তন্দ্রাভাব কেটে যায় সিপাহীর। এখন সে প্রকৃতিস্থ। মেয়েটি তার মাথায় হাত বুলাচ্ছে। চোখ খুলে দেখতে পায়, সে জাজিমের উপর বসে আছে। মেয়েটির একটি বাহু তার মাথার নীচে। মেয়েটি আধা শোয়া আধা বসা। সিপাহী উঠে বসে। রাজ্যের বিস্ময় তার মাথায়, বেজায় অস্থির। তার মুখ থেকে প্রথম কথা বের হয়। তিনি বলছিলেন, এটি তোমার দাদার সিংহাসন। এটি তোমার পৈত্রিক সম্পদ।
হরতও একথাই বলেছেন। মেয়েটি অত্যন্ত কোমল ও আন্তরিক কণ্ঠে বলল।
হযরত কোথায়? সিপাহী জিজ্ঞেস করে।
তিনি আজ আর তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না। মেয়েটি জবাব দেয়।
তুমি বলেছিলে রাতের শেষ প্রহরে তোমার ডিউটি আছে। সেজন্য আমি তোমাকে জাগিয়ে দিলাম। এখন মধ্যরাত। তুমি এবার চলে যাও।
সিপাহী ওখান থেকে উঠতে চাচ্ছে না। সে মেয়েটির নিকট জানতে চায় আমি স্বপ্ন দেখলাম, না বাস্তব।
মেয়েটি বলল- না, তুমি স্বপ্ন দেখনি, এটা হযরতের বিশেষ কেরামত। তার প্রতি নির্দেশ, তিনি কোন ভেদ নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। যার ভেদ তার নিকট পৌঁছিয়ে দেবেন। কিন্তু এই হালত তার মাঝে-মধ্যে দেখা যায়, সব সময় থাকে না। আবার কখন দেখা দেবে বলতে পারব না।
সিপাহী মেয়েটির কাছে অনুনয়-বিনয় করতে শুরু করে। মেয়েটি বলল, তুমি আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছ। আমার আত্মাটা আমি তোমার হাতে তুলে দিয়েছি। আমি প্রয়োজন হলে তোমার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেব। আমি তোমাকে কোনদিন যেতে দেব না। কিন্তু তোমার কর্তব্য পালন করাও তো জরুরী। এখন চলে যাও। আগামী রাতে আবার এস। আমি হযরতকে ব, যেন তিনি তোমার ভেদ তোমাকে দিয়ে দেন।
সিপাহী দুর্গ থেকে বের হয়। তার পা উঠছে না। তার মস্তিষ্কে দাদার তখতে সুলায়মানী জেঁকে বসেছে। হৃদয়টা দখল করে আছে মেয়েটা। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত। কিন্তু দুর্গের ধ্বংসস্তূপটা তার কাছে রাজমহলের ন্যায় হৃদয়কাড়া মনে হচ্ছে। আনন্দের ঢেউ খেলছে তার মনে। এখন তার মনে কোন ভীতি নেই, অস্থিরতা নেই।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পূর্ণ দৃষ্টি সৈন্যদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ পরিকল্পনায় নিবদ্ধ। তিনি নিজের ও ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের আরাম হারাম করে রেখেছেন। ইন্টেলিজেন্স ইনচার্জ হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ শত কর্মব্যস্ততার মধ্যে এ চিন্তাও মাথায় রেখেছেন যে, সুলতান আইউবী নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে সবসময় উদাসীন থাকেন। তার দেহরক্ষী কমান্ডার একাধিকবার হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর নিকট অভিযোগ করেছেন যে, সুলতান অনেক সময় তাকে কিছু না জানিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যান এবং তিনি ভেতরে আছেন মনে করে আমরা শূন্যকক্ষ পাহারা দেই। কমান্ডার সুলতান আইউবীর সঙ্গে দু-চারজন গার্ড ছায়ার মত জড়িয়ে রাখতে চায়। কমান্ডারকে সতর্ক করা হয়েছিল যে, ফেদায়ী ঘাতকদল পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে সুলতান আইউবীকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে দামেস্কে ঢুকেছে। এই সংবাদ কমান্ডারকে আরো বেশী পেরেশান করে তুলে। কিন্তু সুলতান আইউবী নিজে এতই বেপরোয়া যে, হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ যখন তাকে বললেন, মহামান্য সুলতান! আপনি কখনো গার্ড ছাড়া বের হবেন না। তখন সুলতান মুখে মুচকি হাসি টেনে তার পিঠ চাপড়ে বলেন, আমাদের প্রত্যেকের জীবন আল্লাহর হাতে। রক্ষীদের উপস্থিতিতে খুন করার উদ্দেশ্যে আমার উপর চারবার হামলা, হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর অভিপ্রায় ছিল, আমি আরো কদিন বেঁচে থাকব। আমি আল্লাহর পথে চলছি। তিনি যদি ভিন্ন কিছু কামনা করেন, তাহলে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা কিছুই করতে পারব না। মোহাফেজরা পারবে না আমার মৃত্যু ঠেকিয়ে রাখতে।
কিন্তু তারপরও মোহতারাম সুলতান!- হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ বললেন আমার এবং রক্ষী বাহিনীর কর্তব্য তো এমন যে, আমরা আপনার বিশ্বাস ও আবেগের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারি না। আমি ফেদায়ীদের সম্পর্কে যে তথ্য পেয়েছি, তাতে রাতেও আমাকে আপনার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত।
আমি তোমার ও তোমার রক্ষী বাহিনীর কর্তব্যবোধকে শ্রদ্ধা করি সুলতান আইউবী বললেন- কিন্তু যখন আমি মোহাফেজবেষ্টিত হয়ে বাইরে বের হই, তখন আমার নিকট মনে হয় যেন জনগণের উপর আমার কোন আস্থা নেই। নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের অভাব থাকলেই কেবল শাসকগোষ্ঠী জনগণকে ভয় করে থাকে।
ভয় জনগণের নয় মাননীয় সুলতান!- হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ বললেন আমি ফেদায়ীদের প্রসঙ্গে বলছি।
ঠিক আছে, আমি সাবধান থাকব। সুলতান আইউবী হেসে বললেন।
সর্পকেল্লা থেকে ফিরে এসে রক্ষী সিপাহী তার ডিউটিতে চলে যায়। দিনটা সে এই মানসিক অবস্থার মধ্যে কাটায় যে, কল্পনায় তখুতে সুলায়মান ও মেয়েটিকে দেখতে থাকে। সন্ধ্যা গম্ভীর হওয়ামাত্র আবার সে দুর্গ অভিমুখে হাঁটা দেয়। এবার তার মনে কোন ভয় নেই। দুর্গের ফটক অতিক্রম করে অন্ধকারে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে বলল- আমি এসে পড়েছি। অগ্রসর হতে পারি কি?
তাকে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। সে মশালের আলো দেখতে পায়। মশালটা তার থেকে খানিকটা দূরে এসে থেমে যায়। মশালধারী বলল- কক্ষে ঢুকে অবশ্যই হযরতের পায়ে সিজদা করবে। আজ তিনি কাউকে সাক্ষাৎ দিতে রাজি নন, তুমি যখন এসে পড়েছ, তোমার জন্য ব্যবস্থা করা হবে।
