খলীলকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অশ্বচালনা, তীরন্দাজি ও অন্যান্য অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ নেয়। একটা ব্যস্ততা পেয়ে যায় খলীল। এবার হুমায়রার ভাবনা ধীরে ধীরে কেটে যেতে শুরু করে তার মাথা থেকে। স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায় সে। খলীল পুনরায় একজন কর্মতৎপর যুবকে পরিণত হয়।
এ সেই সময়কার কথা, যখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী প্রসিদ্ধি লাভ করেননি। মানুষ তখনো শুধু নুরুদ্দীন জঙ্গীকেই চিনে। সুলতান আইউবী এ পর্যন্ত একবার রণাঙ্গনে হাজির হয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করতে পেরেছেন মাত্র। সেটি ছিল এক রক্ষক্ষয়ী লড়াই। তিনি এই প্রথমবার দুশমনকে চোখে দেখেছেন। তিনি খৃস্টানদের নির্যাতনের শিকার লুষ্ঠিত একটি পরিবারের করুণ দৃশ্য দেখলেন। তিনি জানতে পারলেন, খৃস্টানরা বহু মুসলিম যুবতী মেয়েকে তাদের হাতে কজা করে রেখেছে। এসব দেখে-শুনে তার ভেতরে জাতীয় চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধ জেগে উঠে। সেই চেতনা ও বোধ-বিশ্বাস তাঁকে সেই সৈনিকদের সারিতে নিয়ে দাঁড় করায়, যারা বেতন-ভাতা ও গনীমতের জন্য নয়- আল্লাহর নামে লড়াই করে ও জীবন কুরবান করে।
তিন-চার বছর পর সালাহুদ্দীন আইউবীকে মিসরের গভর্নর নিযুক্ত করে কায়রো প্রেরণ করা হয়। খৃস্টানরা সুদানীদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে সমুদ্রের দিক থেকে মিসরের উপর হামলা চালালে সুলতান আইউবী নুরুদ্দীন জঙ্গীর নিকট সাহায্যের আবেদন জানান। নুরুদ্দীন জঙ্গী তাঁর একটি বিশেষ বাহিনীকে কায়রো পাঠিয়ে দেন। খলীল ছিল সেই বাহিনীর একজন সদস্য। খলীল সেই বিচক্ষণ সৈনিকদের একজন, যারা তরবারীর পাশাপাশি বুদ্ধিমত্ত্বাকে কাজে লাগায়। তাকে পঞ্চাশ সদস্যের এক বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। মিশরে আসার পর তার বুদ্ধিমত্ত্বা ও বিচক্ষণতা পুরোপুরি জাগ্রত হয়ে ওঠে। গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান সুলতান আইউবীর পরামর্শে খলীলকে তার যুদ্ধবাজ গোয়েন্দা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তাকে একাধিকবার কমান্ডো ও গেরিলা অভিযানে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তির জন্য তাকে দেশের বাইরে কখনো পাঠান হয়নি। তাকে দেশের অভ্যন্তরে শত্রু-চরদের তথ্য সংগ্রহ, পশ্চাদ্ধাবন ও গ্রেফতার করার কাজে নিয়োজিত করা হয়। এ কাজে বড় দক্ষ খলীল।
এখন ১১৭৪ সাল। নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পর যখন সুলতান আইউবী সাতশ অশ্বারোহী সৈনিক নিয়ে দামেস্ক দখল ও আল-মালিকুস সালিহকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে রওনা হন, তখন তিনি তার গোয়েন্দা দলকে আগেই দামেস্ক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন বেশে দামেস্ক অনুপ্রবেশ করে এবং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সুলতান আইউবী যখন দামেস্ক দখল করে ফেলেন এবং খলীফা আল-মালিকুস সালিহ ও তার আমীর-উজীর-দেহরক্ষীগণ দামেস্ক ছেড়ে পালিয়ে যায়, তখন আলী বিন সুফিয়ানের নায়েব হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ যিনি গোয়েন্দাদের সঙ্গে দামেস্ক ঢুকে গিয়েছিলেন কয়েকজন গোয়েন্দাকে সেদিকে পাঠিয়ে দেন, যেদিকে আস-সালিহ ও তার দেহরক্ষীরা পালিয়েছিল। এই গোয়েন্দাদেরকে কতগুলো বিশেষ নির্দেশনা ও বিভিন্ন মিশন বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল। খলীল ছিল তাদের একজন। তার এক সঙ্গীও ছিল সেই দলে।
এই গোয়েন্দা দলটি যখন হাব পৌঁছে, তখন সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। আস-সালিহর সাঙ্গপাঙ্গদের এই মুহূর্তে সৈন্যের প্রয়োজন। তাদের মনে প্রবল আশংকা, সুলতান আইউবী তাদের ধাওয়া করবেন এবং হামলা চালাবেন। ফলে তারা সেই অস্থির পরিস্থিতিতে যাকেই পেয়েছে, সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে নিয়েছে। খলীল এবং তার সঙ্গী নিজেদেরকে দামেস্ক থেকে পালিয়ে আসা সৈনিক পরিচয় দিয়ে বাহিনীতে ঢুকে পড়ে।
সুলতান আইউবীর এই গোয়েন্দারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আস্তানা তৈরি করে নেয়।
খলীল অত্যন্ত সুশ্রী ও শক্তসামর্থ যুবক। অতিশয় বাকপটু। এই সুবাদে তাকে রাজপ্রাসাদের প্রহরী নিযুক্ত করা হয়। কৌশলে সঙ্গীকেও সাথে রাখে।
***
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জিহাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে খলীল। ভুলে গেছে হুমায়রার কথা। একদিনও- একবারও তার মনে পড়ছে না ভালবাসার মানুষটির কথা। এসব ভাবনার সুযোগই পায়নি খলীল। কিন্তু এই নতুন মেয়েটি খলীলকে স্মরণ করিয়ে দিল হুমায়রার কথা।
খলীল হুমায়রাকে হারিয়েছে সাত-আট বছর হয়ে গেছে। তখন মেয়েটির রুস ছিল ষোল বছর। মেয়েটি অত্যন্ত রূপসী। কিন্তু তার মুখাবয়বে হুমায়রার সেই নিষ্পপতা ও সরলতা এখন অনুপস্থিত। দুজনের মুখোমুখি হওয়ার সময় তার পরনে ছিল সংক্ষিপ্ত পোশাক। বলা চলে অর্ধনগ্ন। কাজেই অশালীন এই মেয়েটি হুমায়রা হতে পারে না। মেয়েটা তৃতীয়বার যখন খলীলের মুখোমুখি হয়, তখন খলীল আরো নিরীক্ষা করে দেখে। মেয়েটিও তাকিয়ে থাকে খলীলের প্রতি। এবার কথা বলে মেয়েটি- তোমার নাম কী?
খলীল নিজের ছদ্মনাম বলে, যে নাম এখানে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার সময় লিখিয়েছিল। তারপর প্রশ্ন করে- তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করছ কেন?
তুমি আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখছ। তাই নামটা জিজ্ঞেস করলাম। হুমায়রা এমনভাবে জবাব দেয়, যেন তার মধ্যে সভ্যতার লেশমাত্র নেই- তুমি একজন সাধারণ সৈনিক। নিজের কাজ কর; ওসব ভেবে লাভ নেই।
