হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ আরেক দল সৈন্য ডেকে আনেন। রাত গম্ভীর হয়ে গেছে। তিনি অনেকগুলো মশালেরও ব্যবস্থা করেন। সিপাহী যে কক্ষটিতে যাওয়া-আসা করেছিল, এক সেনা ইউনিটের কমান্ডার সে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই ভয়ংকর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এমন সাজানো-গোছানো মনোরম একটি কক্ষ দেখে কমান্ডার ভয় পেয়ে যায়। জিন-ভূতের আবাস কিনা কে বলবে। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকে তলব করা হল। তিনি এসে ভেতরে প্রবেশ করে সামানপত্র দেখতে শুরু করলেন। আস্তে আস্তে রহস্য উন্মোচিত হতে লাগল। ইতিমধ্যে কয়েকজন সিপাহী কালো দাড়িওয়ালা লোকটিকে কোথাও থেকে ধরে নিয়ে আসে। তার সঙ্গে অতিশয় রূপসী একটি মেয়ে। তার পরক্ষণেই ধরা পড়ল অন্য এক স্থানে লুকিয়ে থাকা আরো ছয়জন। তাদের হাতে তীর-ধনুক। কালো দাড়িওয়ালা নিজেকে দুনিয়াত্যাগী নির্জনবাসী বুযুর্গ দাবি করে সাধু সাজতে চেষ্টা করে। কিন্তু সঙ্গের রূপসী যুবতী ও তীর-ধনুক-সজ্জিত সেনা বাহিনীর সঙ্গে মোকাবেলা তাকে মিথ্যুক বলে প্রমাণিত করে। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ তাদের সামানপত্র ও অস্ত্রশস্ত্রসহ তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন।
কক্ষে পাওয়া গেছে তিন-চারটি সোরাহী ও পানপাত্র। বস্তুগুলো রাতেই হাকীমের হাতে তুলে দেয়া হয়। হাকীম সেগুলো নাকে কেই বলে দিলেন, আমি হাসান ইবনে সাব্বার যে শরবত উদ্ভাবনের কথা বলেছিলাম, এগুলো থেকে তারই ঘ্রাণ পাচ্ছি। মেয়েটিসহ গ্রেফতারকৃত সবাইকে কয়েদখানায় বন্দী করে রাখা হল।
পরদিন ভোরবেলা। এখনো সূর্য উদিত হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম ধাপেই মেয়েটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে দেয়- লোকগুলো ফেদায়ী ঘাতক। কালো দাড়িওয়ালা লোকটি নতুন শপথ নিয়ে এসেছে, হয়ত সুলতান আইউবীকে হত্যা করে ফিরবে, অন্যথায় নিজে জীবন দেবে। মেয়েটি জানায়, এই মোহাফেজ সিপাহীকে কালো দাড়িওয়ালা ফাঁদে ফেলেছে এবং নেশা পান করিয়ে তার উপর হেপটানিজম প্রয়োগ করেছে। সেই নেশা আর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে যে, সে সুলতানকে হত্যা করার জন্য ছুটে এসেছে। আশা ছিল, সুলতান আইউবী এই সিপাহীর হাতে নিহত হবেন। সেজন্য তিনি নিশ্চিন্তে দুর্গে বসে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি গুপ্তচরবৃত্তির জন্যে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু কোন তথ্য নিতে পারেননি। সিপাহীকেও কোথাও দেখতে পাননি। আর সন্ধ্যার সময় হঠাৎ ফৌজ হানা দিয়ে বসে।
কালো দাড়িওয়ালা লোকটি বড় কঠিন হৃদয়ের মানুষ প্রমাণিত হল। সে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, মেয়েটির সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। তার সঙ্গীরাও প্রথম প্রথম অস্বীকার করে। কিন্তু হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ যখন তাদেরকে পাতাল কক্ষে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন শুরু করে, তখন এক এক করে, অপরাধের কথা স্বীকার করে। কালো দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকে যখন তাদের সামনে উপস্থিত করা হল, তখন আর তার অস্বীকার করার কোন উপায় থাকল না। সঙ্গীদের করুণ দৃশ্য দেখামাত্র তার কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। তাকে বলা হল, সব ঘটনা খুলে বললে তোমাকে স্বসম্মানে রাখা হবে। অন্যথায় তুমি বাঁচতেও পারবে না, মরতেও পারবে না। হাড়-গোশত একাকার হওয়ার আগে সত্য সত্য বলে দাও। লোকটি কক্ষে নির্যাতনের উপকরণ ও পথ-পদ্ধতি দেখে সব কথা বলে দিতে সম্মত হয়ে যায়।
তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক সে ফেদায়ী ঘাতকদলের সদস্য। ফেদায়ীদের পৃষ্ঠপোষক শেখ সান্নানের বিশেষ ভক্ত। কিন্তু সে নিজ হাতে হত্যা করে না। হাসান ইবনে সাব্বাহ আবিষ্কৃত বিশেষ পন্থায় অন্যকে দিয়ে খুন করায় সে। সকল ঐতিহাসিক অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, আল্লাহ হাসান ইবনে সাব্বাহকে অস্বাভাবিক মেধা দান করেছিলেন, যা সে শয়তানী কাজে ব্যবহার করেছে।
কালো দাড়িওয়ালা জানায়, সুলতান আইউবীকে হত্যা করার লক্ষ্যে ইতিপূর্বে চারবার হামলা করা হয়েছিল। তার প্রতিটি হামলা ব্যর্থ হওয়ার পর আমাকে আবার বিশেষ পন্থা প্রয়োগ করার জন্য পাঠানো হয়েছে। সে জানায়, সুলতান আইউবীর উপর যে কটি হামলা হয়েছে, সবকটিই হয়েছে সরাসরি। তাতে প্রমাণিত হয়েছে, সুলতানকে সোজা পথে হত্যা করা যাবে না। সে তার দলের ছয়জন অভিজ্ঞ লোক ও একটি মেয়েকে নিয়ে দামেস্ক চলে আসে। এসে সর্পকেল্লায় আস্তানা বানায়। এই চক্রটি রাতের অন্ধকারে তাতে প্রবেশ করে। তাদেরই দলের লোকেরা শহরে গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, দুর্গে একজন দরবেশ আত্মপ্রকাশ করেছেন, যার হাতে গায়েবী শক্তি আছে এবং ভবিষ্যতের কথা বলে দিতে পারেন। এই গুজবের উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ দুর্গে আসুক এবং লোকটিকে অস্বাভাবিক শক্তিধর পীর-বুজুর্গ বলে বিশ্বাস করুক। তিনি প্রভাব বিস্তার করে এক বা একাধিক লোককে হাত করে নিয়ে তাদের দ্বারা সুলতান আইউবীকে হত্যা করাবে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সফল হল না, একজন মানুষও দুর্গে এল না। কারণ, মানুষ জানত, এই দুর্গে এমন দুটি নাগ-নাগিনী বাস করে, যাদের বয়স হাজার বছর অতিক্রম করেছে। এখন তারা মানুষের রূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং যাকে পায় তাকেই গিলে ফেলে।
এই চক্রের প্রধান কালো দাড়িওয়ালা লোকটি একজন অভিজ্ঞ ঘাতক। তার মাথায় পরিকল্পনা আসে যে, উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য, সুলতান আইউবীর বাহিনীর কোন সিপাহীকে ব্যবহার করতে হবে। সে কয়েকদিন পর্যন্ত খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করে, রক্ষী বাহিনীর সিপাহীরা কোথায় থাকে এবং তাদের ডিউটি কোন্ দিন পড়ে। কিন্তু সে সুলতান আইউবীর দফতর ও বাসগৃহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না। কারণ, এ দুটো হল সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। কোন নাগরিক কিংবা সাধারণ কোন সৈনিক সে এলাকায় ঢুকতে পারে না। এক পর্যায়ে লোকটি এই সিপাহীর সন্ধান পায় এবং কোন প্রকারে জানতে পারে যে, সে সুলতান আইউবীর দফতরের রক্ষীসেনা। অর্থাৎ এই লোকটি অনায়াসে সুলতানের দফতর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। দলনেতা এই সিপাহীর উপর নজর রাখতে শুরু করে। তখন তার বেশভূষা ছিল অন্যরকম। একদিন এই সিপাহী বাইরে বের হয়। ঘাতক নেতা তাকে দেখতে পায়। সে পথেই তার গতিরোধ করে। এবং এমনভাবে এমন ধারার কথা বলে, যাতে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষও প্রভাবিত না হয়ে পারে না। লোকটা ঘাতকচক্র নেতার জাদুকরী জালে আটকে যায় এবং রাতে দুর্গে চলে যায়।
