মেয়েরা প্রস্তুত হয়ে যায়। তারা একটি পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলে। সে মোতাবেক সাহার একদিন পর্দাবৃত হয়ে সরাইখানার মালিকের নিকট চলে যায়। সরাইখানার মালিক সাহারকে দেখে বেজায় আনন্দিত। সাহার বলে, আমি তখনই তোমাদের নিকট পৌঁছে যেতাম। কিন্তু শহরে ধরপাকড় চলছিল। আমি আশংকা করি, যদি আমি তোমাদের নিকট চলে আসি, তাহলে তোমরাও ধরা পড়ে যাবে। আমি এতিম মেয়ের পরিচয় দিয়ে একটি দরিদ্র পরিবারে লুকিয়ে থাকি। এখন পরিস্থিতি ভাল। তোমাদের প্রতি কারো কোন সন্দেহ নেই। তাই এবার তোমাদের নিকট চলে এলাম।
সরাইখানার মালিক সাহারকে তার নর্তকীর নিকট নিয়ে যায়। নর্তকীও অত্যন্ত আনন্দিত হয়। এখানে সে কয়েক রাত অতিবাহিত করে। সাহার দেখতে পায় যে, খলীফা ও বিলাসী আমীরদের পতন এবং সুলতান আইউবীর ক্ষমতা দখল সত্ত্বেও সরাইখানার পাতাল কক্ষের জৌলুস আগেরই মতই অক্ষুণ্ণ আছে। এতো উত্থান-পতনের পরও তাতে কোন ব্যাত্যয় ঘটেনি। মুসাফিররা নিজ নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়ার পর এই পাতাল কক্ষের জগত সক্রিয় হয়ে উঠে। এখানে এখনো খৃস্টান গুপ্তচর ও দুবৃত্তরা আছে। সাহার তাদের মনোরঞ্জন করতে থাকে। রাতে নাচে ও তাদেরকে মদপান করায়। এরা মুসাফিরের বেশে সরাইখানায় আসা-যাওয়া করে।
সাহার আরো দেখে নেয় যে, রাতে সরাইখানার বাইরে পাহারার ব্যবস্থা থাকে, যাতে কোন সমস্যা দেখা দিলে সে সংবাদ যথাসময়ে পাতাল কক্ষে পৌঁছে যায়। সাহার একাকী বাইরে যেতে পারে না। মনের বিরুদ্ধে হলেও সে নাচতে গাইতে থাকে। একরকম বন্দীই করে রাখা হয়েছে তাকে। মেয়েটি এই ভেবে নিরাশ হয়ে যায় যে, আসলাম প্রতিশোধ নিতে এখন কিনা হয়ে গেলাম বন্দী। কিন্তু এই নৈরাশ্য সে কাউকে বুঝতে দেয়নি। তাকে সবাই তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। অনেক গোপনীয় কথাও তার উপস্থিতিতে আলোচনা হচ্ছে এখন।
এক রাতে পাতাল কক্ষের আসরে এক খৃস্টান গোয়েন্দা সরাইখানার মালিককে বলল, শুধু এই দুটি মেয়েতে আমাদের একঘেঁয়েমী এসে গেছে। নতুন মেয়ে আন।
গোয়েন্দা যখন কথাটা বলে, তখন মেয়ে দুটো সেখানেই উপস্থিত ছিল। তাতে অন্য নর্তকী ব্যথিত হলেও সাহারের চোখে আশার আলো জ্বলে ওঠে। সরাইখানার মালিক বলল,সালাহুদ্দীন আইউবী এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলেছেন যে, এখন দামেস্কে আর কোন নর্তকী বা নতুন কোন মেয়ে পাওয়া যাবে না।
কেন পাওয়া যাবে না? সাহার বলল- আমীর-উজীরদের ঘর থেকে যেসব নর্তকীদের উদ্ধার করে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, তারা এখনো এই শহরেই আছে। আমার মত তারাও লুকিয়ে আছে। আপনারা যদি আমাকে দু তিন দিনের জন্য বাইরে যেতে দেন, তাহলে পর্দানশীল নারীর বেশে আমি তাদেরকে এখানে নিয়ে আসতে পারব।
সাহার অনুমতি পেয়ে যায়। সরাইখানার মালিক তার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দেয়। সকাল হলে সাহার পর্দাবৃত হয়ে সরাইখানা থেকে বেরিয়ে যায়।
***
চার-পাঁচ দিন পর সরাইখানার চোরা দরজা দিয়ে আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা আটটি মেয়ে প্রবেশ করে এবং সোজা সরাইখানার মালিকের কক্ষে চলে যায়। মেয়েগুলোর মুখমণ্ডল নেকাবে ঢাকা। মালিকের কক্ষে প্রবেশ করে সবাই মুখের নেকাব সরিয়ে ফেলে। মালিক চোখ মেলে তাদের প্রতি তাকায়। সব কটি মেয়ে যুবতী এবং একটির চেয়ে অপরটি রূপসী। সাহার তাদের পার্শ্বে দণ্ডায়মান। এরা কোন্ কোন্ আমীরের নিকট ছিল, সাহার তা মালিককে অবহিত করে। আরো জানায় যে, এদের নাচ দেখে, গান শুনে আপনি পাগল হয়ে যাবেন। আরো বলল, আজ রাত আপনার সব বন্ধু-বান্ধবকে এখানে দাওয়াত করুন।
সরাইখানার মালিক পাগলের মত উঠে দৌড় দেয়। বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত দিতে ছুটে যায়। সাহার মেয়েগুলোকে পুরাতন নর্তকীর কাছে নিয়ে যায়। নর্তকী তাদেরকে দেখে বিস্মিত হয়ে যায়, এদের একজনকেও সে চেনে না। নর্তকী একটি মেয়ের সঙ্গে তার বিশেষ পরিভাষায় কথা বললে মেয়েটি খানিকটা বিব্রত হয়ে পড়ে। সাহার বলল, নতুন জায়গা কিনা, মেয়েটি ভয় পেয়েছে। তাছাড়া আমি এদেরকে এক বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে এনেছি। রাতে এদের নৈপুণ্য, দেখলে তখন তুমি বুঝতে এরা কারা, কোথা থেকে এসেছে।
সাহারের কথায় নর্তকী আশ্বস্ত হল না। সন্দেহ হোক বা না হোক এই অনুশোচনা তা অবশ্যই আছে যে, এই মেয়েদের সামনে তার মূল্য শেষ হয়ে গেছে। সে সাহারকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে বলল, বোধ হয় তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে! এই মেয়েগুলো টাটকা যুবতী। তাছাড়া অতিশয় রূপসী। এদের সামনে আমাদের আর মূল্য কি? এ-কী করলে তুমি? এদেরকে কোত্থেকে এনেছ? কেনইবা এনেছ? বড় ভুল করলে সাহার!
আসলে আমি আমাদের পরিশ্রম কমাতে চাচ্ছি- সাহার বলল- ওদের আগমনের পর এখন আমাদের কাজ কমে যাবে।
নর্তকী তার এই যুক্তি মানতে পারল না। সাহারের নিকট আর কোন যুক্তি নেই, যা দ্বারা সে নর্তকীকে আশ্বস্ত করবে। দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে যায়। নর্তকী ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, আমি সরাইখানার মালিককে বলব, এই মেয়েগুলো নর্তকী নয়- বেশ্যা। এদেরকে এই স্পর্শকাতর স্থানে নিয়ে আসা ঠিক হয়নি। এই পাতাল কক্ষের গোপন তথ্য বাইরে গেলে বিপদ অনিবার্য।
এদেরকে কিসের ভিত্তিতে বিশ্বাস করব?– এই নর্তকী অতিশয় অভিজ্ঞ ও চতুর। সে সাহারের মুখ বন্ধ করে দেয়। আবার সাহারও তার বক্তব্য মানতে প্রস্তুত নয়। অবশেষে নর্তকী হুমকি দিল, তুমি যদি এখনই ওদেরকে এখান থেকে না তাড়িয়েছ, তাহলে আমি মেহমানদেরকে এই বলে ফিরিয়ে দেব যে, তুমি এদের দ্বারা তাদেরকে গ্রেফতার করাবার ষড়যন্ত্র করছ।
