তার আরো চারটি বউ আছে। কিন্তু তাদের অপেক্ষা আমার বয়স কম ও রূপসী বিধায় তিনি আমাকে তার খেলনা বানিয়ে রেখেছেন। আমার আত্মা মরে গেছে। বেঁচে আছে শুধু দেহটা। বাইরের জগতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমি বন্দী হয়ে যে জগতে পড়ে ছিলাম সেখানে মদ আর নাচগান ছাড়া কিছুই ছিল না। হ্যাঁ, ছিল আরো একটি বিষয়। তাহল, নুরুদ্দীন জঙ্গী ও সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যার পরিকল্পনা।
বলতে বলতে মেয়েটি থেমে যায়। আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে তার। বার কয়েক ঢোক গিলে দুহাতে মাজেদ হেজাজীর বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, শুনছ কি ভাই আমার কথা? তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর না আমার স্বামীর, সেই পরিচয় বাদ দিয়েই আমি তোমাকে আমার মনের কথাগুলো বলে দিচ্ছি। আমি জানি, জানতে পারলে আমার স্বামী আমাকে শাস্তি দেবেন- নির্মম শাস্তি। কিন্তু আমি যে কোন শাস্তি ভোগ করতে প্রস্তুত আছি। আমার এখন দেহ ছাড়া আর কিছুই নেই। দেহটাও পাথর হয়ে। গেছে। আমার আত্মা মরে গেছে।
না, তোমার, আত্মা জীবিত আছে- মাজেদ হেজাজী বলল- আমার চোখ হৃদয়ের গভীরে দেখতে পায়। আমি দেখেছি, তোমার আত্মা বেঁচে আছে। অন্যথায় কখনো আমি তোমার সম্মুখে আমার ভেদ প্রকাশ করতাম না। আমি রূপ-যৌবনের কাছে পরাজিত হওয়ার মত মানুষ নই। আমি পুরুষ। নিজের জীবনটা ইসলামের জন্য ওয়াফ করে দিয়েছি। তুমি বলে যাও, হৃদয়ের বোঝা হাল্কা করতে থাক। আমি শুনছি। তোমার কাহিনী আমার কাছে নতুন কিছু নয়। এটা প্রতিটি মুসলিম নারীর কাহিনী। যেদিন প্রথম একজন মুসলমান হেরেম নামক ভোগ্যালয়ে রূপসী মেয়েদের বন্দী করেছিল, সেদিন থেকে ইসলামের পতন শুরু হয়েছিল। খৃস্টানদের পরিকল্পনা, তারা আমাদেরকে নারীর হাতে খুন করাবে। তারাই তাদের মেয়েদের দ্বারা আমাদের রাজা বাদশাদের হেরেম ভরে রেখেছে।
আমার স্বামীর ঘরেও এই একই ঘটনা ঘটেছে- মেয়েটি বলল- আমি খৃস্টান মেয়েদের আমার স্বামীর ঘরে আসতে এবং মদপান করতে দেখেছি। চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমার তখন কিছুই করার ছিল না। আমি এ জন্যে কাঁদতাম না যে ওরা আমার স্বামীকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। আমার কান্নার কারণ ছিল, ওরা আমার থেকে সেই ইসলামকে ছিনিয়ে নিচ্ছে, যার জন্য তোমার ন্যায় আমিও আমার জীবন ওয়াকফ করে দিয়েছিলাম।
আবেগ ত্যাগ কর। এস, কাজের কথা বলি। আমি যে মিশন নিয়ে এখানে এসেছি, কাজ শুরু করা প্রয়োজন- মাজেদ হেজাজী বলল- আচ্ছা, স্বামীর উপর তোমার প্রভাব কেমন? তুমি কি তার মনের কথা বের করতে পারবে?
দু-পেয়ালা মদপান করিয়ে তার মাথাটা আমার বুকের সঙ্গে লাগিয়েই আমি তার মনের সব ভেদ বের করে ফেলতে পারব- মেয়েটি জবাব দেয়- কি তথ্য বের করতে হবে বল। তারপর একটুখানি ভেবে মুচকি হেসে মেয়েটি বলল, তুমি আমার একান্ত ব্যক্তিগত একটি দাবি মানবে কিনা বল- আমি যদি তোমার কাজ আদায় করে দিতে পারি, তাহলে তুমি আমাকে এখন থেকে উদ্ধার করবে, আমার এই আশা পূরণ হবে কি? আমার ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করবে না তো?
হবে, তোমার এই মনোবাসনা পূরণ হবে। আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাব। তোমার ভালবাসার মূল্যায়ন করব। মেয়েটির দাবি মেনে নেয় মাজেদ।
মাজেদ হেজাজী বলল, খলীফা আল-মালিকুস সালিহ এগার বছর বয়সের কিশোর। তিনি আমীর-উজীরদের খেলনায় পরিণত হয়ে আছেন। এই আমীর উজীরগণ উম্মাহকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলতে চায়। তাদের এই আশা যদি পূরণ হয়, তাহলে খৃস্টানরা খণ্ডিত মুসলিম ভূখণ্ডগুলোকে খেয়ে হজম করে ফেলবে। এই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইসলামের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলবে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বলে থাকে, যে জাতি নিজ সাম্রাজ্যকে, খণ্ডিত করে, তাদের অস্তিত্ব টিকে না। আমাদের এই আমীরগণ খৃস্টানদের থেকে সাহায্য নিতে কুণ্ঠিত হবে না। খৃস্টানরা তাদেরকে মদদ দেবে ঠিক, কিন্তু তার বিনিময়ে তাদেরকে প্রজায় পরিণত করে ফেলবে। সুলতান আইউবী আমাকে এখানে এই তথ্য সগ্রহ করতে পাঠিয়েছেন যে, খলীফা কী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং খৃস্টানরা তাদেরকে কিরূপ সাহায্য প্রদান করছে। এই তথ্য আমাকে যত দ্রুত সম্ভব সুলতানের নিকট পৌঁছাতে হবে। তিনি সেই মোতাবেক পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। এমন যাতে না হয় যে, সুলতান কোন প্রস্তুতি-পদক্ষেপ না নিতেই খৃস্টানরা তার উপর হামলা করে বসল।
আচ্ছা, সালাহুদ্দীন আইউবী কি মুসলিম আমীরদের উপর হামলা করবেন? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
যদি প্রয়োজন হয়, তিনি তাতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করবেন না।
মেয়েটি যেমন আগেগপ্রবণ, তেমন বুদ্ধিমতী। তার চোখ গড়িয়ে ঝরঝর করে পানি গড়াতে শুরু করে। বলল, ইসলামকে সেই দিনটিও দেখতে হল যে, একই রাসূলের উম্মত পরস্পর লড়াই করবে!
এছাড়া আর কোন পথ নেই যে!- মাজেদ বলল- সালাহুদ্দীন আইউবী রাজা নন; আল্লাহর একজন সৈনিক মাত্র। তার মতে, দেশ-জাতিকে বিপদ ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর। এই বিপদ বাইরের দুশমনের পক্ষ থেকে আসুক কিংবা ভেতরের গাদ্দার ও স্বার্থপূজারী শাসকদের থেকে; জাতিকে রক্ষা করা সৈনিকদের পবিত্র কর্তব্য। তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, আমি দেশের সেনাবাহিনীকে শাসকগোষ্ঠীর খেলনায় পরিণত হতে দেব না। সেই মুসলমান কাফিরদের চেয়েও বেশী ভয়ংকর, যে কাফিরদেরকে বন্ধু ভেবে বুকে জড়িয়ে নেয়। এখন তোমার কাজ হল, তুমি তোমার স্বামীর নিকট থেকে তথ্য নাও, এখানে কী পরিকল্পনা প্রস্তুত হচ্ছে।
