সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বাস্তববাদী মানুষ ছিলেন। তিনি কখনো আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। তিনি সস্তা স্লোগানে বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রতিটি সেনা ইউনিটের কমান্ডারদেরকে দফতরে ডেকে নিয়ে কাগজে দাগ টেনে নকশা এঁকে এবং যুদ্ধের ময়দানে মাটিতে আঙ্গুল দ্বারা রেখা টেনে নির্দেশনা প্রদান করতেন। কিন্তু সেদিন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না তিনি। আবেগের নিকট পরাজিত হয়ে এমন সব কথা বলে ফেললেন, যা সচরাচর আম মজলিসে বলেন না।
তাওফীক জাওয়াদ!- সুলতান আইউবী দামেস্কের সেনা অধিনায়ককে উদ্দেশ করে বললেন- তোমার বাহিনী শীতের মধ্যে লড়াই করতে পারবে কিনা, তাতো এখনো জানা হল না। আমি কমান্ডারদেরকে রাতে এমন স্থানে হানা দেয়ার জন্য প্রেরণ করব, যেখানে তাদেরকে সমুদ্র অতিক্রম করে গমন করতে হবে। তখন প্রচণ্ড শীত থাকবে, বরফপাত হবে, বৃষ্টিও হতে পারে। কাজেই, চিন্তা-ভাবনা করে জবাব দাও।
আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, আমার সৈন্যদের মধ্যে জবা আছে- তাওফীক জাওয়াদ বললেন- তার একটি প্রমাণ হল, তারা আমার সঙ্গে আছে; আস-সালিহর সঙ্গে পালিয়ে যায়নি। আমার সৈনিকরা যুদ্ধের লক্ষ-উদ্দেশ্য বুঝে।
সৈনিকের মধ্যে যদি জযবা থাকে এবং তারা যদি যুদ্ধের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত থাকে, তাহলে তারা উত্তপ্ত বালুকাময় ময়দানে দাঁড়িয়েও যুদ্ধ করতে পারে। পারে জমাটবাঁধা বরফের উপর দাঁড়িয়েও।- সুলতান আইউবী বললেন- আল্লাহর সৈনিকদের ঠেকাতে না পারে মরুভূমির অগ্নি-উত্তাপ, না হীমশীতল বরফ।
সুলতান আইউবী সভার উপস্থিতিদের প্রতি একবার চোখ ঘুরিয়ে নিলেন এবং বললেন, ইতিহাস হয়ত আমাকে মাতাল বলবে। কিন্তু আমার স্থির সিদ্ধান্ত, ডিসেম্বর মাসে আমি যুদ্ধ শুরু করব। এই সিদ্ধান্ত থেকে কেউ আমাকে টলাতে পারবে না। তখন শীতের তীব্রতা থাকবে তুঙ্গে। পাহাড়-পর্বতের রং হবে সাদা বরফঢাকা। থাকবে হাড় কাঁপানো শীত। আপনারা সবাই কি আমার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত আছেন?
সকলের সমবেত কণ্ঠে জবাব- আমরা প্রস্তুত, সুলতানের যে কোন সিদ্ধান্ত শিরোধার্য।
এবার সুলতান আইউবীর ঠোঁটে হাসি ফুঠে ওঠে। কণ্ঠ তার আবেগমুক্ত, ধীর-শান্ত। তিনি নির্দেশ দিতে শুরু করেন
আজ রাতেই সকল ফৌজ মহড়া শুরু করবে। সালার থেকে সিপাহী প্রত্যেকে আবরণমুক্ত থাকবে। কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত একখণ্ড কাপড় ছাড়া কারো গায়ে আর কোন পোশাক থাকবে না। নামাযের পরপর সকল সৈন্য পোশাক খুলে ব্যারাক থেকে বাইরে বেরিয়ে যাবে। সন্নিকটে অনেক ঝিল আছে। ফৌজ সেগুলোর মধ্যদিয়ে অতিক্রম করবে। আমাদের সামরিক ডাক্তারগণও তাদের সঙ্গে থাকবে। প্রথমদিকে সৈন্যরা ঠাণ্ডায় অসুস্থতার শিকার হতে পারে। ডাক্তারগণ তাদেরকে গরম কাপড়ে পেঁচিয়ে এবং আগুনের কাছে শুইয়ে দিয়ে চিকিৎসা করবে। আমার আশা, এই অসুস্থতার ঘটনা বেশী ঘটবে না। দিনের বেলা ডাক্তারগণ সৈন্যদের খোঁজ-খবর নেবে। প্রয়োজন হলে মিশর থেকে আরো ডাক্তার তলব করতে হবে।
১১৭৪ সালের নভেম্বর মাসের শুরুর দিক। এই সময়টায় রাতে প্রচণ্ড শীত পড়ে। সুলতান আইউবী রাতের বেলা সামরিক জুনিয়র কমান্ডারদের তলব করেন। তিনি তাদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ প্রদান করেন—
এবার তোমাদেরকে যে দুশমনের সঙ্গে লড়তে হবে,তাদেরকে দেখার পর তোমাদের তরবারী খাপ থেকে বাইরে বের হতে ইতস্তত করবে। কারণ, তারাও আল্লাহু আকবার স্লোগান তুলে তোমাদের সামনে আসবে। তাদের পতাকাও তোমাদের পতাকারই ন্যায় তারকাখচিত থাকবে। তারাও সেই কালেমা পাঠ করে, যা তোমরা পড়। তোমরা তাদেরকে মুসলমান মনে করবে; কিন্তু তারা মুরতাদ। আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে তোমাদের মুখোমুখি এসে তারা কোষ থেকে যে তরবারী বের করবে, তা খৃস্টবাদীদের সরবরাহ করা তরবারী। তাদের নীরে খৃস্টবাদীদের তীর। তোমরা ঈমানের প্রহরী আর তারা ঈমানের ব্যাপারী। সুলতান আস-সালিহ বাইতুলমালের সোনাদানা ও সমুদয় সম্পদ সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। সেই সম্পদ তিনি এই উদ্দেশ্যে ত্রিপোলীর খৃস্টান সম্রাটের হাতে তুলে দিয়েছে, যাতে সে তোমাদের পরাজিত করতে তাকে সামরিক সহযোগিতা দেয়। এই পরাজয় তোমাদের নয় ইসলামের। এই ধনভাণ্ডার কারো ব্যক্তিগত নয়- জাতির। এগুলো দেশের জনগণেরই প্রদত্ত যাকাতের অর্থ। সেই সম্পদ এখন মদ-বিলাসিতায় ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই সম্পদ কাফেরদেরকে বন্ধু বানানোর কাজে ব্যয়িত হচ্ছে, তোমরা কি জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী এই দস্যুটাকে সুলতান মেনে নেবে?
সকলে সমস্বরে বলে উঠল, না, না, আমরা এমন লোকদের ক্ষমতার স্বপ্নসাধ চিরতরে মিটিয়ে দেব।
সুলতান আইউবী বললেন—
আমি যে নীতিমালার ভিত্তিতে মিশরের ফৌজ গঠন করেছি, তা-ই তোমাদের সম্মুখে উপস্থাপন করতে চাই। আমার মৌলিক নীতি হল, দুশমনের অপেক্ষায় ঘরে বসে থাকা চলবে না। দুশমন আক্রমণ করলে আমি তা প্রতিহত করব, এটা কোন নীতি হতে পারে না। কুরআন আমাদেরকে যে, শিক্ষা প্রদান করেছে, তাহল, যুদ্ধ আছে তো লড়াই কর। যুদ্ধ নেই, যুদ্ধের প্রস্তুতিতে নিমগ্ন থাক। তোমরা যখনই টের পাবে যে, দুশমন তোমাদের উপর আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, তোমরা দুশমনের উপর তখনই হামলা কর। স্মরণ রেখ! যারা মুসলমান নয়, তারা তোমাদের বন্ধু নয়। কাফের যদি তোমার পায়ে সেজদাও করে, তবু তাকে বন্ধু মনে কর না।
