মাঝে-মধ্যে ভোজের আয়োজন হয় হলটিতে। তখন নাচ-গানের আসর বসানো হয়। উজাড় হয় হাড়ি হাড়ি মদ। সব শেষে অপকর্মের চরমে পৌঁছে যায় মজলিস। কখনো কখনো সামরিক বিষয়ে কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় এখানে।
রক্ষীবাহিনীর দুজন প্রহরী কোমরে তরবারী, ও হাতে বর্শা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সবৃসময়। তিন-চার ঘন্টা পরপর প্রহরী বদল হয়।
খলীল সুলতান আইউবীর গুপ্তচর। আইউবীর আরেক গোয়েন্দা তার সহকর্মী। দুজনের ডিউটি পড়ে একসঙ্গে। তারা এখান থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছে। অনেক তথ্য দেমস্কে পৌঁছিয়েও দিয়েছে।
একদিন সন্ধ্যা বেলা। নতুন এক নর্তকীর আগমন ঘটে হলে। আজ ভোজসভার আয়োজন আছে। মেহমানরাও আসছেন। নর্তকী-গায়িকা এবং অন্যান্য মেয়েরাও আসছে। খলীল ও তার সঙ্গী তাদের সবাইকে চিনে। দূর দূরান্তের কেল্লাদারগণও এসেছেন। এক ব্যক্তি এসেছে নতুন। ইনি রেমন্ড-এর প্রেরিত গোয়েন্দাদের কমান্ডার। তার পরিচয়টা জেনে নেয় খলীল। এবার লোকটার তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে খলীলকে।
তাকে ছাড়া আরো একটি নতুন মুখ দেখতে পায় খলীল। এই মুখ একটি মেয়ের। খলীল মেয়েটিকে আজ তিন-চার দিন ধরে দেখছে। নতুন আসা মেয়ে।
একদিন ডিউটি শেষ করে সঙ্গীসহ কর্মস্থল ত্যাগ করছে খলীল। হঠাৎ মেয়েটা এসে সামনে দাঁড়ায়। খলীল উঠে থমকে দাঁড়ায়। অপলক জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় তার প্রতি। মেয়েটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে খলীলের। কে এই মেয়েটা? খলীলের মনে কৌতূহল। আবার ভাবে, না পরিচিত কেউ নয়। মানুষের চেহারায় চোহরায় মিল থাকে। খলীল দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। কিন্তু মেয়েটা তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তাকাতে তাকাতে সামনের দিকে চলে যায়। খলীল ঘাড় ফিরিয়ে মেয়েটার প্রতি তাকায়। মেয়েটাও তাকায় তার প্রতি।
পরদিনও এমনি ঘটনা ঘটে। তার আগেই খলীল মেয়েটার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়। জানতে পারে, মেয়েটা নর্তকী।
মেয়েটা দেখতে যেন রাজকন্যা। খলীল একজন সাধারণ সিপাহী। এমন একটি মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক জমতে পারে না। রাজকন্যারূপী নর্তকীরা তো আমীরদের সম্পদ। কিন্তু এই মেয়েটাকে দেখে খলীলের অন্য একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে গেছে- যাকে দেখতে ঠিক এই মেয়েটিরই ন্যায়।
***
এগার-বার বছর আগের কথা। খলীল তখন আঠার বছরের যুবক। দামেস্কের সামান্য দূরে এক গ্রামে বাস করত এবং পিতার সঙ্গে ক্ষেতে-খামারে কাজ করত। হাসি-খুশি স্বভাবের মানুষ খলীল। উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন মেধাবী ছেলে। পাড়ার শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলের কাছেই প্রিয়।
তখন হিজরতের পালা চলছিল। খৃস্টানদের দখল করা এলাকাসমূহ থেকে মুসলমান পরিবারগুলো খৃস্টানদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলিমশাসিত এলাকায় চলে যাচ্ছিল। স্থানীয় লোকেরা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করত এবং তাদের বসবাস করার সুযোগ করে দিত।
এমনি একটি পরিবার কোথা থেকে হিজরত করে খলীলদের গ্রামে চলে আসে। সেই পরিবারের একটি মেয়ের নাম হুমায়রা। তখন তার বয়স ছিল এগার কি বার বছর। অত্যন্ত সুন্দরী ও ফুটফুটে একটি মেয়ে।
গ্রামবাসীরা এই পরিবারটিকে সাদরে বরণ করে নেয় এবং মাথা গোজার ঠাই করে দিয়ে চাষাবাদ করে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহের জন্য জমি-জিরাত দান করে। হুমায়রার ভাই-বোন সবাই ছোট। সংসারে কর্মক্ষম লোক একমাত্র পিতা। খলীল এই অসহায় পরিবারটির প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। খলীলের কথাবার্তা ভাল লাগে হুমায়রার কাছে। হুমায়রাকেও ভাল লাগে খলীলের। হুমায়রা খলীলের ঘরে আসা-যাওয়া করতে শুরু করে। সুযোগ পেলেই খলীলের কাছে গল্প শুনে হুমায়রা। হুমায়রাকে শুনানোর জন্য মজার মজার গল্প বানিয়ে নিয়েছে খলীল। ভাব গড়ে ওঠে দুজনের মাঝে।
এভাবে মাস চারেক সময় কেটে যায়। ক্ষেত-খামারে কাজ করা তখন আর ভাল লাগছে না হুমায়রার পিতার। দামেস্ক শহরটা সেখান থেকে নিকটে। হুমায়রার পিতা সকালে শহরে চলে যান এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসেন। এভাবে কেটে যায় এক বছর। হুমায়রার পিতাকে কিছু করতে দেখছে না কেউ। কিন্তু সংসার চলছে বেশ ভালভাবেই।
খলীলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে হুমায়রা। তাকে ছাড়া একদণ্ডও ভাল লাগে না মেয়েটার। সবসময় খলীলের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে চায় সে। খলীল ক্ষেতে গেলে হুমায়রাও চলে যায় সেখানে।
হুমায়রার বয়স এখন তের বছর। ভাল-মন্দ বুঝতে শুরু করেছে। প্রেম ভালবাসা, মন দেয়া, মন নেয়া এসব এখন হুমায়রার অবোধ্য নয়।
একদিন খলীল হুমায়রাকে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা, তোমার আব্বা এখন কী কাজ করেন?
হুমায়রা উত্তর দেয়- আমি জানি না। আমি শুধু এটুকু জানি যে, আমার বাবা ভাল মানুষ নন। তিনি শহর থেকে যখন আসেন, নেশা করে আসেন।
হুমায়রা খলীলকে আরো নতুন একটি তথ্য প্রদান করে- ইনি আমার পিতা নন। আমার মা-বাপ দুজনই মারা গেছেন। আমার বয়স যখন পাঁচ-ছয় বছর, তখন ইনি আমার ভার নেন এবং আমাকে তার ঘরে নিয়ে লালন-পালন করেন। পরে আমি তাকেই পিতা ডাকতে শুরু করি। আমাকে তিনি আপন মেয়ের মত আদর করেন এবং নিজের মেয়ের মতই আচরণ করেন। কিন্তু মানুষটা ভাল নন।
এভাবে কেটে গেছে দুটি বছর। খলীলের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে হুমায়রা। হুমায়রা এখন পরিপূর্ণ যুবতী। হৃদয়কাড়া সুশ্রী মুখাবয়ব। যৌবন-রসে টইটুম্বর ও নজরকাড়া দেহ।
