বাগদাদ- মিষ্টি ভাষায় সিপাহী জবাব দেয়- আপনি আমাকে চেচেন নাকি?
হ্যাঁ, দোস্ত! আমি তোমাকে চিনি- আগন্তুক জবাব দেয়। তবে বোধ হয়। তুমি নিজেকে চেন না।
লোকটি যে ধারায় কথা বলছে, তাতে সিপাহী প্রভাবিত হয়ে পড়ে। বস্তুত তার নূরানী চেহারা, আকর্ষণীয় দাড়ি, সাদা পোশাক ও পাগড়ী যে কোন মানুষকে প্রভাবিত না করে পারে না। এসব না থাকলে হয়ত সিপাহী তাকে মাতাল বলে এড়িয়ে যেত। কিন্তু লোকটার ভাবভঙ্গি, পোশাক-পরিচ্ছদ ও কথার ধরণ সুলতান আইউবীর সৈনিককে কাবু করে ফেলে।
আচ্ছা, তুকি কি তোমার পূর্বপুরুষকে জান, তারা কারা ছিলেন এবং কী ছিলেন? লোকটি সিপাহীকে জিজ্ঞেস করে।
না! সিপাহী জবাব দেয়।
দাদার কথা জান না?
না।
তোমার পিতা বেঁচে আছেন?
না।- সিপাহী জাৰাব দেয়- আমি যখন দুধের শিশু, তখনই তিনি মারা যান।
তোমার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কি রাজা ছিলেন?- আগুন্তুক জিজ্ঞেস করে- পরদাদা?
কেউ নয়, সিপাহী জবাব দেয়- আমি কোন রাজবংশের সন্তান নই। আমি সুলতান সালাহউদ্দীন আইউবীর রক্ষী বাহিনীর একজন সাধারণ সৈনিক। আপনি বোধ হয় ভুল করছেন। আমার গঠন-আকৃতির সঙ্গে আপনার পুরনো কোন বন্ধুর মিল আছে হয়ত। আপনি আমাকে অন্য কেউ মনে করেছেন।
লোকটি এমন ভাব দেখায়, যেন সে সিপাহীর কথাটা শুনেইনি। তার হাত ধরে ডান হাতের তালুর রেখাগুলো গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। তারপর তার কাঁধে হাত রেখে মাথাটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে ঝুঁকে তার মুখমণ্ডলের প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মধুর ভাষায় ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে বলে- তবে এই সিংহাসনে আমি কাকে দেখতে পাচ্ছি। এই মুকুটটার মালিক কে? তোমাকে কে বলল, তুমি রাজবংশের সন্তান নও? আমার বিদ্যা আমাকে ধোকা দিতে পারে না। আমার চোখ ভুল দেখতে পারে না। আচ্ছা, তুমি কি বিয়ে করেছ
না। সিপাই ভয়ার্ত কণ্ঠে জবাব দেয়- বংশের একটি মেয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে আছে।
হবে না লোকটি বলল- এই বিয়ে হবে না।
কেন? চকিত হয়ে সিপাহী প্রশ্ন কর।
তোমার জুড়ি অন্য কোথাও লোকটি বলল- কিন্তু মেয়েটি অন্যত্র আটক পড়ে আছে। শোন বন্ধু! তুমি মজলুম, প্রতাণার শিকার। তুমি বিভ্রান্ত। তোমার ধনভাণ্ডারের উপর সাপ বসে আছে। একজন রাজকন্যা তোমার পথপানে তাকিয়ে আছে। কেউ যদি তোমাকে তথ্য প্রদান করে, মেয়েটি কোথায়, তাহলে কি তুমি জীবনের বাজি রেখে তাকে উদ্ধার করবে?
এই বলে লোকটি যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে হাঁটা দেয়।
সিপাহী ছুটে গিয়ে তার পথরোধ করে দাঁড়ায় এবং বলে- আমার হাত ও চোখে আপনি কী দেখেছেন? আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? আপনি আমাকে কেন বিভ্রান্ত ও অস্থির করে চলে যাচ্ছেন!
আমি কিছুই নই লোকটি জবাব দেয়- আমার আল্লাহর সত্ত্বাই সবকিছু। গোটা তিন-চারেক মহান পবিত্র আত্মা আমার হাতে আছে। এরা আল্লাহ পাকের সেই প্রিয়জনদের আত্মা, যারা অতীত ও ভবিষ্যতকে সমানভাবে জানতেন। আমি কিছু অজিফা পালন করি। এক রাতে আমি নির্দেশ পাই যে, তুমি সর্পকেল্লায় চলে যাও। একব্যক্তি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। ওখানে যেতে আমি ভয় পেতাম। কিন্তু এটা খোদার নির্দেশ। কাজেই এখন আর ভয় কিসের। আমি সর্পকেল্লায় চলে গেলাম। প্রথম রাতেই অজিফা যপকালে আত্মাগুলো পেয়ে যাই। তারা আমাকে এমন শক্তি দান করে যে, আমি মানুষের চেহারা ও চোখের প্রতি তাকালে তাদের দাদা ও পরদাদার ছবি দেখতে পাই। কিন্তু এই অবস্থা সবসময় থাকে না। মাঝে-মধ্যে দেখা যায়। তোমাকে দেখামাত্র আমার কানে একটি আত্মার কণ্ঠ ভেসে আসে। এই যুবকটিকে দেখ! ছেলেটা রাজপুত্র। কিন্তু সে তার ভাগ্যলিপি সম্পর্কে অনবহিত। রাজপুত্র হওয়া সত্ত্বেও সে সিপাহী বেশ ধারণ করে অন্যের সুরক্ষার জন্য পাহারাদারী করে। এখন আমার সেই অস্বাভাবিক অবস্থা চলে গেছে, এখন আমি তোমাকে একজন সিপাহীরূপেই দেখছি। আমি জ্যোতিষী নই, গায়েবও জানি না। আমি একজন দরবেশ মাত্র। আল্লাহ-বিল্লাহ করে দিন কাটাই। কিন্তু তারপরও আবদার যখন করেছ, কিছু জানার চেষ্টা করব এবং আমি যেখানকার কথা বলি, তোমাকে সেখানে যেতে হবে। পারবে বেটা?
হ্যাঁ, পারব! আপনি যথায় বলেন, তথায়ই গিয়ে আমি হাজির হব।
সর্পকেল্লায় এসে পড়।
ঠিক আছে আসব, অবশ্যই আসব।
পাকসাফ হয়ে মন-মস্তিষ্ককে দুনিয়ার ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত করে আসবে। খবরদার, কাউকে বলবে না, আমার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল এবং রাতে তুমি কোথাও যাচ্ছ। একদম চুপি চুপি এসে পড়বে। বলল লোকটি।
***
ধনভাণ্ডার, রাজকন্যা ও সিংহাসনের লোভে না পেলে সুলতান আইউবীর এই সৈনিক যত সাহসীই হোক রাত্রিকালে স্বৰ্পকেল্লায় যেত না। রাতের শেষ প্রহরে সুলতান আইউবীর বাসগৃহের পেছন দরজায় তার পাহারা ছিল। তার পূর্ব পর্যন্ত পুরো রাত তার ঘোরাফেরা করার সুযোগ রয়েছে। রাত খানিকটা গম্ভীর হলে সিপাহী চুপি চুপি স্বৰ্পকেল্লা অভিমুখে হাঁটা দেয়। কেল্লার দ্বার পর্যন্ত পৌঁছামাত্র ভয়ে তার গা ছমছম করে ওঠে। দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে- আমি এসে গেছি, আপনি কোথায়?
তাকে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। কোথা থেকে একটি মশাল বেরিয়ে আসে এবং তার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। তার মনের ভয় আরো বেড়ে যায়। সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে ওঠে। মশালটি এক ব্যক্তির হাতে। লোকটি নিকটে এসে সিপাহীকে জিজ্ঞেস করে, হযরত আজ পথে কোথাও কাকে দেখেছিল, তুমিই কি সেই লোক?
