***
সুলতান আইউবী যাদেরকে নিজের চোখ-কান বলে অভিহিত করেছিলেন, তারা হল মিশর থেকে আগত একদল গোয়েন্দা। খলীফা আল-মালিকুস সালিহ ও তার আমীর-উজীরগণ যখন দামেস্ক ত্যাগ করে পালিয়ে যায়, তখন সুলতান আইউবীর এই গোয়েন্দারাও তাদের সঙ্গ নেয়। পলায়নকারীদের সংখ্যা কম। ছিল না। দেশের সকল আমীর-উজীর এবং বেশ কজন জাগীরদার মোসাহিবও ছিল তাদের সঙ্গে। ছিল কতিপয় সেনা সদস্য এবং চাটুকার। তারা পালিয়ে গেছে বিক্ষিপ্তভাবে। সুলতান আইউবীর গোয়েন্দাদের তাদের সঙ্গে মিশে যাওয়া কঠিন ছিল না। পদচ্যুত খলীফা আল মালিকুস সালিহ ও তার আমীরগণ কোথায় যায়, কি করে, পাল্টা আক্রমণ করে কিনা এবং খৃস্টানদের থেকে তারা কী পরিমাণ সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছে। এসব ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এই গুপ্তচররা হল হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর নির্বাচিত লোক। তারা উদ্ভূত পরিস্থিতির রাজনৈতিক মূল্যায়নও বেশ ভাল করেই বুঝত।
তাদের একজন হল মাজেদ ইবনে মুহাম্মদ হেজাজী। সুদর্শন যুবক, সুঠাম দেহ; সর্বোপরি আল্লাহ তাকে দান করেছেন জাদুকরী মধুর ভাষা। সুলতান আইউবীর সব গোয়েন্দাই সুশ্রী, সুঠাম, স্বাস্থ্যবান ও স্বচ্চরিত্রের অধিকারী। তাদের না আছে নেশার অভ্যাস, না তারা বিলাসী। তাদের চরিত্র আয়নার ন্যায় স্বচ্ছ। মাজেদ হেজাজী তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চারিত্রিক পরিচ্ছন্নতায় তার চেহারায় নূর চমকায়। সে-ও দামেস্ক ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আরবের উন্নত জাতের একটি ঘোড়া তার বাহন। সঙ্গে আছে তরবারী আর ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা চকচকে ফলাবিশিষ্ট বর্শা।
বিজন মরুভূমিতে একাকী পথ চলছে মাজেদ। তার একজন সঙ্গীর প্রয়োজন- এমন সঙ্গী, যার দ্বারা তার এই মিশন উপকৃত হবে। মাজেদ দেখতে পায়, বেশকিছু লোক হাব অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সঙ্গী হিসেবে তাদের একজনও তার পছন্দ হল না। কারণ, সফরসঙ্গী হিসেবে তার প্রয়োজন পদস্থ কোন সেনা অফিসার কিংবা এমন একজন লোক, যার আল মালিকুস সালিহ সম্পর্কে জানাশোনা আছে।
পালিয়ে আসা খলীফাকে খুঁজে ফিরছে মাজেদের অনুসন্ধানী চোখ। কয়েকজন লোককে সে জিজ্ঞেসও করেছে যে, আল-মালিকুস সালিহ কোন্দিক গেছেন। কিন্তু কেউ কোন তথ্য দিতে পারেনি। তার জানা ছিল, আল-মালিকুস সালিহ সুলতান জঙ্গীর সমবয়স্ক ব্যক্তি নন, বরং তিনি এগার বছর বয়সের বালক মাত্র, যাকে স্বার্থপূজারী আমীরগণ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সালতানাতের মসনদে বসিয়েছিল। শাসনক্ষমতা মূলত ছিল তাদেরই হাতে। মাজেদ হেজাজীর আন্দাজ করা কঠিন ছিল না যে, এই কিশোর খলীফা একাকী যাচ্ছেন না। তার সঙ্গে আছে তার আমীর-উজীর ও দরবারীদের বিরাট বহর। বহরে থাকছে সোনা-দানা ও মূল্যবান সম্পদ বোঝাই অসংখ্য উট।
মাজেদ হেজাজী ভেবে রেখেছে- এই কাফেলাটি পাওয়া গেলে কি করতে হবে এবং তাদের মনের কথা কিভাবে বের করা যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিকারের সন্ধান পেল না মাজেদ। সামনে পার্বত্য এলাকা। আশাপাশে সবুজের সমারোহ। পর্বতমালার গভীর প্রবেশ করে মাজেদ।
মাজেদ একস্থানে দুটি ঘোড়া দেখতে পায়। সেখান থেকে খানিক দূরে সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে আছে একজন পুরুষ। সঙ্গে একজন মহিলা। মহিলাও শায়িত। মাজেদ থেমে যায়। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে একটি গাছের নীচে বসে পড়ে। তার বিশ্রামের প্রয়োজন।
হঠাৎ হ্রেষারব তুলে একটি ঘোড়া। ঘোড়ার শব্দ শুনে শোয়া থেকে ওঠে বসে লোকটি। মাজেদ ভালভাবে দেখতে পায় তাকে। পোশাক-আশাকে প্রমাণ মেলে লোকটা উঁচু শ্রেণীর। মাজেদ হেজাজীর প্রতি চোখ পড়ে তার। ইশারায় তাকে নিজের কাছে ডাকে।
মাজেদ তার নিকটে চলে যায়। তার সঙ্গে হাত মিলায়। মহিলাও উঠে বসে। মহিলা নয়- এক রূপসী যুবতী। যুবতীর গলার হার প্রমাণ করছে, মেয়েটি কোন সাধারণ ঘরের সন্তান নয়। লোকটির বয়স চল্লিশের মতো মনে হল। আর যুবতীর বয়স পঁচিশেরও কম। মাজেদ হেজাজী এক দৃষ্টিতেই আন্দাজ করে নেয় দুজনকে।
তুমি কে?- লোকটি মাজেদ হেজাজীকে জিজ্ঞেস করে- তুমি কি দামেস্ক থেকে এসেছ?
আমি দামেস্ক থেকেই এসেছি- মাজেদ জবাব দেয়- কিন্তু আমি কে, সে কথা আপনাকে বলতে পারব না। আপনাদের পরিচয় বলুন?
বোধ হয় আমরা একই পথের পথিক- লোকটি মুচকি হেসে বলল- তুমি সম্ভ্রান্ত তোক বলে মনে হচ্ছে।
আমি সম্ভ্রান্ত না বদমাশ, তা কি আপনি নিশ্চিত হতে চান?- দুঠোঁটের মাঝে মুচকি হাসির রেখা টেনে মাজেদ বলল- যার সঙ্গে এমন একটি রূপসী যুবতী আছে আর যুবতীর গলায় এত মহামূল্যবান হার আছে এবং সঙ্গে আরো মূল্যবান সম্পদ আছে, সে যে একজন পথচারীকে বদমাশ আর দস্যু মনে করবে, তা বিচিত্র কিছু নয়। আমি দস্যু নই। তবে নিজের জীবন বিলিয়ে হলেও আপনাদেরকে দুবৃত্তের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। দামেস্ক থেকে পালিয়ে আসা কিছু লোক পথে দস্যুর কবলে পড়েছিল। আমি পথে তাদের দুটি লাশও দেখে এসেছি। পরিস্থিতিটা দস্যু-তস্করদের জন্য খুবই অনুকূল যে, মানুষ ধন-দৌলত নিয়ে দামেস্ক থেকে পালিয়ে যাচ্ছে আর ওরা ধরে ধরে লুট করছে।
সহসা মেয়েটির লাবণ্যময় চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। সঙ্গী পুরুষটির গা ঘেঁষে জড়সড় হয়ে বসে। লোকটির মুখমণ্ডলেও ভীতির ছাপ পরিলক্ষিত হয়। এবার মাজেদ হেজাজী বুঝে গেছে, এরা কারা এবং কী এদের মিশন। মাজেদ তাদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে নিজের জাদুকরী ভাষার কারিশমা দেখাতে শুরু করে। কথা প্রসঙ্গে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সমালোচনা করে এবং এমনভাবে খলীফা আল-মালিকুস সালিহর প্রশংসা করে, যেন তিনিই জগতের একমাত্র মহান ব্যক্তিত্ব। মাজেদ তাদেরকে আরো প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বলল- সালাহুদ্দীন আইউবী দামেস্ক থেকে পলায়নরত আপনার ন্যায় লোকদের সম্পদ লুণ্ঠন এবং তাদের সুন্দরী মেয়েদের ছিনিয়ে নেয়ার জন্য এদিকে তার ফৌজ লেলিয়ে দিয়েছেন। আচ্ছা, এই মেয়েটি আপনার কী হয়?
