন করেছ?- উইন্ডসর জিজ্ঞেস করে এবং কেন করেছ?
আল্লাহ ও রাসূলের পরই খলীফার মর্যাদা- খলীল বলল- সালাহুদ্দীন আইউবীর কোন মর্যাদা নেই। তিনি খলীফা নন।
মিশর থেকে কবে এসেছ? উইন্ডসর জিজ্ঞেস করেন এবং জবাবের অপেক্ষা না করেই বললেন, তোমরা বোধ হয় আমাকে চেন না। আমি তোমাদেরই ন্যায় একজন গুপ্তচর। আমি যাকে একবার দেখি, নাম ভুলে যেতে পারি- চেহারা ভুলি না। আলী বিন সুফিয়ান কোথায়? মিসরে না দামেস্কো
আপনি কার কথা বলছেন? আমরা তো এই নামের কাউকে চিনি না–খলীলের সঙ্গী বলল- আমরা সাধারণ সিপাহী মাত্র।
উইন্ডসর বসা থেকে উঠে দাঁড়ান। দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে এদিক অদিক তাকিয়ে একজন চাকে ডাক দেন। চাকর আসলে তিনি একটি মেয়ের নাম উল্লেখ করে তাকে ডেকে আনতে বললেন।
মেয়েটি পাশেরই একটি কক্ষে ছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই অতিশয় রূপসী একটি মেয়ে এসে কক্ষে প্রবেশ করে। খলীল জানে, এই মেয়েটি খৃষ্টান। তার সঙ্গে সেই নর্তকীও আসে, যাকে দেখলে খলীলের হুমায়রার কথা মনে পড়ে।
উইন্ডসর খৃস্টান মেয়েটির সঙ্গে আরবীতে কথা বলেন। তাকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন, বাইজীটাকে সঙ্গে এনেছ কেন?
মেয়েটি জবাব দেয়, না, মানে ও প্রস্তুত হয়ে আমার কক্ষে এসে গিয়েছিল আর আমিও প্রস্তুত হচ্ছিলাম। এর মধ্যে আপনার ডাক পেয়ে মনে করলাম, ভোজসভায় আপনার সঙ্গে যেতে হবে তাই ডাকছেন। তাই আমি একেও সঙ্গে করে নিয়ে আসলাম।
ঠিক আছে, অসুবিধা নেই- উইন্ডসর বললেন- এসেছে যখন তামাশা দেখতে পাবে।
উইন্ডসর খৃস্টান মেয়েটিকে বললেন, আমি তোমাকে অন্য এক কাজের জন্য ডেকেছি- তিনি প্রহরীদ্বয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে মেয়েটিকে বললেন- এদের প্রতি ভালভাবে তাকাও, দেখ তো কিছু মনে পড়ে কিনা?
মেয়েটি খলীল ও তার সঙ্গীর প্রতি গভীর দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে অনেকক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা করে। মাথা তুলে আবার দুজনের মুখাবয়বে চোখ বুলায়। এবার তার ঠোঁটে মুচকি হাসির আভা ফুটে ওঠে। সে খলীল ও তার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করে- তোমাদের জ্ঞান ফিরে এসেছিল কখন?
খলীল ও তার সঙ্গী পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। তারপর মেয়েটির দিকে দৃষ্টিপাত করে। খলীল, উপস্থিত জ্ঞানের অধিকারী মানুষ। সে বুঝে ফেলে, এরা আমাদের চিনে ফেলেছে। কিভাবে বাঁচা যায় পন্থা খুঁজতে শুরু করে সে। এরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয় হুঁশ-জ্ঞান ঠিক রেখে বুদ্ধিমত্ত্বা দিয়ে। মুহূর্তে হাবা বনে যায় খলীল, যেন সে কিছুই বুঝতে পারছে না–আমাদের বুঝে আসছে না, আপনারা পাহারাদারী থেকে সরিয়ে এনে আমাদের সঙ্গে কেন মস্কারা করছেন। কমান্ডার দেখে ফেললে তো আমাদেরকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
