সুলতান আইউবী জরুরী বৈঠক তলব করেছেন। বৈঠকে অন্যদের সঙ্গে দামেস্কের আমীর একং সেনা কর্মকর্তাগণও উপস্থিত। কারো মন-মেজাজই ভালো নয়। শক্ররা সুলতান আইউবীর নিবেদিতপ্রাণ একজন রক্ষীসেনাকে দিয়ে তাঁর উপর সংহারী আক্রমণ চালিয়েছে ভেবে আইউবীর সামরিক কর্মকর্তাগণ হতবাক। আল্লাহর মেহেরবানী, সুলতান এবারও রক্ষা পেয়ে গেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত সবাই ক্ষুদ্ধ-ক্রুদ্ধ। তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভভ আস-সালেহ ও. আমীর-উজীরদের থেকে প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। তাদের ধারণা, সুলতান তাদেরকে হামলা সম্পর্কে আলোচনা করতে ডেকেছেন।
সুলতান আইউবীর বক্তব্য শেষ হল। সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতারা গর্জে ওঠলেন। তারা শত্রু থেকে প্রতিশোধ নেয়ার পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন। সুতলান আইউবী ঠাণ্ডা মাথায় মুখে মুচকি হাসির রেখা টেনে বললেন- উত্তেজনা, ক্রোধ ও আবেগ পরিহার কর। দুশমন তোমাদেরকে উত্তেজিত করে এমন তৎপরতায় জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করতে চায়, যা তোমাদের জন্য অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। আমার গোটা পরিকল্পনাই এক ধরনের প্রতিশোধমূলক তৎপরতা। কিন্তু এ প্রতিশোধ ব্যক্তির জন্য নয়- দ্বীনের জন্য। আমার জীবন, আমার ব্যক্তিস্বত্ত্বা, তোমাদের জীবন ও ব্যক্তিস্বত্ত্বার গুরুত্ব এর বেশী নয় যে, আমরা ইসলামী দুনিয়ার মোহাফেজ। ইসলামের ও ইসলামী ভূখণ্ডের জন্য আমাদেরকে জীবন দিতে হবে। আমরা যুদ্ধের ময়দানে মারা যেতে পারি। প্রতারিত হয়ে শত্রুর হাতেও প্রাণ হারাতে পারি। শাসক আর মুজাহিদদের মধ্যে এই পার্থক্য। শাসক হেফাজত করে নিজেকে আর ক্ষমতাকে। কিন্তু মুজাহিদ দেশ, জাতি ও দ্বীনের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়। আস-সালেহ ও তার আমীর-উজীরগণ তাদের রাজত্বের হেফাজত করছে। তাদের পরাজয় অবধারিত।
সুলতান আইউবী গোয়েন্দা উপপ্রধান হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকে বললেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মালিকানাবিহীন যেসব পরিত্যক্ত প্রাসাদ আছে, সেগুলো গুঁড়িয়ে দাও। তিনি এই নির্দেশও জারি করেন যে, দেশের মসজিদগুলোর ইমামদেরকে বলে দাও, যেন তারা এই মর্মে বয়ান করেন যে, দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের মালিক আল্লাহ এবং গায়েবের অবস্থা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। আল্লাহর কোন বান্দা আল্লাহর ও বান্দার মাঝে যোগাযোগের মাধ্যমে হতে পারে না। আল্লাহ সরাসরি যে কারো কথা শুনেন। কোন মানুষের সামনে সেজদাবনত হওয়া মস্তবড় পাপ। তোমরা দেশবাসীকে ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও কল্পনাবিলাস থেকে রক্ষা কর।
সুলতান আরো বললেন, তোমরা সৈনিকদেরকে বুঝাও, যুদ্ধের ময়দানে যেমন তোমরা নিজেদের দেহকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাক, তেমনি বিশ্বাস ও মনন-মানসকেও দুশমনের হামলা থেকে রক্ষা করে চল। আর এই আক্রমণ তরবারীর নয়- মুখের আক্রমণ। দেহের জখম একদিন ভাল হয়ে যায়, দেহ আহত হয়েও লড়াই করে থাকে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস, মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তাধারা আহত হয়ে পড়লে দেহ বেকার হয়ে যায়। তোমরা নেশার ক্রিয়া তো দেখেছ। নেশাগ্রস্ত হয়ে আমার একজন দেহরক্ষী আমারই উপর হামলা করে বসেছে! কিন্তু পরে যখন তার মস্তিষ্ক থেকে নেশা দূর হয়ে গেল, তখন আর সে স্বীকারই করল না যে, সে আমার উপর হামলা করেছে। এই নেশার মধ্যে একটি রূপসী নারীর নেশাও ছিল। তোমরা মানুষের মধ্যে দায়িত্বশীলতা এবং ইসলাম ও মুসলমানের মর্যাদার অনুভূতি জাগ্রত কর। তাদের মধ্যে নাগরিক কর্তব্যবোধ ও জাতীয় মর্যাদার নেশা সৃষ্টি কর। দেশ ও জাতির মর্যাদার অনুভূতি এবং এই মর্যাদার সংরক্ষণ তাদের ঈমানের অংশে পরিণত কর। তাহলে অন্য কোন নেশা তাদেরকে ঘায়েল করতে পারবে না।
সুলতান আইউবী আক্রমণের যে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলেন, তাতে দুর্গের পর দুর্গ জয় করে সম্মুখে অগ্রসর হতে হবে। হেমস, হামাত ও হাবের দুর্গ হল সবচে শক্ত ও প্রসিদ্ধ। হাবের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত শক্তিশালী। হাল্ব দুর্গ এই শহর থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত। এগুলো ছাড়াও আরো কয়েকটি দুর্গ আছে, যেগুলোর অধিকাংশ পাহাড়ী ও দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। সবচে বড় সমস্যা হচ্ছে ঐসব এলাকার শীত। শীতের সঙ্গে বরফপাত যোগ হয়ে এক অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। এ কারণে ঐসব এলাকায় শীত মওসুমে কখনো যুদ্ধ হয়নি। তাই বিরুদ্ধবাদীরা তাদের বাহিনীকে দুর্গে ঢুকিয়ে রেখেছে। এই সময়ে কেউ হামলা করতে পারে, তা তাদের কল্পনার বাইরে। তাদের খৃস্টান উপদেষ্টারাও তাদেরকে এই পরামর্শই প্রদান করেছে। অপরদিকে সুলতান আইউবী এই শীতের মওসুমেই লড়াই করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। গোয়েন্দারা তাকে একের পর এক সংবাদ পৌঁছাচ্ছে।
সুলতান আইউবী গোয়েন্দা মারফত জানতে পারেন যে, হাবের মসজিদগুলোর ইমাম ও খতীবরা জনগণকে বুঝাবার চেষ্টা করছে, সালাহুদ্দীন আইউবী একজন পাপিষ্ট মানুষ। তিনি রাজত্বের লোভে ও সামরিক শক্তির দাপটে খুতবা থেকে খলীফার নাম তুলে দিয়েছেন। তারা সুলতান আইউবীকে বিলাসপ্রিয় ও চরিত্রহীন মানুষ হিসেবে অভিহিত করছেন। তারা বলছেন, জুমার খুতবায় খলীফার নাম উল্লেখ করা না হলে খুতবা পরিপূর্ণ হয় না। আর অসম্পূর্ণ খুতবায় গুনাহ হয়। সরাইখানা, হাট-বাজর এবং রাস্তাঘাটেও মানুষ বলাবলি করছে যে, সালাহুদ্দীন আইউবী একজন চরিত্রহীন মানুষ, নামের মুসলমান। সেই সঙ্গে লোকদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্যও উত্তেজিত করা হচ্ছে।
