এই জাগীরদার হাল্ব পৌঁছলে খলীফা তাকে স্বাগত জানান। ইনি ছিলেন খলীফার সামরিক উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য। বসবাসের জন্য হালবে তাকে একটি ভবন প্রদান করা হল। এখানে এসেই তিনি এত ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, ঘর থেকে সকালে বের হচ্ছেন তো ফিরছেন মধ্যরাতে।
তার এই অনুপস্থিতির সুযোগে তার স্ত্রী ঝুঁকে পড়তে শুরু করে মাজেদ হৈজাজীর প্রতি। সুযোগটাকে লুফে নেয় মাজেদ। সে আত্মমর্যাদা ও চারিত্রিক পবিত্রতা বজায় রেখে মেয়েটাকে ঘনিষ্ঠ করে নেয়। মেয়েটা মাজেদ হেজাজীর প্রতি এমনভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যে, মাজেদ হেজাজী যে তার স্বামীর একজন দেহরক্ষী, সে তা ভুলেই গেছে। এই ফাঁকে মাজেদ অগ্রসর হচ্ছে তার মিশন : নিয়ে। সে দু-তিন দিনের মধ্যেই মেয়েটাকে পুরোপুরি মুঠোয় নিয়ে আসে। .. মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, তোমার স্বামীর অন্য চার স্ত্রী কেমন ছিল?
মেয়েটি বলল, খারাপ তেমন ছিল না। পুরাতন বিধায় তিনি তাদেরকে ধোকা দিয়ে ফেলে আমাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন।
আর একদিন তোমাকেও ফেলে অন্য কাউকে নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যাবে। এই আমীরদের কাজই এই। মাজেদ বলল।
আচ্ছা, আমি যদি তোমাকে আমার মনের কথা বলি, তা আমার স্বামীকে বলে দেবে না তো? আমার সঙ্গে তুমি প্রতারণা করবে না তো! মেয়েটি বলল।
দেখ, আমার চরিত্রে যদি ধোকা-প্রতারণা বলে কিছু থাকত, তাহলে ঐ যেখানে তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তোমার স্বামীকে খুন করে সেখানেই আমি তোমাকে ও তোমাদের ধন-দৌলত ছিনিয়ে নিতাম। মাদেজ বলল। আরো বললো, আমি পুরুষ, একজন নারীর সঙ্গে প্রতারণা করা পুরুষের মর্যাদার খেলাফ।
হৃদয়ের গোপন কথাটা আর চেপে রাখতে পারছি না আমি- মেয়েটি বলল- আমি তোমাকে ভালবাসি মাজেদ! আর আজ এ কথাটাও আমি গোপন রাখছি না যে, আমি আমার স্বামীকে ঘৃণা করি। আমি কারো স্ত্রী নই। আমি বিক্রি হওয়া মেয়ে। আমি বহুবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু সম্ভবত আমি ভীরু। আত্মহত্যা করার সাহসটুকুও আমার নেই। আমার ইচ্ছে ছিল এক, করছি আরেক। এবার তুমি আমার ইচ্ছাশক্তিকে প্রবল করে দিয়েছ যে, আত্মহত্যা আমাকে করতেই হবে।
তার মানে আমাকে ভালবাস বলে তুমি আত্মহত্যা করতে চাচ্ছ?
না- মেয়েটি বলল- আমার বিশ্বাস ছিল, সালাহুদ্দীন আইউবী নুরুদ্দীন জঙ্গী অপেক্ষা মোগ্য ও মহৎ মানুষ। কিন্তু তুমি আমার সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছ। আচ্ছা, সালাহুদ্দীন আইউবী কি এতই খারাপ, যেমনটা তুমি বলেছিলে?
মাজেদ হেজাজীর ভাবান্তর ঘটে যায়। বুঝতে পারে আঘাতটা ওর কোথায় লেগেছে। বলল- তুমি তোমার মনের গোপন কথা আমাকে বলে দিয়েছ তার বিনিময়ে আমিও আমার একটি গোপন কথা তোমাকে বলছি। আমি তোমার থেকে কোন ওয়াদা নেব না যে, আমার এই গোপন কথা তুমি কাউকে বলতে পারবে না। শুধু এতটুকু বলে রাখব, আমার ভেদ যদি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে তুমিও বাঁচবে না, তোমার স্বামীও নয়। শোন, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর একজন গুপ্তচর। আমি দু-চার দিনেই তোমার আসল পরিচয় টের পেয়ে গেছি। শোন, তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে যতটা পবিত্র ভেবেছিলে, তিনি তার চেয়েও বেশী পবিত্র, বেশী মহৎ। তিনি সেইসব আমীর ও রাজা বাদশাহদের দুশমন, যারা নারীদেরকে হেরেমে আবদ্ধ করে রেখেছেন। তিনি নারীদেরকে বিনোদন ও ভোগের সামগ্রী মনে করেন না। তিনি নারীর মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষা এবং পুরুষদের জন্য বহু বিবাহ-বিলাসিতা পছন্দ করেন না। নারীদেরকেও তিনি সমরবিদ্যায় পারদর্শী করে তুলতে চান। আমি তোমার স্বামীর আস্থা অর্জনের জন্য মিথ্যা বলেছিলাম যে, আইউবী দামেস্ক থেকে পলায়নকারী লোকদের লুণ্ঠন ও তাদের মেয়েদের তুলে নেয়ার জন্য বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন। তিনি ইসলামের পতাকাবাহী। আমি ইসলামের বিজয় ও সালাহুদ্দীন আইউবীর জন্য এখানে একটি মিশন নিয়ে এসেছি।
সহসা মেয়েটির চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। দুহাতে মাজেদ হেজাজীর একটা হাত চেপে ধরে টেনে মুখের কাছে নিয়ে চুমো খেয়ে বলল, তোমার এই ভেদ কখনো ফাঁস হবে না। আমাকে বল, এখানে তুমি কেন এসেছ এবং আমি তোমার জন্য কী করতে পারি? বল, সালাহুদ্দীন আইউবী আসলে কেমন মানুষ। নুরুদ্দীন জঙ্গীর জীবদ্দশায় আমরা একটি মহিলা সংগঠন করেছিলাম। আমরা খৃস্টানদের বিরুদ্ধে কাজ করেছিলাম। জঙ্গীর স্ত্রী আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কিন্তু আমি এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে কাজ করি, আমার পিতা তা পছন্দ করতেন না। তিনি একজন মোহান্ধ ও চাটুকার মানুষ। তার নিকট ক্রুশ ও চাঁদ-তারার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। যে তার হাতে কটি টাকা গুঁজে দেয়, তিনি তারই গোলাম হয়ে যান। তিনিই এই লোকটির কাছে আমাকে বিক্রি করে দিয়েছেন। এই সওদাকে মানুষ বিবাহ বলে। তুমি তো জান, একজন মুসলিম নারী সুযোগ পেলে যুদ্ধের ময়দানে পুরুষদেরকেও তাক লাগিয়ে দিতে পারে। পারে দুশমনের হাঁটু ভেঙ্গে দিতে। কিন্তু সে নারীকেই যখন হেরেমে বন্দী করে ফেলা হয়, তখন সে পিপিলিকায় পরিণত হয়ে যায়। আমার দশাটা তা-ই হয়েছে। আমার স্বামী যদি সাধারণ মানুষ হতেন, তাহলে আমি অবশ্যই বিদ্রোহ করতাম, তার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তার শক্তি আছে, আছে সম্পদ। খলীফা আল মালিকুস সালিহর রক্ষী বাহিনীর অর্ধেকই তার লোক।
