সিপাহী বলল, হ্যাঁ, আমিই সেই লোক।
মশালবাহী লোকটি বলল, আমার পেছনে পেছনে আস।
তুমি কি মানুষ? ভয়জড়িত কণ্ঠে সিপাহী তাকে জিজ্ঞেস করে।
তুমি চোখে যা দেখছ, আমি তা-ই। মন থেকে ভীতি দূর করে ফেল। মাথা থেকে সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেল। চুপচাপ আমার পেছনে পেছনে আস মশালবাহী লোকটি সম্মুখের দিকে হাঁটছে আর কথা বলছে- তুমি হযরতকে কোন কথা জিজ্ঞেস করবে না। তিনি যা নির্দেশ দেন, তা-ই করবে।
ঘোর অন্ধকার। ছাদটকা আঁকা-বাঁকা সরু পথ। ডান-বাম করে কয়েকটি রাস্তা অতিক্রম করে মশালবাহী লোকটি একটি দরজার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং উচ্চস্বরে বলে, হযরত! অনুমতি হলে তাকে নিয়ে আসি। ভেতর থেকে জবাব আসে, আস। মশালবাহী একদিকে সরে যায় এবং সিপাহীকে ইঙ্গিতে বলে, যাও, ভেতরে চলে যাও।
সিপাহী ভেতরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু কী আশ্চর্য! এই ভয়ানক স্থানে আকর্ষণীয় মহামূল্যবান জিনিসপত্রে সাজানো মনোরম এক কক্ষ যুগপৎ বিস্ময় ও ভীতি চেপে ধরে সিপাহীকে। একধারে অদৃশ্যপূর্ব কারুকার্যখচিত নয়ন মাতানো একটি পালংক। তাতে ততোধিক মনোহরী জাজিম বিছানো। তার উপর তাকিয়ায় হেলান দিয়ে গুরুগম্ভীর মুখে বসে আছে সেই ব্যক্তি। চোখ বন্ধ করে তাসবীহ যপ করছে লোকটি। সে-ই ইঙ্গিতে সিপাহীকে বসতে বলল। সিপাহী বসে যায়। মন মাতানো সুগন্ধিতে মৌ মৌ করছে কক্ষটি।
হযরত চোখ খোলেন, সিপাহীর প্রতি তাকান এবং হাতের তাসবীহটি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, গলায় পরে নাও। সিপাহী তসবীহটি হাতে নিয়ে চুমো খায়। তারপর গলায় পরিধান করে নেয়। কক্ষে মিটমিট করে একটি প্রদীপ জ্বলছে। হযরত হাত তালি দেন। সঙ্গে সঙ্গে পাশের আরেকটি কক্ষের দরজা খুলে যায়। একটি মেয়ে বেরিয়ে আসে। অপরূপ সুন্দরী এক যুবতী। মাথার চুলগুলো খোলা। সোনালি তারের ন্যায় ঝিকমিক করছে। চুলগুলো ছড়িয়ে আছে দুকাঁধের উপর। এমন রূপসী মেয়ে এর আগে কখনো সিপাহী দেখেনি। মেয়েটির হাতে সুদর্শন একটি পেয়ালা। পেয়ালাটা সিপাহীর তাতে দেয় সে। হযরত বসা থেকে উঠে দাঁড়ান। চলে যান অন্য কক্ষে। সিপাহী পেয়ালাটা হাতে নিয়ে একবার মেয়েটির প্রতি একবার পেয়ালার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। মুখ খুলে মেয়েটি। বলল- হযরতের আসতে একটু দেরী হবে। তুমি এগুলো পান কর। মেয়েটির ঠোঁটে হাসি- মন মাতানো অকৃত্রিম হাসি। সিপাহী পেয়ালাটা ঠোঁটের সঙ্গে লাগায় এবং এক ঢোক পান করে মেয়েটির প্রতি তাকায়।
তোমার মতো সুশ্রী যুবক আমি মাঝে-মধ্যে দেখি- সিপাহীর কাঁধে হাত রেখে মেয়েটি বলল- পান কর! এই শরবত আমি তোমার জন্য মনের মাধুরি মিশিয়ে তৈরি করে এনেছি। হযরত আমাকে বলেছিলেন, আজ রাতে তোমার পছন্দের এক যুবক আসবে; কিন্তু আমি ছেলেটার পরিচয় জানি না।
সিপাহী প্রথমে থেমে থেমে দুতিন চুমুক পান করে। তারপর ঢক ঢক করে গিলতে শুরু করে। পেয়ালাটা শূন্য হয়ে যায়। মেয়েটি ধীরে ধীরে সিপাহীর একেবারে গা ঘেঁষে বসে। সিপাহী অনুভব করে, মেয়েটি তার তেলেসমাতী রূপ আর জাদুকরী দেহটা নিয়ে শরবতের ন্যায় তার কণ্ঠনালী অতিক্রম করে শিরায় শিরায় মিশে গেছে।
হযরত ফিরে এসেছেন। তার হাতে কাঁচের একটি বল, আকারে যেন একটি নাশপতী। তিনি বলটি সিপাহীর হাতে দিয়ে বললেন, এটি চোখের সামনে ধর। এর ভেতর দিয়ে প্রদীপের শিখার দিকে তাকাও এবং তাকিয়ে থাক।
সিপাহী কাঁচের বলটির মধ্যদিয়ে প্রদীপের দিকে তাকায়। তাতে চোখের সামনে কয়েকটি রংও শিখায় দেখতে পায়। মেয়েটির রেশমী এলোমেলো চুল তার গন্ত স্পর্শ করেছে। মেয়েটি তাকে এমনভাবে বাহুবন্ধনে আগলে রেখেছে যে, সিপাহী তার দেহের উষ্ণতা ও সুবাস অনুভব করছে। এবার তার কানে জাদুকরী এক সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসতে শুরু করে- আমি সুলায়মানের সিংহাসন দেখতে পাচ্ছি। আমি সুলায়মানের সিংহাসন দেখতি পাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর্যন্ত সে অনুভব করে কণ্ঠটা হযরতের। কিন্তু পরক্ষণেই সেটি তার নিজের কণ্ঠে পরিণত হয়ে যায়। সিপাহী এখন সেই জগতের বাসিন্দা, যা সে কাঁচের বলের মধ্যদিয়ে দেখছিল। সিপাহী সুলায়মানের সিংহাসন দেখতে পাচ্ছে। নূরানী চেহারার এক বাদশাহ তার উপর বসে আছেন। তার ডানে বামে ও পেছনে চার-পাঁচটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েগুলো এতই রূপসী যে, মনে হচ্ছে হুর-পরী।
হ্যাঁ হ্যাঁ- সিপাহী বলে ওঠল- আমি সুলায়মানের সিংহাসন দেখতে পাচ্ছি।
মেয়েটির বিক্ষিপ্ত চুলগুলো সিপাহীর বুকে-পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে। সিপাহী কাঁচের মধ্যে দেখছে, সুলায়মানী সিংহাসনের নিকটে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি বলছে- এই রাজা তোমার দাদা, যিনি সাত রাজ্যের বাদশাহ। সুলায়মান বাদশাহর জিন-পরীরা তার দরবারে সিজদা করে। তুমি তোমার দাদাকে চিনে নাও। এই সিংহাসন তোমার উত্তরাধিকার সম্পদ।
সিংহাসনটা সিপাহীর চোখের সম্মুখ থেকে সরে যেতে শুরু করে। সিপাহী চীৎকার করে ওঠে- উনি সিংহাসন নিয়ে গেলেন। ওরা দৈত্য। অনেক বড় বড়। ওরা সিংহাসনটা তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
এখন কাঁচের বলের মধ্যে কয়েক বর্ণের কতগুলো শিখা রয়ে গেছে শুধু। শিখাগুলো তিরতির করে কাঁপছে, যেন উদ্বেলিত হয়ে নাচছে। সিপাহী অনুভব করে, যেন কোন বস্তু তার নাকের সঙ্গে লেপটে আছে। কাঁচের বলটি তার চোখের সামনে থেকে আপনা-আপনি সরে যায়। সিপাহী তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
