আমার স্ত্রী। লোকটি জবাব দেয়।
আর দামেস্কে কটি রেখে এসেছেন? মাজেদ জিজ্ঞেস করে।
চারটি। লোকটি জবাব দেয়।
আল্লাহ করুন, এই পঞ্চমজন আপনার সঙ্গে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। মাজেদ বলল।
আচ্ছা, আইউবীর ফৌজ এখান থেকে কত দূরে?- লোকটি জিজ্ঞেস। করে- তুমি কি সৈন্যদেরকে লুট করতে দেখেছ?
হ্যাঁ, দেখেছি- মাজেদ জবাব দেয়- যদি বলি, আমিও সালাহুদ্দীন আইউবীর একজন সৈনিক, তাহলে আপনি কী করবেন?
লোকটি কাঁপতে শুরু করে। আবার পরক্ষণেই হাসতে চেষ্টা করে। কিন্তু তার কম্পিত ঠোঁটের ব্যর্থ হাসির রেখা মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। বলে- আমি তোমাকে কিছু দিয়ে দেব। তোমার প্রতি আমার নিবেদন, তুমি আমাকে ভিখারীতে পরিণত কর না। আরো আবেদন করব, এই মেয়েটাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিও না।
মাজেদ হেজাজী খিল খিল করে হেসে ফেলে। হাসি বন্ধ করে বলে- ধন আর নারীর মোহ মানুষকে ভীরু ও দুর্বল করে তোলে। কেউ যদি মাথার উপর তরবারী উঁচিয়ে বলে, সঙ্গে যা আছে দিয়ে দাও; তাহলে আমি নিজের তরবারীটা কোষমুক্ত করে বলব, আগে আমাকে খুন কর, তারপর আমার সঙ্গে যা পাও নিয়ে যাও। জনাব! বলে ফেলুন, আপনি কে? দামেস্কে আপনি কী ছিলেন? আর এখন যাচ্ছেন কোথায়? সত্য বললে হয়ত আমিই হব আপনার একনিষ্ঠ মোহাফেজ। আমার মনে হচ্ছে, আপনাদের আর আমার গন্তব্য এক। আমি আইউবীর ফৌজের সেনা বটে, তবে দলত্যাগী।
চরমভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে লোকটি। সে অকপটে নিজের আসল পরিচয় ও ইতিবৃত্ত ব্যক্ত করে মাজেদ হেজাজীর নিকট। লোকটি দামেস্কের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জাগীরদার। রাজ দরবারে তার অনেক মর্যাদা ছিল। সালতানাতের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক বিষয়ে বেশ দখল ছিল। খলীফার দেহরক্ষী বাহিনীর অধিকাংশ সৈনিকই ছিল তার দেয়া। এক কথায় বলা চলে, এই লোকটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ছিল। সুলতান আইউবীর দামেস্ক অনুপ্রবেশের পর যখন পলায়নের প্রয়োজন দেখা দিল, তখন তার ঘর থেকে বের হতে একটু বিলম্ব হয়ে যায়। আল-মালিকুস সালিহ তার অনুচরদের বলে দিয়েছিলেন, আমি হাল্ব পৌঁছে যাব, তোমরাও সেখানে চলে এস। সে মতে এই জাগীরদারও হাব-এর দিকেই যাচ্ছে। লোকটি এও বলে দেয় যে, আমার সঙ্গে প্রচুর সোনা-রূপা ও মণি-মাণিক্য আছে। স্ত্রী চারজনকে দামেস্কে ফেলে এসেছে। এটি সকলের ছোট ও রূপসী বলে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। লোকটি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানায়, তার রক্ষীবাহিনী ও সকল চাকর-বাকর দামেস্কেই তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে। তারা তার সব লুট করে নিয়ে গেছে।
লোকটির কাহিনী শুনে মাজেদ হেজাজী বেশ আনন্দিত হয়। তার বড় কাজের লোক এই জাগীরদার। অন্তত হাবের দরবার পর্যন্ত পৌঁছা যাবে এর সঙ্গে।
মাজেদ হেজাজী তাকে নিজের পরিচয় প্রদান করে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী মিশর থেকে যে ফৌজ দামেস্কে নিয়ে এসেছেন, আমি তার একটি ব্যাটলিয়নের কমান্ডার। কিন্তু আমি আল-মালিকুস সালিহর অনুরক্ত। এ জন্য দলত্যাগ করে আইউবীর ফৌজ থেকে পালিয়ে এসেছি এবং খলীফার দরবারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পথ চলছি। খলীফা যদি আমাকে পছন্দ করেন, তাহলে তার রক্ষী বাহিনীতে যোগ দেব।
আমি যদি এখনই তোমাকে আমার রক্ষী বানিয়ে নেই, তাহলে তোমাকে কত বেতন দিতে হবে? লোকটি মাজেদ হেজাজীকে জিজ্ঞেস করে- আমি দামেস্কে যেমন রাজা ছিলাম, ওখানেও তা-ই থাকব। আমার রক্ষী হলে তোমার ভাগ্য বদলে যাবে।
আপনি যদি আমাকে আপনার মোহাফেজ নিয়োগ করেন, তাহলে আপনার আর সামরিক উপদেষ্টার প্রয়োজন হবে না।- মাজেদ হেজাজী বলল- আর যোগ্যতা দেখে পারিশ্রমিক আপনিই ঠিক করে নেবেন। আমি এখনই কিছু বলব না।
মাজেদ হেজাজী লোকটির বডিগার্ড হয়ে যায়। কথাটা এভাবেও বলা যায় যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একজন গুপ্তচর একজন দরবারী জাগীরদারের ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হয়ে যায়।
সময়টা সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত। অল্প পরেই সূর্য অস্তমিত হয়ে আঁধার নেমে আসবে। আজকের মতো আর সামনে অগ্রসর হওয়ার সময় নেই। মাজেদ হেজাজীর পরামর্শে তারা ওখানে রাত কাটানোর আয়োজন করে। রাত পোহাবার পর জাগীরদার এখন নিশ্চিত- মাজেদ বিশ্বস্ত, তারই একজন।
***
দীর্ঘ সফরের পর তারা হাল্ব গিয়ে পৌঁছে। সে সময়ে হালব-এর আমীর ছিলেন শামসুদ্দীন, যিনি অল্প কদিন আগে খৃস্টানদের সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন। আল-মালিকুস সালিহ দামেস্ক থেকে পালিয়ে তার নিকট গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার সকল আমীর ও উজীর তার সঙ্গে। দেহরক্ষী বাহিনীও তথায় পৌঁছে গেছে।
আল-মালিকুস সালিহ হাব-এর শাসনক্ষমতা হাতে তুলে নেন। সেনা বাহিনীকেও নতুনভাবে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তার কাছে সোনাদানা ও সম্পদের অভাব ছিল না। অভাব ছিল ফৌজ, কমান্ডার ও উপদেষ্টার। তিনি এবং তার অনুচরদের ভাবনা, কিভাবে সুলতান আইউবীকে পরাজিত করে খেলাফত বহাল করা যায়। তাদের ভাবনা ও অস্থিরতা প্রমাণ করে, তাদের দুশমন খৃস্টানরা নয়- সুলতান আইউবী। তারা এদিক-ওদিকের আমীরদের নিকট খলীফার সীল-স্বাক্ষরযুক্ত বার্তা প্রেরণ করে যে, সালতানাতের প্রতিরক্ষার জন্য তোমরা খলীফাকে সামরিক সাহায্য প্রদান কর। তাদের কারো নিকট থেকে আশাব্যঞ্জক জবাব পাওয়া গেল, কারো নিকট থেকে পাওয়া গেল মৌখিক প্রতিশ্রুতি।
