চারজন বডিগার্ড সিপাহীকে ঝাঁপটে ধরে রেখেছে। সিপাহী চিৎকার করছে- ইনি আমার ভালাবাসার ঘাতক। ইনি আমার ভাগ্যের হন্তারক।
এক বডিগার্ড হাত দ্বারা সিপাহীর মুখটা চেপে ধরে। কিন্তু সুলতান বললেন- ওকে বলতে দাও, মুখ থেকে হাত সরিয়ে নাও- তিনি সিপাহীকে উদ্দেশ করে বললেন- বলতে থাক দোস্ত! বল, তুমি কেন আমাকে খুন করতে চেয়েছিলে?
ওকে মুক্ত করে দিন- সিপাহী চীৎকার করে বলল- আপনি ওকে পিঞ্জিরায় আবদ্ধ করে রেখেছেন। হযরত আমাকে বলেছেন, আমি নাকি আপনাকে খুন করতে পারব না। আসুন, আমার মোকাবেলা করুন, আপনি নিজেকে রক্ষা করার জন্য, কাপুরুষের ন্যায় এতগুলো লোক জড়ো করেছেন। তরবারী বের করুন, আমার তরবারীটা আমাকে দিয়ে দিন, আপনি ময়দানে আসুন।
সুলতান আইউবী অপলক তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সিপাহীর প্রতি তাকিয়ে আছেন। বডিগার্ড সুলতানের নির্দেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। হামলাকারী সিপাহীকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করা প্রয়োজন। তার অপরাধ লঘু নয়। হত্যার উদ্দেশ্যে সুলতান আইউবীর উপর হামলা করেছে। সুলতান যদি উদাসীন থাকতেন কিংবা কক্ষে সিপাহীর প্রবেশ দেখে না ফেলতেন, তাহলে তার খুন হয়ে যাওয়া নিশ্চিত ছিল। কিন্তু সুলতান আইউবী তাকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করার আদেশ দিলেন না। সিপাহী বকে যাচ্ছে উন্মাদের ন্যায়। এমন সময়ে ডাক্তার এসে গেছেন। তার খানিক পর হাসান ইবনে আব্দুল্লাহও এসে পড়েন। ভেতরের পরিস্থিতি দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান।
একে নিয়ে যান।- সুলতান আইউবী ডাক্তারকে বললেন- লোকটা বোধ হয় হঠাৎ পাগল হয়ে গেছে।
লোকটা চারদিন ছুটি কাটিয়ে এসেছে রক্ষী কমান্ডার বললেন- আসার পর থেকে লোকটা কোন কথা বলছে না।
সিপাহীকে টেনে-হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হল। ডাক্তারও সঙ্গে চলে যান। সুলতান আইউবী হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকে অবহিত করলেন, এই সিপাহী হত্যার উদ্দেশ্যে আমার উপর হামলা করেছে। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ সন্দেহ ব্যক্ত করলেন, লোকটা ফেদায়ী হতে পারে। সুলতান বললেন, যে কারণেই হোক, লোকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। সুলতান হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকে বললেন, একে ভালভাবে জিজ্ঞাসাবাদ কর, তথ্য নাও।
দীর্ঘক্ষণ পর ডাক্তার সুলতান আইউবীর নিকট ফিরে এসে তথ্য প্রদান করেন, আপনার এই সিপাহীকে লাগাতার কয়েকদিন পর্যন্ত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং তার উপর হেপটানিজম প্রয়োগ করা হয়েছে। ডাক্তার তার নিঃশ্বাস কে বুঝতে পারেন যে, লোকটাকে নেশাকর দ্রব্য খাওয়ানো বা পান করানো হয়েছে। তিনি সুলতান আইউবীকে জানান, হেপটানিজম চিকিৎসা শাস্ত্রে বিস্ময়কর কোন বিষয় নয়। এর উদ্ভাবক হল হাসান ইবনে সাব্বাহ। আপনার হয়ত জানা আছে, হাসান ইবনে সাব্বাহ এক প্রকার নেশাকর শরবত আবিষ্কার করেছে। যে-ই তা পান করে, তার চোখের সামনে অত্যন্ত সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক দৃশ্য ভেসে ওঠে। সেই অবস্থায় যে কথাই তার কানে দেয়া হোক, তা তার সামনে বাস্তব সত্যরূপে প্রতিভাত হয়।.হাসান ইবনে সাব্বাহ এই নেশা আর হেপটানিজমেরই ভিত্তিতে একটি জান্নাত তৈরি করে রেখেছে, যাতে কেউ একবার প্রবেশ করলে আর বের হতে চায় না। সে মাটির চাকা আর কংকর মুখে দিয়ে মনে করে, অতি সুদ্বাদু খাবার খাচ্ছে। কাঁটার উপর দিয়ে হেঁটে মনে করে গালিচার উপর দিয়ে চলছে। হাসান ইবনে সাব্বাহ দুনিয়া থেকে চলে গেছে ঠিক, কিন্তু তার এই শরবত আর প্রক্রিয়া দুনিয়াতে রেখে গেছে। তার অনুসারীরা ঘাতক চক্র হিসেবে অবির্ভূত হয়েছে। এরা কার্যসিদ্ধির জন্য সুন্দরী নারী আর শরবতের ব্যবহার করে। আমি যতটুকু বুঝেছি, এই সিপাহী আপনাকে হত্যা করার লক্ষ্যে এই হেপটানিজম প্রক্রিয়ার শিকার।
ডাক্তার সিপাহীকে ঔষধ সেবন করান। অল্প সময়ের মধ্যেই ঔষধ ক্রিয়া করতে শুরু করে। সিপাহী শান্ত হয়ে গভীর ন্দ্রিায় ঢলে পড়ে। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ জানতে পারেন যে, সিপাহী ইতিমধ্যে চারদিনের ছুটিতে গিয়েছিল। কিন্তু ছুটিটা কোথায় কাটিয়ে এসেছে, তা কেউ জানে না। সর্পকেল্লা, সম্পর্কে শহরে যে গুজব ছড়িয়েছে, হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ গোয়েন্দা মারফত সে সংবাদ পেয়ে গেছেন। মানুষ বলাবলি করছে, সর্পকেল্লায় এক বুজুর্গ আত্মপ্রকাশ করেছেন, যিনি অদৃশ্যের খবর বলতে পারেন এবং মানুষের মনোবাসনা পূরণ করে দেন। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর এক গুপ্তচর রিপোর্ট করেছে, আমি কালো দাড়িওয়ালা এক বুজুর্গকে দু-দুবার দুর্গে ঢুকতে দেখেছি। কিন্তু হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। তিনি মনে করেছেন, এ ধরনের পীর-বুজুর্গদের উৎপাত-আনাগোনা তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অনেক সময় মানুষ উন্মাদ দেওয়ানাকে বুজুর্গ মনে করে তাদের পিছনে ছুটতে শুরু করে।
দুর্গের আশপাশে চলাচলকারী লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাদের এক ব্যক্তি জানায়, হ্যাঁ, আমি কালো দাড়ি ও সাদা চোগা পরিহিত এক ব্যক্তিকে দুর্গে আসা-যাওয়া করতে দেখেছি। এরূপ একাধিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ সেদিনই সূর্যাস্তের কিছু আগে একটি সেনাদল প্রেরণ করে কেল্লায় হানা দেন। সৈন্যরা মশাল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। দুর্গের অভ্যন্তরে আঁকা-বাঁকা পথ। বিধ্বস্ত দেয়াল ও ছাদের ধ্বংসাবশেষ। কয়েকটি কক্ষ এখনো অক্ষত আছে। সৈন্যরা দুর্গের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ এক কোন থেকে শোরগোল ভেসে আসে। কয়েকজন সিপাহী সেদিকে দৌড়ে যায়। ওখানে দুজন সিপাহী মাটিতে পড়ে তড়পাচ্ছে। তাদের বুকে তীর বিদ্ধ হয়ে আছে। ইতিমধ্যে আরো তিন-চারটি তীর ছুটে আসে। পড়ে যায় আরো তিন-চারজন সিপাহী। কয়েকজন সিপাহী এই ভয়ে পেছনে সরে যায় যে, এরা মানুষ নয়- ভূত-প্রেত হবে নিশ্চয়ই। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ ছিলেন বাস্তববাদী মানুষ। তিনি সিপাহীদের উৎসাহ প্রদান করে বললেন, এই তীর মানুষই ছুঁড়ছে। তিনি অবরোধের বিন্যাস পরিবর্তন করে ঘেরাও সংকীর্ণ করতে শুরু করেন। কিন্তু তারা কোথাও কোন মানুষ দেখতে পেলেন না। কেবল অজ্ঞাত স্থান থেকে দু-চারটি তীর ছুটে আসছে আর তাতে দু-চারজন সিপাহী জখম হচ্ছে।
