পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য কতজন করে পাঠাতে হবে সুলতান পত্রে তাও উল্লেখ করেন। সঙ্গে এই নির্দেশনাও প্রদান করেন যে, সকল সৈন্য যেন একত্রে না আসে। বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে রাতের বেলা একদল অপরদল থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পথ চলবে। দিনে সফর বন্ধ রাখবে। এই ফোর্স আগমন যথাসম্ভব গোপন রাখবে।
আল-আদেল তাঁর ভাই সালাহুদ্দীন আইউবীরই হাতে গড়া। পয়গাম পাওয়ামাত্র তিনি বাহিনী রওনা করিয়ে দেন এবং বিষয়টা গোপন রাখার জন্য পন্থা অবলম্বন করেন যে, কয়েকজন সেনা সদস্যকে ছদ্মবেশে উটে চড়িয়ে এই নির্দেশনা দিয়ে রাস্তায় পাঠিয়ে দেন, তোমরা ডানে-বাঁয়ে ছড়িয়ে গিয়ে পরস্পর দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করবে। কোন সন্দেহভাজন লোক দেখলে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। প্রয়োজন বোধ করলে গ্রেফতার করে ফেলবে।
বাহিনীর সৈন্যরা দিন কয়েক পরই দামেস্ক পৌঁছতে শুরু করে। সুলতান আইউবী তাদেরকেও রাতের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তার সঙ্গে তিনি নতুন ভর্তিরও নির্দেশ জারি করেন।
***
দামস্কের প্রত্যন্ত এলাকা। ঘন বনজঙ্গল আর খানাখন্দকে ভরা গোটা অঞ্চ সেখানে শত শত বছরের পুরাতন একটি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান। তার অভ্যন্তরে কেউ কখনো অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানা যায়নি। রাতে মানুষ তার পাশ দিয়েও হাঁটে না। দুৰ্গটা এক সময় সামরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও এখন তা ব্যবহারের অনুপযুক্ত। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও স্থানটি অনুপযোগী। সে কারণে দেশের সামরিক বাহিনীর কখনো সেদিকে চোখ যায়নি। সুলতান আইউবীর আমলে দামেস্কের প্রতিরক্ষার জন্য অন্যত্র একটি দুর্গ তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। এই পুরাতন দুর্গটি সর্পকেল্লা নামে পরিচিত। কথিত ছিল যে, দুর্গের ভেতর এক জোড়া নাগ-নাগিনী বাস করে। তাদের বয়স হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। এও বলা হত যে, দুর্গটি সেকান্দারে আজম নির্মাণ করেছিলেন। কারো মতে, ইরানের বাদশা দারা এর নির্মাতা। অনেকের মতে, দুর্গটি তৈরি করেছিল বনী ইসরাঈল।
সে যা হোক, এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, কয়েকশ বছর আগে এখানে এক পারস্য রাজা আগমন করেছিলেন। জায়গাটা তার পছন্দ হয়ে গেলে তিনি এখানে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন এবং তার অভ্যন্তরে নিজের জন্য একটি মনোরম মহল তৈরি করেন। কিন্তু মহলটি আবাদ করার জন্য তার কোন স্ত্রী ছিল না। খুঁজে পেতে তিনি এক রাখাল কন্যাকে পছন্দ করেন। কিন্তু মেয়েটি ছিল অন্য এক যুবকের বাগদত্তা। দুজনের মধ্যে ছিল গভীর ভালবাসা। রাজা মেয়েটির পিতামাতাকে অগাধ সম্পদ দিয়ে বাগিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে নেয়। যুবক বাদশার নিকট এসে বলল, মহারাজ! শখ করে মহল নির্মাণ করেছেন এবং আমার বাগদত্তা প্রেমিকাকে ছিনিয়ে এনেছেন। কিন্তু এই দুর্গে বাস করা আপনার কপালে জুটবে না। আপনি এখানে থাকতে পারবেন না। যুবকের কথায় বাদশা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে দুর্গে নিয়ে হত্যা করে ফেলে এবং লাশটা নিকটেই এক স্থানে পুঁতে রাখে। অপরদিকে মেয়েটি বাদশাকে বলল, আপনি আমার দেহটা ক্রয় করেছেন, আমার হৃদয়টাকে কখনোই আপনি দখল করতে পারবেন না।
বাদশাহ রাখাল কন্যাকে রাজকীয় সাজে সাজিয়ে প্রথম দিনের মতো মহলে প্রবেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে মহলের মেঝে ধসে যায়, ছাদ ও দেয়াল তাদের খার উপর ভেঙ্গে পড়ে। দুজনই মহলের ছাদ ও দেয়াল চাপা পড়ে মারা যায়। বাদশাহর সেনাদল ছুটে এসে মহলের ধ্বংসাবশেষ সরাতে শুরু করে। এসময় ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে দুটি নাগ বেরিয়ে আসে। সেনারা তাদেরকে তীর-ধনুক আর তরবারী দ্বারা মারার চেষ্টা করে। কিন্তু নাগ দুটোর গায়ে না লাগে বর্শা, না বিদ্ধ হয় তীর, না আঘাত হানে তরবারী। বাদশার সেনাদল ভয়ে পালিয়ে যায়। এ কথাও প্রসিদ্ধ ছিল যে, এখনো রাতের বেলা দুর্গের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে রাখালের পোশাক পরিহিত একটি মেয়েকে ভেড়া চড়াতে দেখা যায়। মাঝে-মধ্যে একটি যুবক চোখে পড়ে। এক কথায়, সবাই বিশ্বাস করত যে, দুৰ্গটা জ্বিন-পরীর আবাস।
সুলতান আইউবী যে সময়টায় খলীফা ও আমীরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন, ঠিক তখন দামেস্কে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, সর্পকেল্লায় এক বুজুর্গ আত্মপ্রকাশ করেছেন, যিনি দুআ করলে মানুষের সব রোগ ভাল হয়ে যায় এবং তিনি ভবিষ্যতের সংবাদ বলে দিতে পারেন। কে একজন শহরে সংবাদটা বলামা মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের ন্যয় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে তাকে ইমাম মাহদী আখ্যা দিতে ভুল করেনি। মানুষ সেখানে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আবার এই ভয়ে পিছিয়ে যায় যে, ওটা রাখালের কন্যা ও তার বাগদত্তার কিংবা পারস্যের রাজার প্রেতাত্মা কিনা! নাকি জ্বিন-ভুতের কারসাজি। অনেকে দূরে দাঁড়িয়ে দুর্গের দিকে তাকায়, কিছু দেখা যায় কিনা। জনা তিন-চারেক লোক দাবি করে, তারা কালো দাড়ি ও সাদা চোগা পরিহিত এক ব্যক্তিকে দুর্গের বাইরে আসতে এবং সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকে যেতে দেখেছে। মানুষ বুজুর্গের কারামত নিয়ে বলাবলি করছে। কিন্তু এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, যে বলবে, আমি দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করেছি এবং বুজুর্গ লোকটি আমার জন্য দুআ করেছেন।
একদিনের ঘটনা। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর রক্ষী বাহিনীর এক সিপাহী ডিউটি পালন শেষে বাইরে ঘোরাফেরা করছিল। লোকটার সুদর্শন চেহারা, সুঠাম দেহ। তাঁগড়া যুবক। হঠাৎ সম্মুখ থেকে নূরানী চেহারার এক ব্যক্তি এগিয়ে আসে। মুখে কালো দাড়ি, পরনে সাদা চোগা, মাথায় অতীব আকর্ষণীয় পাগড়ি, হাতে তসবীহ। সিপাহীর সামনে এসেই লোকটি দাঁড়িয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে চিবুক ধরে সামান্য উপরে তুলে আবার ছেড়ে দেয়। তারপর ক্ষীণকণ্ঠে বলল, আমি কখনো ভুল করি না; তোমার বাড়ি কোথায় দোস্ত?
