আমার দ্বিতীয় মূলনীতি হল, তোমরা ইসলামী সাম্রাজ্য ও দেশের জনগণের ইজ্জতের প্রহরী। তোমাদের শাসকগোষ্ঠী যদি আত্মমর্যাদা হারিয়ে ফেলে, জাতি যদি পাপ করতে করতে ধ্বংস হয়ে যায় এবং দুশমন তোমাদের উপর জয়ী হয়, তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম বলবে, এই জাতির সৈন্যরা অযোগ্য ও দুর্বল ছিল। মনে রাখবে, জয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্ত হয় যুদ্ধের মাঠে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর বিলাস-প্রিয়তা ও স্বার্থপরতা দেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু পরাজয়ের দায় চাপানো হয় সেনাবাহিনীর কাঁধে। কাজেই, তোমাদের যে খলীফা ও শাসকগোষ্ঠী জাতিকে লাঞ্ছনায় নিক্ষিপ্ত করার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দাও। আমি যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি, তার রূপ কেমন হবে, তা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। আমি শুধু এটুকু জানি, একটি ভয়াবহ ও কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হবে। কঠিন এই অর্থে যে, আমি তোমাদেরকে চরম এক সংকটাপূর্ণ অবস্থায় লড়াচ্ছি। আরেক সমস্যা হল, তোমাদের সংখ্যা কম। সংখ্যার এই অভাব পুষিয়ে নিতে হবে জযবা ও ঈমানী শক্তি দ্বারা।
সুলতান আইউবী কমান্ডারদের এ-ও অবহিত কবেন যে, তোমাদের মধ্যে দুশমনের চর ঢুকে আছে। তারা কি কি পন্থায় কাজ করছে, তিনি তারও বিবরণ প্রদান করেন।
***
তোমরা বিশ্বাস কর না যে, সালাহুদ্দীন আইউবী মুসলমান- হাবে নিজ সৈন্যদেরকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে এক আমীর বলল- খলীফার মর্যাদা একজন নবীর সমান। নাজমুদ্দীন আইউবীর এই মুরতাদ ছেলেটা খলীফাকে করে খেলাফত থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে এবং সিরিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মিশর ও সিরিয়ার রাজা হয়ে বসেছে। তোমরা যদি খোদার আজাব-গযব থেকে রক্ষা পেতে চাও, প্রলয়ংকারী ভূমিকম্প ও ব্যাপক বিধ্বংসী জলোচ্ছাস থেকে নিরাপদ থাকতে চাও, তাহলে সালাহুদ্দীন আইউবীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে সালতানাতের গদি ফিরিয়ে আন। শীতকাল শেষ হলেই আমরা দামেস্কে আক্রমণ করব। তার আগে আমরা সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করব এবং তোমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নিতে থাক।
একটি জাতির চরিত্র ও চিন্তা-চেতনা ধ্বংস করতে না পারলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়লাভ করা যায় না- আল-মালিকুস সালিহর নিকট রেমন্ড কর্তৃক প্রেরিত খৃস্টান সেনাবাহিনীর এক সামরিক উপদেষ্টা বলল- আমরা তোমাদের এলাকায় এসে যুদ্ধ করব না। আইউবীর সাহায্যে মিশর থেকে যে বিশেষ ফোর্স আগমন করবে, আমরা পথে তাদেরকে প্রতিহত করব এবং সুযোগমত আইউবীকে কোথাও ঘিরে ফেলব। আপনার বাহিনী দামেস্কে হামলা করবে। শীতের মওসুমে না আপনি হামলা করতে পারবেন না- না আইউবী। এই সময়টাকে আপনি কাজে লাগান। আমি যে আশংকা অনুভব করছি, তাহল, আপনার জাতি আপসে লড়াই করতে ইতস্তত করতে পারে। আপনি আপনার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর জনগণকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলুন। এর জন্য উত্তম হাতিয়ার হল আপনার ধর্ম ও কুরআন। এই লক্ষ্য অর্জনে আপনি ধর্ম, কুরআন ও মসজিদকে ব্যবহার করুন। মুসলমানদের নিকট ধর্ম একটি স্পর্শকাতর বিষয়। তারা ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু শুনলে অমনি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আপনি সহযোগিতা করলে আমরা দামেস্কেও এ লক্ষ্যে কাজ করতে পারি।
পাঁচ পাঁচটি বছর কেটে গেল; কিন্তু আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে খুন করতে পারলাম না! লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে আসে- সুলতান আইউবীকে হত্যার জন্য গমনকারী ফেদায়ী ঘাতক বলল- আইউবীর উপর আমাদের চারটি হামলা ব্যর্থ হয়েছে। তাও এত শোচনীয়ভাবে যে, তাতে আমাদের কিছু লোক মারা গেছে এবং গ্রেফতার হয়েছে। হাসান ইবনে সাব্বাহর আত্মা আমাকে তিরষ্কার করছে- তুমি কি আইউবীকে বিষ খাইয়ে হত্যা করতে পারলে না? তুমি কি লুকিয়ে কোথাও তাকে তীরের নিশানা বানাতে পারলে না? তুমি কি মৃত্যুর ভয়ে ভীত? তুমি আমার সঙ্গে কী বলে অঙ্গীকার করেছিলে, তা কি ভুলে গেছ? কাজেই আমি এখন আর এক মুহূর্তের জন্যও একথা শুনতে চাই না যে, সালাহুদ্দীন আইউবী জীবিত।
তিনি আর বেশীদিন জীবিত থাকবেন না। এক ফেদায়ী বলল। তাঁর সঙ্গীরা তার বক্তব্যে সমর্থন ব্যক্ত করল।
সুলতান আইউবী দামেস্ক আগমনের সময় তাঁর ভাই আল-আদেলকে মিসরের সেনাবাহিনীর প্রধান অধিনায়ক নিযুক্ত করে আসেন। তিনি তাকে নির্দেশ দিয়ে আসেন যে, সেনাভর্তি বেগবান করে তোল এবং সামরিক মহড়া অব্যাহত রাখ। তিনি তাকে সুদানের ব্যাপারেও সতর্ক করে আসেন এবং বলে আসেন, সুদানের পক্ষ থেকে সামান্যতম সামরিক তৎপরতা যদি চোখে পড়ে, তাহলে তুমি ব্যাপকহারে সেনা অভিযান পরিচালনা করবে।
সুলতান আইউবী তার ভাইকে সদা রিজার্ভ বাহিনী ও রসদ প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দিয়ে আসেন। দামেস্কের অভিযান সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলা যাচ্ছিল না, পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে। এখন সুলতান যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তাতে তার সেনা সহযোগিতার প্রয়োজন। কিন্তু গুপ্তচর মাজেদ হেজাজীর সংগৃহীত তথ্য মোতাবেক খৃস্টান সম্রাট রেমন্ড মিশর ও সিরিয়ার মধ্যস্থলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সুলতান আইউবীর রিজার্ভ সেনা ও রসদ আগমন প্রতিহত করবে- এই তথ্যের ভিত্তিতে সুলতান আইউবী সময়ের আগেই মিশর থেকে স্পেশাল ফোর্স ও রসদ এনে রাখা আবশ্যক মনে করেন। এই বাহিনীকে শীতের মধ্যে যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তিনি দীর্ঘ একটি বার্তাসহ একজন দূতকে কায়রো প্রেরণ করেন।
