কমান্ডার এক রক্ষীকে আস্তাবলের দিকে পাঠিয়ে দেয়। মাজেদ হেজাজী তরবারী সজ্জিত হয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। মেয়েটি তাকে আস্তাবলের দিকে নিয়ে যায়।
মেয়েটির স্বামী কমান্ডারকে আগেই বলে রেখেছে, মাজেদের প্রতি নজর রাখবে এবং তাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না। আর এখন কিনা তার স্ত্রী নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লোকটাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে।
মেয়েটি ও মাজেদ আস্তাবলের দিকে চলে যায়। কমান্ডার নিশ্চিত হতে চায়, মনিবের স্ত্রী সন্দেহভাজন রক্ষীর সঙ্গে যাচ্ছে, তা তার মনিবের জানা আছে কিনা। মেয়েটিকে সে বাধাও দিতে পারছে না। কারণ, সে তার মনিবের স্ত্রী।
কমান্ডার ঘরে ঢুকে পড়ে। ভয়ে ভয়ে মনিবের কক্ষের দরজায় হাত রাখে। সামান্য ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়। ভেতরে প্রদীপ জ্বলছে। কক্ষটা মদের দুর্গন্ধে ভরে আছে। মনিবের প্রতি দৃষ্টিপাত করে কমান্ডার। লোকটা বিছানার উপর এমনভাবে পড়ে আছে যে, তার মাথা ও একটি বাহু পালংকের উপর থেকে ঝুলে আছে। একটি খঞ্জর বিদ্ধ হয়ে আছে তার বুকে। একাধিক আঘাতের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে। রক্তে লাল হয়ে আছে তার সমস্ত দেহ, বিছানা ও মেঝে। কমান্ডার মনিবের নিকটে গিয়ে দাঁড়ায়। শিরায় হাত রেখে পরীক্ষা করে। নেই। মারা গেছে।
মেয়েটি মাজেদ হেজাজীকে জানায়, সে তার স্বামীর নিকট থেকে সব পরিকল্পনা জেনে এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্রমণ শুরু হয়ে গেল বলে।
প্রতিদিনের ন্যায় মেয়েটি আজও লোকটিকে মদপান করায় এবং একটু বেশি পরিমাণে করায় যে, নেশায় লোকটা অজ্ঞান হয়ে গেছে। তাকে অচেতন অবস্থায় ফেলে আসতে পারতো মেয়েটি। কিন্তু প্রতিশোধ-স্পৃহা তাকে পাগল করে তুলেছে। খঞ্জর দ্বারা লোকটির বুক ঝাঁঝরা করে দিয়ে খঞ্জরটি বুকে বিদ্ধ রেখেই বেরিয়ে আসে।
ঘটনা শুনে মাজেদ হেজাজী এতটুকুও ভয় পেল না। সে তো প্রতি মুহূর্তই এমন লোমহর্ষক ঘটনার সংবাদ শুনে অভ্যস্ত। মাজেদ মেয়েটির এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানায় এবং বলে, সুস্থিরভাবে ঘোড়ায় চড়।
তারা ঘোড়ায় আরোহন করছে। ঠিক এমন সময় রাতের নীরবতা ভেদ করে উচ্চস্বর কানে আসে- ঘোড়া দিও না, ওদেরকে আটক কর, ওরা খুন করে পালাচ্ছে।
রক্ষীরা তরবারী ও বর্শা উঁচিয়ে বেরিয়ে আসে। মাজেদ হেজাজী ও মেয়েটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়েছে। রক্ষীরা যে পথটা আগলে রেখেছে, তাদেরকে সে পথই অতিক্রম করতে হবে। মাজেদ মেয়েটিকে বলল, তুমি যদি ঘোড়া হাঁকাতে না জান, তাহলে দ্রুত আমার ঘোড়ার পেছনে চড়ে বস। ঘোড়া যথাসম্ভব দ্রুত হাঁকাতে হবে।
মেয়েটি প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, সমস্যা নেই। আমি ঘোড়সওয়ারী জানি।
তোমার ঘোড়া আমার পিছনে রাখবে বলে মাজেদ হেজাজী হাতে তরবারী তুলে নেয়।
এদিকে রক্ষীদের চেঁচামেচির শব্দ ধীরে ধীরে নিকটে আসছে। তারা আস্তাবলের দিকে ছুটে আসছে। মাজেদ দ্রুত ঘোড়া হাঁকায়। দেখাদেখি তার পেছন পেছন মেয়েটিও ঘোড়া হুঁটায়। কমান্ডার গর্জে উঠে- থেমে যাও, অন্যথায় বাঁচতে পারবে না।
জ্যোত্মা রাত। মাজেদ পেছন ফিরে দেখে রক্ষীরা বর্শা উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে। মাজেদ ঘোড়ায় গতি ঘুরিয়ে দেয়। মোকাবেলা করতে হবে। সামান্য এগিয়ে গিয়ে তরবারী ঘুরাতে শুরু করে। ঘোড়ার গতি তার আশার চেয়ে তীব্র। দুজন রক্ষী তার সম্মুখে চলে আসে এবং ঘোড়ার পায়ের নীচে পিষে যায়। একটা বর্শা ধেয়ে আসে মাজেদের দিকে। কিন্তু মাজেদ তরবারীর আঘাতে নিশানা ব্যর্থ করে দেয়।
ধনুক বের কর-কমান্ডার চিৎকার করে বলল। লোকটা অভিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে দু-তিনটা তীর শাঁ করে মাজেদ হেজাজীর কানের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে চলে যায়। মাজেদ তার ঘোড়াটা ডানে-বাঁয়ে ঘোরাতে শুরু করে, যাতে তীরান্দাজ নিশানা করতে না পারে।
ইতিমধ্যে মাজেদ তীরের আওতা থেকে বেরিয়ে যায়। এখন ভয়, রক্ষীরা ঘোড়ায় চড়ে তাকে ধাওয়া করে কিনা। কিন্তু ধরা খাওয়ার ভয় নেই মাজেদের। জিন কষে ঘোড়ার পিঠে চড়তে চড়তে মাজেদ চলে যেতে পারবে অনেক দূর। লোকালয় ত্যাগ করা পর্যন্ত পেছনে ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল না। মাজেদ মেয়েটিকে বলল, এবার তোমার ঘোড়াটা আমার ডান পার্শ্বে নিয়ে আস।
মেয়েটি তার ঘোড়া মাজেদের পার্শ্বে নিয়ে আসে। মাজেদ তাকে জিজ্ঞেস করে, ভয় পাওনি তো?
মেয়েটি জবাব দেয় না, কোন অসুবিধা হয়নি।
পাশাপাশি ছুটে চলেছে দুটি ঘোড়া। মেয়েটি দূরন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকেই উচ্চস্বরে তথ্য শোনাতে শুরু করে, যা সে তার স্বামীর নিকট থেকে সংগ্রহ করেছে। মাজেদ বলল, এখন কথা রাখ; আরো কিছু পথ অতিক্রম করে যাত্রাবিরতি দিয়ে তোমার সব কথা শুনব। কিন্তু মেয়েটি বলেই যাচ্ছে। মাজেদ বারবার বলছে, এখন কথা রাখ, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটি বলল, তাহলে এখানেই থেমে যাও; বেশী অপেক্ষা করতে পারব না। মাজেদ হেজাজী এখনই যাত্রাবিরতি দিতে চাচ্ছে না! কিন্তু মেয়েটি কথা বলেই যাচ্ছে।
হাত বাড়িয়ে মাজেদ তার ঘোড়ার বাগ টেনে ধরে। এর জন্য তাকে সামনের দিকে এত ঝুঁকতে হয় যে, মাজেদ দেখতে পায়, মেয়েটির এক পাজরে তীর বিদ্ধ হয়ে আছে। মাজেদ সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া থামিয়ে ফেলে।
এই তীর এখানেই বিদ্ধ হয়েছিল মেয়েটি বলল- আমি এ কারণেই ছুটন্তু ঘোড়ার পিঠ থেকেই ভোমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম, যাতে আমার অর্জিত মহামূল্যবান তথ্য মৃত্যুর আগেই তোমাকে বলে দিতে পারি।
