আমার প্রিয়াকে যে নিয়ে গেল, সে কে? সকেল্লার মহলের কক্ষে ফিরে এসে সিপাহী জিজ্ঞেস করে- আর আমি এসব কী দেখলাম?
তুমি তোমার অতীত জীবন দেখেছ- হযরত বললেন- আমি তোমাকে ফিরিয়ে এনেছি।
না, আমি ওখান থেকে ফিরে আসতে চাই না- অস্থির ও ব্যাকুল কণ্ঠে সিপাহী বলল- আমাকে ওখানেই পাঠিয়ে দিন।
ওখানে গিয়ে তুমি কী করবে?- হযরত জিজ্ঞেস করেন- যার জন্য যাওয়া, তাকে অন্য কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। সে তো এখন অন্যের দখলে। তুমি যতক্ষণ না তাকে হত্যা করবে, ততক্ষণ ওকে ফিরে পাবে না। আমি চাই তুমি কাউকে হত্যা কর। আর তুমি তাকে হত্যা করতে পারবেও না।
হযরত!- সিপাহী গর্জে ওঠে- কাউকে খুন করে যদি আমি পৈত্রিক সিংহাসন আর প্রেয়সীকে ফিরে পেতে পারি, তাহলে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর চেয়েও মর্যাদাবান এবং ক্ষমতাসম্পন্ন লোককে আমি খুন করব।
তারপর সেই খুনের দায় আমার ঘাড়ে চাপাবে, না দোস্ত! হযরত বললেন।
সিপাহী তার পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে মাথা ঠুকতে শুরু করে- হযরত! হযরত! বলে ক্রন্দন করতে থাকে।
হযরত সিপাহীকে আবার সেই জগতে পৌঁছিয়ে দেন, যেখানে তখতে সুলায়মানী ছিল, মহল ও বাগিচা ছিল। সিপাহীর কানে আওয়াজ আসতে শুরু করে- এই তো সেই ব্যক্তি, যে তোমার দাদাকে হত্যা করেছে, তোমার পিতাকে হত্যা করেছে। তোমার সিংহাসন ও মুকুট ছিনিয়ে নিয়েছে এবং তোমার প্রেয়সী এরই হাতে বন্দী।
না না, ইনি নন- সিপাহী ভয়জড়িত কণ্ঠে বলল- ইনি তো সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
আরে ইনিই তো তোমার ভাগ্যের হন্তা।- সিপাহীর কানে আওয়াজ আসতে শুরু করে- ইনি তোমার সুলতান হতে পারেন না। ইনি কুর্দী আর তুমি আরব। তুমি বল, সালাহুদ্দীন, আইউবী আমার দাদার ঘাতক, আমার পিতার ঘাতক, আমার সিংহাসন ও রাজমুকুট ছিনতাইকারী। ভেদ বেরিয়ে এসেছে, রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। তুমি প্রতিশোধ নাও। আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকে।
সিপাহী এই জাদুময় পরিবেশে চক্কর কাটছে আর জপ করছে- সালাহুদ্দীন আইউবী আমার দাদার হন্তারক, আমার পিতার ঘাতক, আমার সিংহাসন ও রাজমুকুট ছিনতাইকারী, আমার প্রেমের সংহারক, আমার ভাগ্যের খুনী।
এখন তার দৃষ্টির সামনে শুধুই সালাহুদ্দীন আইউবী। সালাহুদ্দীন আইউবী তার চোখের সামনে হাঁটছেন, চলাফেরা করছেন। সিপাহী হাতে খঞ্জর তুলে নিয়ে তার পেছনে পেছনে হাঁটছে। কিন্তু খুন করার মওকা পাচ্ছে না।
হঠাৎ প্রেয়সী মেয়েটি চোখে পড়ে সিপাহীর। পিঞ্জিরায় আবদ্ধ মেয়েটি। সালাহুদ্দীন আইউবী যেন পিঞ্জিরার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছেন। মেয়েটি সিপাহীর প্রতি করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সুলতান আইউবীর চেহারাটা ধীরে ধীরে হিংস্র হয়ে ওঠছে। সিপাহী বলা বন্ধ করে। এবার তার কানে শূন্য থেকে আওয়াজ ভেসে আসে- সালাহুদ্দীন আইউবী আমার দাদার ঘাতক, আইউবী আমার পিতার হন্তারক…।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিজ কক্ষে তার উপদেষ্টাবৃন্দ ও ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুদ্ধ বিষয়ে কথা বলছেন। নতুন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে, পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছেন তিনি। সর্পকেল্লায় গিয়ে আসা মোহাফেজ সিপাহী এই মুহূর্তে সুলতানের প্রহরায় বাইরে দণ্ডায়মান। দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর উপদেষ্টা প্রমুখ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। সুলতান আইউবী একাকী কক্ষে থেকে যান। সিপাহী হন হন করে কক্ষে ঢুকে পড়ে এবং সুলতানের মাথার উপর তরবারী উঁচিয়ে বলে ওঠে- তুমি আমার দাদার ঘাতক, তুমি আমার পিতার ঘাতক। সুলতান চকিতে তার দিকে ফিরে তাকান- ওকে মুক্ত করে দাও, ও আমার স্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে অতিশয় ক্ষোভের সাথে সিপাহী সুলতান আইউবীর উপর তরবারীর আঘাত হানে। সুলতানের হাতে কিছু নেই। তিনি কৌশলে আঘাত প্রতিহত করেন। সঙ্গে সঙ্গে চীৎকার করে রক্ষী কমান্ডারকে ডাক দেন এবং উঠে ছুটে গিয়ে নিজের তরবারীটা হাতে তুলে নেন। সিপাহী আরো অধিক ক্ষুব্ধ হয়ে পুনরায় আঘাত হানে। সিপাহীর টার্গেট যদি সুলতান আইউবী না হতেন, তাহলে তার মতো অভিজ্ঞ সৈনিকের একটি আঘাতও ব্যর্থ হতো না। সুলতান আইউবী শুধু তার আক্রমণ প্রতিহত করেন। নিজে একটি আঘাতও করলেন না। ডাক শুনে কমান্ডার যখন ছুটে আসে, তখন সুলতান তাকে বললেন, ওকে আঘাত কর না; অক্ষত ধরে ফেল।
সিপাহী চক্কর কেটে কমান্ডারের উপর আঘাত হানে। ইতিমধ্যে তিন চারজন বডিগার্ড কক্ষে ঢুকে পড়ে। সিপাহী এতই ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত যে, সে একের পর এক আঘাত হেনে কাউকেই তার কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। তার লক্ষ্য সুলতান আইউবীকে হত্যা করা। তাই তাকে উদ্দেশ করে গর্জন করে বলছে- তুমি আমার দাদার ঘাতক, আমার পিতার ঘাতক, তুমি আমার সিংহাসন ও রাজমুকুট কেড়ে নিয়েছ।
অবশেষে তাকে পাকড়াও করা হল। তার থেকে তরবারী ছিনিয়ে নেয়া হল।
ধন্যবাদ আমার মোহাফেজ!- সুলতান আইউবী ক্ষোভ জাহির করার পরিবর্তে সিপাহীর প্রশংসা করে বললেন- সালতানাতে ইসলামিয়ার জন্য তোমার মত দক্ষ অসিবাজের প্রয়োজন রয়েছে।
রক্ষী কমান্ডার ও অন্যান্য সিপাহীরা বিস্ময়ে হতবাক যে, ঘটনা কী ঘটল। সুলতান আইউবী কমান্ডারকে বললেন- ডাক্তার এবং হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকে এক্ষুণি নিয়ে আস।
