একদিন খলীলের নিকট গিয়ে হাজির হয় হুমায়রা। মুখে অস্থিরতা ও মলিনতার ছাপ। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে কথা বলে খলীলের সঙ্গে আমার সন্দেহ হচ্ছে, বাবা বিয়ের নামে আমাকে এক অপরিচিত ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে চাচ্ছেন। বাবার সঙ্গে একজন লোক এসেছিল। তিনি লোকটাকে অনেক খাতির যত্ন করলেন এবং কিছুক্ষণ পর আমাকে ডেকে তার কাছে নিয়ে বসালেন। লোকটা আমাকে খুব নীরিক্ষন করে দেখল। আমি বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে কেন ডাকলেন বাবা? জবাবে তিনি আমতা আমতা করে যা বলতে চাইলেন, তাতেই আমার মনে এই সন্দেহ সৃষ্টি হয়। হুমায়রা খলীলকে বলল, আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাই না।
খলীল বলল- ঠিক আছে, আমি আমার আব্বা-আম্মার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।
হুমায়রা যে লোকটাকে পিতা বলে ডাকে, সে তার পিতা নয়। কাজেই হুমায়রার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার কোন ভাবনা নেই। সে যুগে মেয়েদের কোন মর্যাদা ছিল না। অর্থের বিনিময়ে মেয়েদেরকে অন্যের হাতে তুলে দেয়ার প্রচলন ছিল। শাসক ও ধনবান লোকেরা হেরেম বানিয়ে রেখেছিল। তারা নিত্যনতুন সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ক্রয় করত। হুমায়রাকে যদি তার পিতা বিক্রি করার পরিকল্পনা করেও থাকে, সে সমাজের রীতি অনুযায়ী তা অপরাধ ছিল না।
খলীল ধনবান পিতা-মাতার সন্তান নয়। হুমায়রাকে নিয়ে পালিয়ে কোথাও আত্মগোপন করা অপেক্ষা বেশী কিছু করার সুযোগ তার নেই। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কী করবে খলীল? ভাবনায় পড়ে যায় সে। হুমায়রার প্রতি তার ভালবাসা এতই গভীর যে, বিষয়টা উপেক্ষাও করতে পারছে না খলীল।
খলীলের ভাবতে ভাবতে কেটে যায় অনেক সময় দুদিন। তৃতীয় দিনও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারল না সে।
খলীল ক্ষেতে গিয়ে কাজে লেগে যায়। এমন সময় একদিক থেকে নারী কণ্ঠের চিৎকার ভেসে আসে তার কানে। একটি মেয়ে যেন তাকেই ডাকতে ডাকতে দৌড়ে আসছে। খলীল হঠাৎ চমকে উঠে মাথা তুলে তাকায়। হুমায়রা। হুমায়রা-ই তাকে ডাকতে ডাকতে তার দিকে পাগলিনীর ন্যায় ছুটে আসছে। পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে তিনজন লোক। তাদের একজন হুমায়রার পিতা। অপর দুজনকে চিনে না খলীল।
হুমায়রার চিৎকার শুনে পাড়ার অনেক মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। কিন্তু তারা সবাই তামাশা দেখছে শুধু। তারা এই ভেবে হুমায়রার সাহায্যে এগিয়ে আসছে না যে, পেছনের লোকগুলোর মধ্যে হুমায়রার পিতাও আছেন।
খলীল হুমায়রার দিকে এগিয়ে যায়। হুমায়রা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, এরা আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। বাবা আমাকে এদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। হুমায়রার পিতা হুমায়রাকে খলীলের সম্মুখ থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। খলীল তাকে ধমক দেয়- খবরদার! এর গায়ে হাত দেবেন না। আগে আমার সঙ্গে কথা বলুন।
এ আমার কন্যা- হুমায়রার পিতা বলল- তুমি কে আমাকে ঠেকাবার?
এ আপনার কন্যা নয়- খলীল বলল- আমি সব জানি।
অপর দুজন হুমায়রার দিকে এগিয়ে আসে। একজন হাতে তরবারী তুলে নেয়। খলীলের হাতে কোদাল। সেটি দ্বারা লোকটার মাথায় আঘাত করে সে। লোকটার হাত থেকে তরবারীটা পড়ে যায়। পরক্ষণেই রক্তাক্ত মাথায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে লোকটি। খলীল তরবারীটা হাতে তুলে নেয়।
দ্বিতীয় ব্যক্তির হাতেও তরবারী। খলীল তরবারী চালনা ও তরবারী আঘাত প্রতিহত করার কলা-কৌশল জানে না। তারপরও লোকটার দু-একটা আঘাত প্রতিহত করে সে। কিন্তু বেশীক্ষণ টিকতে পারল না খলীল। ভারী কি একটা বস্তু আঘাত হানে তার মাথায়। হঠাৎ দুচোখের সামনের সব অন্ধকার হয়ে যায়। খলীল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
খলীলের যখন জ্ঞান ফিরে, তখন সে নিজের ঘরে। হঠাৎ ধড়মড় করে শোয়া থেকে উঠে বসে সে। চোখে মুখে প্রচন্ড ক্রোধ। তার পিতা ও দু-তিনজন লোক এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলে শান্ত করার চেষ্টা করে- তুমি অনেকক্ষণ যাবত অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলে। এইমাত্র তোমার জ্ঞান ফিরেছে। শুয়ে থাক। হুমায়রা এই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। তাকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।
খলীল চিৎকার করে ওঠে- লোকটা মেয়েটাকে বিক্রি করে ফেলেছে! আহ! আমি বুঝি হুমায়রাকে হারিয়ে ফেললাম। খলীলকে বুঝানো হল, হুমায়রাকে যথারীতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করিয়েই বিদায় করা হয়েছে।
খলীলের মাথার অবস্থা ভাল নয়। বসার চেষ্টা করলেই মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। বড়রা তাকে উপদেশ দেন, হুমায়রাকে নিয়ে ভাবা তোমার পক্ষে ঠিক হবে না। ও এখন অন্যের বিবাহিতা স্ত্রী।
খলীল সুস্থ্য হয়ে যখন বাইরে বের হয়, ততক্ষণে হুমায়রার পিতা পরিবারসহ এলাকা ত্যাগ করে চলে গেছে।
***
হুমায়রাকে হারিয়ে পাগলের মত হয়ে গেছে খলীল। মেয়েটির ভালবাসা আর তার মুখডাকা পিতার প্রতিশোধস্পৃহা অস্থির করে তুলেছে তাকে। কাজ-কর্মে মন বসছে না তার। মাঝে-মধ্যে দামেস্ক গিয়ে হুমায়রার পিতাকে খুঁজে বেড়ায় খলীল। তার পিতা-মাতা তাকে অনেক ভাল ভাল মেয়ে দেখায়; কিন্তু কাউকেই পছন্দ হচ্ছে না তার। তার মন-মস্তিষ্কে চেপে বসে আছে হুমায়রা।
এক-দেড় বছর পর্যন্ত এভাবেই সময় কাটে খলীলের। একদিন দামেস্কে ঘোরাফেরা করতে গিয়ে জানতে পারে, সেনাবাহিনীতে লোক নেয়া হচ্ছে। খলীল সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে যায়।
