গতরাতের ন্যায় আজও আঁকাবাঁকা গলিপথ অতিক্রম করে সিপাহী মশলবাহী লোকটির পেছনে পেছনে হযরতের কক্ষের দরজার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। হযরত তাকে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি প্রদান করেন। সিপাহী কক্ষে ঢুকে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে এবং নিবেদন করে- হযরত! আমাকে কী দেখাবেন বলেছিলেন, দেখিয়ে দিন।
হযরত হাততালি দেন। সঙ্গে সঙ্গে গতরাতের মেয়েটি পাশের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। সিপাহীকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটি হাসি দেয় ভূবন মতানো হাসি। সিপাহী মেয়েটিকে নিজের কাছে বসানোর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। হযরত মেয়েটির প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন- লোকটা আজো এসে পড়েছে। আমি কি এখানে তামাশা দেখাতে বসেছি!
আপনি এই গুনাহগারকে ক্ষমা করে দিন- মেয়েটি বলল- লোকটা বড় আশা নিয়ে অনেক দূর থেকে এসেছে।
কিছুক্ষণ পর। কাঁচের ছোট্ট গোলকটি সিপাহীর হাতে। তার আগে মেয়েটি তাকে শরবত পান করিয়েছে। এখন তার পেছনে বসে পিঠটা নিজের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে বাহু দ্বারা তাকে জড়িয়ে রেখেছে, যেন মা তার শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। সিপাহী হযরতের সুরেলা কণ্ঠ শুনতে পায় আমি সুলায়মান বাদশাহর রাজপ্রাসাদ দেখতে পাচ্ছি। আমি সুলায়মান বাদশাহর সিংহাসন দেখতে পাচ্ছি। আওয়াজটা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকে, যেন বক্তা আস্তে আস্তে দূর থেকে দূরান্তে চলে যাচ্ছে।
উহ!- হতচকিত হয়ে সিপাহী বলল- এমন প্রাসাদ ইহজগতের কোন রাজা-বাদশাহর হতে পারে না।
আমি এই প্রাসাদে জন্মলাভ করেছিলাম- সিপাহী কারো কণ্ঠ শুনতে পায় আমি এই প্রাসাদেই জন্মলাভ করেছিলাম। পরক্ষণে এটি তার নিজের কণ্ঠে পরিণত হয়ে যায়। তারপর সে অনুভব করে, যেন তারই অস্তিত্বের মধ্যে এই আওয়াজটি সঞ্চারিত হচ্ছে আমি এই প্রাসাদে জন্মলাভ করেছিলাম।
কিন্তু পরক্ষণেই এখন আর কোন সাড়াশব্দ নেই। সিপাহী এখন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। এখন তার চোখের সামনে একটি মহল ভাসছে এবং নিজে তার বাইরে একটি বাগানের ভেতর ঘোরাফেরা করছে। এখন আর কাঁচের মধ্যদিয়ে নয়, এসব সে বাস্তবেই প্রত্যক্ষ করছে। ইচ্ছে করলে এখন সে বাগান, ফুল ইত্যাদি হাত দ্বারা স্পর্শ করতে পারে, শুঁকতে পারে। এখন সে কারো সিপাহী নয়- রাজপুত্র।
হঠাৎ মহলটি সিপাহীর দৃষ্টি থেকে উধাও হয়ে যায়। এখন সে বিস্ময়কর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তাকিয়ে দেখে, সে মেয়েটির কোলে বসে আছে। মেয়েটিকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে সে। মেয়েটি বলে- হযরতু বলে গেছেন, এই লোকটি (অর্থাৎ তুমি) রাজপুত্র ছিল। এখনো সে রাজপুত্র হতে পারে। তিনি জানতে চেষ্টা করছেন, তোমার সিংহাসন কে দখল করে আছেন। তিনি বলে গেছেন, তুমি যদি সাত-আট দিন এখানে থাক, তাহলে সবকিছু জানতে পারবে এবং তোমাকে সবকিছু দেখানো হবে।
***
পরের রাত। সিপাহী স্বপকেল্লার উক্ত কক্ষে উপবিষ্ট। চার দিনের ছুটি নিয়ে এসেছে সে। মেয়েটি আগের পেয়ালাটিতে করে তাকে শরবত পান করায় এবং কাঁচের বলটি তার হাতে দেয়। কারো কিছু বলার অপেক্ষা না করেই সে বলটি চোখের সামনে ধরে তার মধ্যদিয়ে দীপশিখা দেখতে থাকে। শিখার মধ্যে রং-বেরঙের আলোর খেলা দেখতে পায় সে। হযরত তার জাদুকরী ধারায় কিছু বলতে শুরু করেন। ইতিপূর্বে সে কয়েকবার এররূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রথম সে কাঁচের বলের মধ্যে তখৃতে সুলায়মান এবং দ্বিতীয়বার শাহে সুলায়মান দেখেছিল। কিন্তু পরক্ষণে আর তার হাতে বলটি থাকত না। বলটির মধ্যদিয়ে যখন সে কিছু দেখতে শুরু করত, তখনই হযরত কিংবা মেয়েটি সিপাহীর হাত থেকে বলটি নিয়ে যেত।
আজ তৃতীয় রাতে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। কালো দাড়িওয়ালা হযরত তার সামনে বসে পড়ে এবং তার চোখে চোখ রেখে জাদুকরী ভাষায় ক্ষীণ কণ্ঠে বলছে- এটি ফুল, এটি বাগিচা। আমি বাগানে আছি। দেখাদেখি সিপাহীও একই কথা উচ্চারণ করছে। মেয়েটি সিপাহীর গা ঘেঁষে বসে তার চুলে বিলি কাটছে।
সিপাহী একটি বাগিচা দেখতে পায়। বাগানটি উঁচু-নীচু, সর্বত্র ফুলের সমারোহ। যেদিকে চোখ পড়ে শুধু ফুল আর ফল। মন মাতানো সৌরভ মৌ মৌ করছে। সিপাহী দেখতে পায়, বাগিচার মধ্যে একটি মেয়ে পায়চারী করছে। মেয়েটি অত্যন্ত রূপসী। তার গায়ে এক রংয়ের পোশাক। কিন্তু তা দুনিয়ার কোন রং নয়। সিপাহী এখন সর্পকেল্লার কক্ষে নয়। কালো দাড়িওয়ালা হযরত আর সঙ্গের মেয়েটি থেকে সম্পূর্ণ বেখবর ও সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছে সে। বাগিচায় অপরূপ সুন্দরী মেয়েটিকে দেখে দুর্গ থেকে বেরিয়ে তার দিকে ছুটে যায়। মেয়েটিও তার দিকে দৌড়ে আসে। মেয়েটির শরীর থেকে ফুলের সৌরভ চুড়ি পড়ছে। সিপাহী সুলায়মান বাদশাহর বংশের রাজপুত্র। মেয়েটির সঙ্গে তাকে মানিয়েছে বেশ। দুজন বাগিচার এক কোণে চলে যায়। ওখানে গুহাসম একটি জায়গা। গুহাটিও ফুল দিয়ে সাজানো। মেঝেতে ঘাসের ন্যায় মখমল বিছানো।
ফুলসজ্জিত গুহার এক কোণ থেকে সুন্দর একটি কলসি বের করে আনে মেয়েটি। তার থেকে কি যেন ঢেলে পেয়ালায় নিয়ে সিপাহীর হাতে দেয়। মদ। মেয়েটির রূপ আর ভালবাসার নেশা সিপাহীকে আগে থেকেই মাতাল করে রেখেছে। এবার মদের নেশা তাকে আরো মাতাল করে তুলে। মেয়েটি বলল, তুমি থাক। আমি এক্ষুণি আসছি। বলেই স্থান ত্যাগ করে চলে যায়। মুহূর্ত পর সিপাহী মেয়েটির চীৎকার শুনতে পায়- আর্তচিৎকার। সিপাহী বাইরের দিকে ছুটে যায়। এদিক-ওদিক তাকায়। কিন্তু মেয়েটি নেই কোথাও। সে চিৎকারের শব্দ অনুসরণ করে দৌড়াতে থাকে। মেয়েটির হৃদয়বিদারক চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সিপাহী ক্ষুব্ধ হয়ে তরবারী হাতে নিয়ে মেয়েটিকে খুঁজতে থাকে। পাগলের ন্যায় ছুটাছুটি করছে সে। অবশেষে খুঁজতে খুঁজতে সিপাহী এক বৃদ্ধাকে দেখতে পায়। বৃদ্ধা তাকে জানায়, তুমি যাকে খুঁজছ, তাকে আর পাওয়া যাবে না। যে ব্যক্তি তোমার প্রেয়সীকে নিয়ে গেছে, সে তোমার চেয়ে বেশী শক্তিশালী। তাকে তুমি কোথাও খুঁজে পাবে না। তাকে যে নিয়ে গেছে, সে এখন সেই সিংহাসনে আরোহণ করবে, যেখানে, তোমার বসবার কথা ছিল। ছুটাছুটি করে লাভ নেই। বেঁচে থাক, সময় সুযোগ মতো তাকে খুন করে তোমার প্রিয়াকে উদ্ধার করে এন। মেয়েটি তোমার বিরহে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
