আমি তোমাকে তথ্যও দেব এবং এই দুআও করব যে, তুমি যখন এখান থেকে দামেস্ক ফিরে যাবে, তখন যেন তোমার সঙ্গে তথ্যের সঙ্গে আমিও থাকি।
***
ত্রিপোলীর খৃস্টান সম্রাট রেমন্ড-এর নিকট দূত মারফত আবেদন পাঠান হয়েছে, তিনি যেন আল-মালিকুস সালিহর সাহায্যে এগিয়ে আসেন–পরদিনই মেয়েটি মাজেদ হেজাজীকে বলল- রাতে আমি আমার স্বামীকে মদপান করিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে অনেক কথা বললাম এবং শেষে বললাম, তোমরা আসলে কাপুরুষ বলেই দামেস্ক থেকে পালিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছ। কোন মুসলমানই শাসকগোষ্ঠীর এই অপমান সহ্য করতে পারে না, যা সালাহুদ্দীন আইউবী তোমাদের করল। মেয়েটি বলল, আমি তাকে এমন সব কথা বললাম যে, তিনি শিউরে ওঠলেন এবং আমার সঙ্গে অশালীন আচরণ করতে করতে বললেন, আইউবী দিন কয়েকের মেহমান মাত্র। ফেদায়ী ঘাতকদের প্রধান শেখ সান্নানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সে সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার ব্যবস্থা করবে এবং তাকে তার দাবি অনুপাতে পুরষ্কার দেয়া হবে। সে তার অভিজ্ঞ ঘাতক দলকে দামেস্ক পাঠাচ্ছে। তিনি আরো বললেন, আমরা বাহিনী প্রস্তুত করার জন্য অনেক সময় পাব। কারণ, শীতের মওসুম এসে গেছে। পার্বত্য এলাকাগুলোতে বরফপাত শুরু হবে। সালাহুদ্দীন আইউবী তার মরু এলাকার বাহিনীকে এত ঠান্ডা আর বরফের মধ্যে লড়াতে পারবে না।
মাত্র শুরু। মদ আর নারী একজন পুরুষের মনের গোপন রহস্য বের করতে শুরু করেছে। মেয়েটি রাতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানা কৌশলে তার স্বামীর সারাদিনের কারগুজারী শুনতে আরম্ভ করেছে। আর দিনের বেলা এই ভেদ রহস্য কানে দিচ্ছে মাজেদ হেজাজীর।
একদিন মেয়েটির স্বামী মাজেদ হেজাজীকে বলল- তোমার নামে নালিশ আছে। মাজেদ শিউরে ওঠে। ভাবে, তাহলে কি ধরা খেয়ে গেলাম! লোকটি বলল, শুনলাম, তুমি নাকি আমার স্ত্রীকে উত্যক্ত করছ! আমার অবর্তমানে তুমি ওর কাছে গিয়ে বসে থাকছ! আমি জানি, আমার তুলনায় তুমি সুদর্শন এবং যুবক। আমার স্ত্রী তোমার প্রতি আকৃষ্ট হবে, তা স্বাভাবিক। কিন্তু এখনই বিরত না হলে আমি তোমাকে খুন করে ফেলব।
মাজেদ হেজাজী তার মনিবকে বুঝাবার চেষ্টা করে যে, এটা আপনার ভুল ধারণা। বাস্তবে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু লোকটির মন থেকে সংশয় দূর হচ্ছে না। সে তার স্ত্রীকেও একই কথা বলে এবং তাকে বারণ করে দেয় মাজেদের সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ করা চলবে না।
এখনই এখান থেকে চলে যেতে চাচ্ছে না মাজেদ হেজাজী। তার মিশন এখনো সফল হয়নি। এখনো এখানকার পুরো পরিকল্পনা তার জানা হয়নি। মেয়েটিও রাগ-ধমক সহ্য করে নিয়ে উপরে উপরে মান্যতা ও আনুগত্যের ভান ধরে স্বামীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে এমন হবে না বলে অঙ্গীকার করে। স্বামী তাকে ক্ষমা করে দেয় বটে; কিন্তু সেদিনই আরো ছয়জন দেহরক্ষী নিয়ে এসে তাদের একজনকে কমান্ডার নিযুক্ত করে মাজেদ হেজাজীকে তার অধীন করে দেয়। দায়িত্ব বুঝে পেয়েই কমান্ডার মাজেদ হেজাজীকে শতর্ক করে দেয়, তুমি মনিবের দৃষ্টিতে সন্দেহভাজন। অতএব কখনো মনিবের বাসভবনের দরজার নিকটও যেতে পারবে না। আর রাতে সামান্য সময়ের জন্যও অনুপস্থিত থাকতে পারবে না।
মাজেদ অম্লান বদনে কমান্ডারের নির্দেশ মেনে নেয় এবং মাথা ঝুঁকিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে।
এভাবে কেটে যায় আরো তিন দিন। তৃতীয় দিন মধ্যরাতে মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। প্রধান ফটকে একজন প্রহরী দণ্ডায়মান। মেয়েটি চেহারায় মনিবের প্রভাব ও গাম্ভীর্যসহ তাকে জিজ্ঞেস করে, এই তুমি কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাক, নাকি ভবনের আশপাশটাও ঘুরে-ফিরে দেখ? প্রহরী উত্তরে কিছু বললে মেয়েটি বলল, তুমি নতুন মানুষ, আমাদের আগের দামেস্কের প্রহরীটা বেশ সতর্ক ও চৌকস ছিল। এখানে চাকুরী টেকাতে হলে তোমাকে তার মত হুঁশিয়ার হতে হবে। জান তো, সাহেব কড়া মেজাজের মানুষ।
প্রহরী মনিবের স্ত্রীর প্রতি অবনত হয়ে যায়।
প্রহরীদের এক এক করে তদারকি করছে মেয়েটি। ঘুমন্ত প্রহরীদের তাবুর দিকে এগিয়ে যায় সে। প্রধান ফটকের প্রহরী ছুটে গিয়ে কামান্ডারকে জাগিয়ে দিয়ে বলে, মনিবের স্ত্রী পরিদর্শনে এসেছেন। কমান্ডার ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ায় এবং এগিয়ে এসে মনিব-পত্নীর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। মেয়েটি তাকে জরুরী নির্দেশনা দিয়ে আরেকটি তাঁবুর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুরু করে।
মাজেদ হেজাজী এই তাবুতে শুয়ে আছে। মেয়েটির কথার শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। শোয়া থেকে উঠে তাঁবুর বাইরে চলে আসে। মেয়েটি তার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলে, যেন তার সঙ্গে তার কোন পরিচয় নেই। সে মাজেদকে জিজ্ঞেস করে, তুমিই বোধ হয় পুরাতন প্রহরী? মাজেদ শ্রদ্ধার সঙ্গে জবাব দেয়, জি, হ্যাঁ। মেয়েটি কমান্ডারকে বলে, এই লোকটিকে জলদি প্রস্তুত করে দাও, এ আমার সঙ্গে রাজ দরবারে যাবে। জলদি দুটি ঘোড়া প্রস্তুত কর।
মনিব যদি আপনার কথা জিজ্ঞেস করে, তাহলে কী বলব? কমান্ডার জিজ্ঞেস করে।
আমি আমোদ ভ্রমণে যাচ্ছি না- মেয়েটি শাসকসুলভ কণ্ঠে বলল মনিবের কাজেই যাচ্ছি। রাষ্ট্রীয় কাজে তোমাদের অতো মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। যাও, দুটি ঘোড়া প্রস্তুত করে ফেল।
