আস-সালেহর সৈন্য কম। তার অর্ধেক সৈন্য সেনাপতি তাওফীক জাওয়াদের নেতৃত্বে সুলতান আইউবীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তাই তার স্বার্থপূজারী মুসলিম আমীর ও শাসকমণ্ডলী এভাবে জনসাধারণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছে। খৃষ্টানরা তাদের মদদ যোগাচ্ছে।
গোয়েন্দারা সুলতান আইউবীকে তথ্য প্রদান করে যে, হাবে জনসাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। সব মানুষ যুদ্ধের জন্য উন্মাদ ও উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে। তবে বয়সী মুসলমানরা খুবই অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছে এবং বলছে, এটা কেয়ামতের লক্ষণ যে, মুসলমানে মুসলমানে যুদ্ধ হবে। কিন্তু তাদের আওয়াজ আইউবী বিরোধী লোকদের ধ্বনি ও অপবাদ প্রচারণার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রবীণদের এই আওয়াজ ছিল খৃস্টানদের বিপক্ষে। তারা তাকে স্তব্ধ করার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বস্তুত আইউবী বিরোধী মুসলমানদের পুরো কার্যক্রমই খৃস্টানদের পরিকল্পনা। যেসব ইমাম মিম্বরে দাঁড়িয়ে মুসলমানদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে প্রস্তুত নন, তাদেরকে অপসারণ করে অন্য ইমাম নিয়োগ দেয়া হয়।
উপযুক্ত বিনিময় হাতে নিয়ে ত্রিপোলীর খৃষ্টান সম্রাট রেমন্ড তার কয়েকজন সামরিক কমান্ডারকে উপদেষ্টা হিসেবে হাল্ব প্রৈরণ করেন। তাদের মধ্যে একজন বিশেষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাও ছিলেন, যিনি নাশকতা পরিচালনায় বেশ দক্ষ।
পদচ্যুৎ খলীফা আল-সালেহ বিলম্ব না করে তাকে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করে দেন। সৈন্যরা বিভিন্ন দুর্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। মসুলের গবর্নর সাইফুদ্দীন, গবর্নর পদমর্যাদায় ভূষিত গোমস্তগীন নামক এক কেল্লাদার, সুলতান আস- মালিকুস সালিহ ও ইয়াজুদ্দীন বাহিনীর কমান্ডারদের অন্যতম। রেমন্ড তাদেরকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মিশর থেকে সালাহুদ্দীন আইউবী এবং যে রসদ ও ফোর্স আসবে, তিনি তাদেরকে প্রতিহত করবেন এবং আইউবী যেখানেই অবরোধ আরোপ করবেন, সেখানেই খৃস্টান বাহিনী বাহির থেকে হামলা করে অবরোধ ভেঙ্গে ফেলবে।
***
দামেস্কে সুলতান আইউবী দুই-তিন দিন পরপর কমান্ডারদের নিয়ে বৈঠক করছেন। সামরিক প্রশিক্ষণ নিজেও পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কমান্ডারদের থেকেও রিপোর্ট গ্রহণ করছেন। রাতের বেলা উদোম শরীরে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি তার বাহিনীকে হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত করে নিয়েছেন। আশপাশে অনেক টিলা আছে। তিনি মরুভূমিতে চলাচলে অভ্যস্ত ঘোড়াগুলোকে টিলায়-পাহাড়ে উঠানামা করার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন।
ওদিকে হালবেও দু-তিনটি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। সেখানকার কমান্ডাররা সংবাদ পেয়েছে যে, সুলতান আইউবী রাতের বেলা তার বাহিনীকে সামরিক মহড়া করাচ্ছেন। কিন্তু এ বিষয়টাকে তারা কোন গুরুত্ব দেয়নি। বলছে, আইউবীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে; আমাদের মুখোমুখি হলে সে হামলা করার স্বাদ বুঝতে পারবে। সেই কমান্ডারদের একজনও ইন্টেলিজেন্স বিষয়ে অভিজ্ঞ নয়। খৃস্টানরা দামেস্কে তাদের গোয়েন্দা পাঠিয়ে রেখেছিল। শেখ সান্নানের ঘাতক ও নাশকতাকারী দলটিও তাদের। খৃস্টান সম্রাট রেমন্ডও তার একজন বিশেষ দূত প্রেরণ করেছেন দামেস্কে। সুলতান আইউবী কেন রাতে বেলা সামরিক মহড়া করাচ্ছেন, তার রহস্য উদ্ঘাটনে আত্মনিয়োগ করে রেমন্ড এর বিশেষ গোয়েন্দা। হাবে কমান্ডারদের কনফারেন্সে বিষয়টি এখনো উত্থাপন করেনি সে। ঘটনার রহস্য এখনো তার জানা হয়নি।
সুলতান আইউবী হা্লব ও মসুল ইত্যাদি এলাকায় গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে রেখেছেন। তাঁর গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ন্ত্রিত হয় হাল্ব থেকে। দলনেতা একজন বিজ্ঞ আলিমের বেশে হাবে অবস্থান করছেন এবং গোয়েন্দাদের থেকে তথ্য গ্রহণ করে দামেস্ক পৌঁছাবার ব্যবস্থা করছেন। তিনি তার গোয়েন্দাদের নিরাপত্তা বিধান ও বিপদ দেখা দিলে তাদেরকে লুকিয়ে ফেলার বন্দোবস্তও করে রেখেছেন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে গাল-মন্দ এবং সমালোচনা করার কাজে তিনি সকলের বাড়া। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আমীর-উজীর এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকেন। তার গোয়েন্দা সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ সবকটি স্থানেই অবস্থান নিয়ে আছে। আল-মালিকুস সালেহর মহলের বডিগার্ডের মধ্যেও তার গোয়েন্দা রয়েছে। দুজন গোয়েন্দা বিশেষ প্রহরীর পদ নিয়ে খলীফার কেন্দ্রীয় কমান্ডের সেই প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, যেখানে তাদের যুদ্ধ বিষয়ে বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। খৃস্টান গোয়েন্দাদের কমান্ডার এসেই সর্বপ্রথম দামেস্কে তাদের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে সংহত ও কার্যকর করা এবং হাবে সুলতান আইউবীর যেসব গোয়েন্দা রয়েছে, তাদের সন্ধান বের করার কাজে আত্মনিয়োগ করে।
***
সুলতান আইউবী যে দুজন গুপ্তচর হাবে হাইকমান্ডের প্রহরীদের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল, তাদের একজনের নাম খলীল।
একটি ভবনের কতগুলো কক্ষ। তার একটি হলরুম। এখানে ভোজসভা, নাচ-গানের আসর ও দরবার অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত সাজানো-গোছানে, একটি কক্ষ। হাল্বে আমীর-উজীরদের খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের পর এখন কক্ষটি আরো পরিপাটি, আরো সুসজ্জিত। অপরূপ সুন্দরী ও অভিজ্ঞ যুবতী মেয়েরা এখানে নাচ-গান করে। এখন কয়েকটি খৃস্টান মেয়েও এসে যোগ দিয়েছে এখানে। এরা সুশিক্ষিত পেশাদার মেয়ে। খলীফা আস-সালিহর আমীর-উজীরগণ এদের আঙ্গুলের ইশারায় ওঠ-বস করে। এদের আসল কর্তব্য, আস-সালিহর বিশিষ্ট দরবারী আমীর ও সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কমান্ডারদের উপর নজর রাখা এবং অনুধাবন করা যে, তাদের মধ্যে সুলতান আইউবীর অনুগত কেউ আছে কিনা। তাছাড়া, খলীফার পদস্থ কর্মকর্তাদের মনে খৃস্টান প্রীতি ও ক্রুশের অনুগত্য সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালানোও তাদের অন্যতম দায়িত্ব।
