মাজেদ মেয়েটিকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নীচে নামায়। মাটিতে বসে মেয়েটির মাথাটা কোলের উপর রাখে। তীর বিদ্ধ জাগায় হাত লাগায় মাজেদ। অনেক গভীরে ঢুকে গেছে তীরটি। বের করার উপায় নেই। ডাক্তার হলে হয়ত পারত।
ওটাকে ওখানেই থাকতে দাও। মেয়েটি বলল। অতঃপর সে তার স্বামীর নিকট থেকে যা তথ্য সংগ্রহ করেছে, সব মাজেদকে জানায়। তারপর বলল, আমরা যে হাব থেকে তথ্য নিয়ে পালিয়েছি, তা বোধ করি কেউ বুঝতে পারেনি। কাজেই ওদের পরিকল্পনায় কোন পরিবর্তন আসবে না। মোহাফেজরা পর্যন্ত জানে, আমার স্বামীর সন্দেহ, তোমার ও আমার মধ্যে ভালবাসার সম্পর্ক রয়েছে। তারা শুধু এ কথাই বলবে যে, তোমার ভালবাসার খাতিরেই আমি পালিয়েছি।
তথ্য বলা শেষ হলে মেয়েটি মাজেদের হাতে চুমো খেয়ে বলল- এবার আমি শান্তিতে মরতে পারব! পরক্ষণেই নিথর হয়ে আসে তার দেহ।
মাজেদ অপর ঘোড়াটি নিজের ঘোড়র সঙ্গে বেঁধে নিয়ে মেয়েটিকে নিজের ঘোড়ায় তুলে নেয়। মেয়েটিকে এমনভাবে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে, যাতে তীর তাকে কোন কষ্ট না দেয়।
***
মাজেদ হেজাজী যখন দামেস্কে তার কমান্ডার হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর নিকট পৌঁছে, তখন মেয়েটি শহীদ হয়েছে অন্তত বার ঘন্টা অতিক্রম হয়েছে। মাজেদ হাব-এর রাজপ্রাসাদের পরিকল্পনার কথা বর্ণনা করে মাজেদ হেজাজী বলল, এর সবটুকু কৃতিত্ব এই মেয়েটির। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ ততক্ষণে মাজেদ হেজাজীকে এবং মেয়েটির প্রাণহীন দেহটিকে সুলতান আইউবীর নিকট নিয়ে যান। মাজেদ হেজাজী মেয়েটির ইতিবৃত্ত বর্ণনা করে। সুলতান আইউবী মেয়েটির লাশ নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বলেন, মেয়েটিকে সামরিক মর্যাদায় দাফন করার ব্যবস্থা করুন।
মৃত্যুর আগে মেয়েটি মাজেদ হেজাজীকে যে তথ্য দিয়েছিল, তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ
খলীফা আল-মালিকুস সালিহ সকল মুসলিম রাষ্ট্রের আমীরদেরকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং তাদের সেনাবাহিনীগুলোকে এক কমান্ডারের অধীনে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। ত্রিপোলীর খৃস্টান সম্রাট রেমন্ডের নিকট সাহায্যের আবেদন পাঠানো হয়েছিল আগেই। এই মেয়েটি নতুন যে তথ্য দিয়েছে, তাহল রেমন্ড তার বাহিনীকে এমনভাবে ব্যবহার করতে চায় যে, তারা মিশর ও সিরিয়ার মাঝখানে সুলতান আইউবীর রসদ ও সহযোগিতার জন্য আসা বাহিনীকে প্রতিহত করবে। রেমন্ড আন্দাজ করে নিয়েছে, যুদ্ধ বেঁধে গেলে সুলতান আইউবী মিশর থেকে সৈন্য তলব করবেন। তাছাড়া রেমন্ড সুলতান আইউবীকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্যও দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনী প্রস্তুত রাখবে। প্রয়োজন হলে সে অন্যান্য খৃস্টান সম্রাটদের কাছেও সাহায্যের আবেদন জানাবে। হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতক বাহিনীর সঙ্গে সুলতান আইউবী হত্যার চুক্তি ও লেনদেন চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ফেদায়ীরা দামেস্ক এসে পৌঁছল বলে।
পরিকল্পনার প্রতিটি অংশই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সুলতান আইউবী যে অংশটির প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করলেন, তাহল, দুশমন শীতের মওসুম শেষ হওয়ার পর আক্রমণ করবে। হাড়কাঁপানো শীত, প্রবল বর্ষণ ও বরফপাতের কারণে শীত মওসুমে এসব এলাকায় যুদ্ধ করা কঠিন ব্যাপার।
তারা সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করছে। সৈন্যরা দুর্গে অবস্থান নিয়ে থাকবে এবং আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। ঋতু পরিবর্তন হলেই তারা সিরিয়ায় হামলা করবে। খৃস্টান সম্রাট রেমন্ডকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, আইউবী বিরোধী যুদ্ধে সহযোগিতা করলে বিনিময় দেয়া হবে অনেক স্বর্ণমুদ্রা। রেমন্ড শর্ত দেয়, বিনিময় আগে পরিশোধ কর। আল-মালিকুস সালিহ ও তার অনুচররা রেমন্ডের শর্ত মেনে নেয়।
মুসলমানদের দুর্ভাগ্য- দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুলতান আইউবী বললেন মুসলমান আজ কাফেরদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে। প্রিয়নবীজির আত্মার এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে!
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার রোজনামচায় লিখেছেন
আমার প্রিয় বন্ধু সালাহুদ্দীন আইউবী আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন না। কিন্তু যখন তাঁকে তথ্য প্রদান করা হল, খৃস্টানদেরকে আরব ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করে আপনি ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটানোর যে স্বপ্ন দেখছেন, খলীফা আল-মালিকুস সালিহ ও তার অনুগত মুসলিম আমীরগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আপনার সেই পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র করছে, তখন তিনি এতই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন যে, তেমনটা কখনো দেখিনি। তথ্যটি শোনামাত্র তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে এবং তিনি কক্ষে পায়চারী শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে প্রবল আবেগঘন কণ্ঠে বললেন- এরা আমাদের ভাই নয়- শক্র। মুরতাদ ভাইকে হত্যা করা যদি পাপ হয়, তাহলে এই পাপ করে আমি পরজগতে জাহান্নামে যেতে প্রস্তুত আছি, তবু ইহজগতে ইসলামকে লাঞ্ছিত হতে দেব না। যেসব মুসলিম শাসক কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতায়, কাফেরদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ায়, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ। আমি জানি, এরা সবাই ক্ষমতা ও অর্থের লোভী। এরা ঈমান নীলাম করে ক্ষমতার নেশা পূরণ করতে চায়। সুলতান আইউবী তরবারীর হাতলে হাত রেখে বললেন, ওরা শীত মওসুমে লড়াই করতে রাজি নয়। বরফময় অঞ্চলে যুদ্ধ করতে ওরা ভয় পায়। কিন্তু আমি হাড় কাঁপানো কনকনে শীতের মধ্যেও যুদ্ধ করব। আমি বরফের স্তরজমা পর্বতচূড়ায় এবং তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সমুদ্রের মধ্যেও লড়াই করব…।
