দুর্গের একটি মনোরম কক্ষে যে আয়োজন-ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল, তা পাথরকে মোমে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। এক তো ছিল কক্ষের সাজগোজ, পরিপাটি ও মহামূল্যবান জাজিম বিছানো; তদুপরি যাদুকরী রূপ-যৌবন ও সুডৌল-সুঠাম দেহের অধিকারী অর্ধনগ্ন একটি মেয়ে। মেয়েটির উন্মুক্ত রেশমী চুলে জাদুর আকর্ষণ, যা কিনা একজন দুনিয়াত্যাগী আবেদের মধ্যেও পাশবিকতা জাগিয়ে তোলে। আসল বস্তু হল শরবত, যা পান করিয়ে নেশা সৃষ্টি করা হয়। কাঁচের গোলকটি ব্যবহার করা হয় দৃষ্টিতে ভেল্কিবাজি সৃষ্টি করার জন্যে। সিপাহীর মস্তিষ্কে এই ধারণা দেয়া হয় যে, সে রাজবংশের সন্তান এবং তার বংশ তখতে সুলায়মানীর উত্তরসূরী।
এই সিপাহী যখন উক্ত কক্ষে প্রবেশ করে, তখন কক্ষের সাজসজ্জা ও মূল্যবান জিনিসপত্র তাকে প্রভাবিত করে ফেলে। কালো দাড়িওয়ালা ঘাতকনেতা তখন ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তারও একটি ক্রিয়া ছিল। উপরন্তু পার্শ্বে একটি রূপসী মেয়েকে পেয়ে সে রীতিমত কাবু হয়ে যায়। মেয়েটি তাকে যে শরবত পান করায়, তাতেও নেশা ছিল। সেই নেশার ক্রিয়া এমন ছিল যে, তাতে মানুষ বাস্তব জগত থকে সম্পর্কহীন হয়ে মন ভোলানো সুদৃশ্য এক কল্পনার জগতে চলে যায়। আর সেই অবস্থায়ই তাকে হেপটানাইজ করা হয় এবং তার মস্তিষ্কে কাঙ্খিত কল্পনা ঢেলে দেয়া হয়। তার হাতে কাঁচের যে গোলকটি দেয়া হয়, তার মধ্য দিয়ে দীপ শিখার কয়েকটি রং দেখা যায়, যা মূলত ভেল্কি ছাড়া কিছু নয়। কাঁচের গঠন এমন যে, তার মধ্যদিয়ে অতিক্রমকারী আলো সাতটি বর্ণে প্রতিভাত হয়, যা মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। পরক্ষণে একটি রূপসী মেয়ে সিপাহীর পার্শ্বে বসে যায় এবং কথায় কথায় প্রকাশ করে যে, সে তাকে অন্তর দিয়ে ভালবাসে। কালো দাড়িওয়ালা লোকটি জাদুকরী সুরেলা কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে। তার উচ্চারিত শব্দমালা সিপাহীর কানে পৌঁছে তার মস্তিষ্কে কাঙিখত কল্পনা সাজিয়ে তোলে। কালো দাড়িওয়ালা আন্দাজ করে নেয় যে, সিপাহী এখন প্রকৃতিস্থ নেই। সেই অবস্থায় তার হাত থেকে কাঁচের গোলকটি নিয়ে গিয়ে তার চোখে চোখ রাখে এবং তাকে হেপটানাইজ করে।
সিপাহী যাকে নিজের আওয়াজ মনে করে, তা মূলত কালো দাড়িওয়ালা ব্যক্তির কণ্ঠস্বর। তারপর সে এমন এক স্তরে গিয়ে উপনীত হয়, যেখানে সে নিজের কল্পনাকে বাস্তব মনে করে তাতে একাকার হয়ে যায়। এবার দুর্বলমনা সিপাহী সম্পূর্ণরূপে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কালো দাড়িওয়ালা ব্যক্তি তাকে বাস্তব জগতে নিয়ে এসে নিজে অন্য কক্ষে চলে যায় এবং মেয়েটি একাকী সিপাহীর সঙ্গে থেকে যায়। সে সিপাহীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও মন-মস্তিষ্কে জেঁকে বসে। এই উদ্দেশ্য সাধনে সে এমন আচরণ ও এমন কথা বলে, যার ক্রিয়া থেকে অন্তত এই সিপাহী রক্ষা পেতে পারে না। সিপাহীকে শুধু তখুতে সুলায়মানী প্রদর্শন করিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় এবং ধারণা দেয়া হয় যে, ভেদ এখনো অবশিষ্ট আছে। সিপাহী সম্পূর্ণরূপে তার জালে ফেঁসে যায়। এবার সে কাকুতি-মিনতি শুরু করে যে, অবশিষ্ট ভেদও বলে দাও। তাকে বলা হল, ঠিক আছে, তুমি আরো কয়েকদিন আমার নিকট থাক। সিপাহী কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে পুনরায় দুর্গে চলে যায়।
সিপাহী টানা চার দিন চার রাত সৰ্পকেল্লার কক্ষে অবস্থান করে। এ সময়টায় তাকে লাগাতার নেশা ও হেপটানিজমের ক্রিয়াধীন রাখা হয় এবং তার নিষ্ক্রীয় মস্তিষ্কে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কল্পনা সৃষ্টি করে এই বক্তব্য ঢেলে দেয়া হয় যে, সালাহুদ্দীন আইউবী সিপাহীর পিতা ও দাদার ঘাতক এবং তিনি তাদের সিংহাসন দখল করে আছেন। সিপাহীকে একটি রূপসী মেয়ে দেখানো হয় এবং তারপর দেখানো হয়, সুলতান আইউবী মেয়েটিকে পিঞ্জিরায় আবদ্ধ করে রেখেছেন। চারদিন পর তাকে সেই অবস্থায়ই দুর্গ থেকে বের করে দেয়া হয়। সে ডিউটিতে চলে যায় আর সুযোগ পাওয়া মাত্র সুলতান আইউবীর উপর হামলা করে বসে।
***
সিপাহী অচেতন হয়ে পড়ে আছে। হাকীম তার মস্তিষ্ক থেকে নেশার ক্রিয়া দূর করার জন্য ঔষধ প্রয়োগ করেন। লোকটি বাস্তবতা ও কল্পনার। মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। হাকীম তার স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরিয়ে আনার জন্য একাধিক পন্থা অবলম্বন করেন।
দুদিন পর সিপাহী চোখ খুলে। সে এমনভাবে উঠে বসে, যেন এতক্ষণ গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে ছিল এবং স্বপ্ন দেখছিল। উঠে বসেই বিস্মিত চোখে চারদিক তাকাতে শুরু করে। ডাক্তার জিজ্ঞেস করে, এতক্ষণ কোথায় ছিলে? সে জবাব দেয়, ঘুমিয়ে ছিলাম। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে তার অনেক সময় কেটে যায়। কিন্তু তেমন কিছু বলতে পারল না। সে বলল, চোগা পরিহিত কালো দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তি তাকে সর্পকেল্লায় নিয়ে গিয়েছিল। সে সেখানকার কিছু ঘটনাও শোনায়। কিন্তু তখতে সুলায়মানী ইত্যাদি যে দেখেছিল, তা তার মনে নেই। তার একথাও স্মরণ নেই যে, সে সুলতান আইউবীর উপর হামলা করেছিল।
সিপাহী অসত্য বলে ধোকা দিচ্ছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে সুলতান আইউবীর নিকট নিয়ে যাওয়া হল। সে একজন সৈনিকের ন্যায় সুলতানকে সালাম করে। সুলতান তার সঙ্গে মেহসুলভ কথা বলেন। কিন্তু সিপাহীর মনে রাজ্যের বিস্ময়, এদের কী হয়ে গেল, এরা আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছে কেন! শেষ পর্যন্ত তাকে তার কৃতকার্য সম্পর্কে অবহিত করা হল। শুনে সে চিৎকার করে ওঠে- মিথ্যা কথা, আমি আমার সুলতানের উপর হামলা করতে পারি না। সুলতান আইউবী বললেন, আমার এই সিপাহী নিরপরাধ। এ কী কাজ করেছে, তা তাকে স্মরণ করানোরও প্রয়োজন নেই।
৪.২ ক্রুশের ছায়াতলে
ক্রুশের ছায়াতলে
