এখানকার জনসাধারণ অভাব-অনটন বরদাশত করার জন্য প্রস্তুত বটে, কিন্তু জাতীয় মর্যাদা বিলুপ্ত হতে দিতে প্রস্তুত নয়। তারা খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের পক্ষপাতি নয়। তারা অনুভব করতে শুরু করে যে, তাদের শাসকরা তাদেরকে দুশমনের হাতে তুলে দিচ্ছে। নুরুদ্দীন জঙ্গীর শাসনামলে ঝুপড়ি ও ছেঁড়া তাঁবুতে বসবাসকারী লোকেরাও সরকার কখন কী করছে জানতে পারত। যুদ্ধের সময় তারা যুদ্ধের পরিস্থিত সম্পর্কে অবহিত হতে পারত। কিন্তু জঙ্গীর ওফাতের পর দেশের জনগণ এখন অস্পৃশ্য ঘোষিত হয়েছে। তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে, সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে মাথা ঘামাবার অধিকার তোমাদের নেই। তোমরা যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাক, নিজের চরকায় তেল দাও। দুটি মসজিদের ইমামকে শুধু এই জন্য চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে যে, তারা মুসল্লীদেরকে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার ওয়াজ শোনাতেন। খলীফার মহল ও অন্যান্য সরকারী ভবনের নিকটে আসাও জনগণের জন্য দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যারা এক সময় নুরুদ্দীন জঙ্গীকেও পথরোধ করে দাঁড় করিয়ে কথা বলত এবং রণাঙ্গনের খবরাখবর নিত, এখন তারা সরকারের একজন সাধারণ কর্মকর্তাকে দেখলেও পেছনে সরে যায়।
মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জিহাদের স্লোগান হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু স্লোগান হারিয়ে যেতে পারে, মানুষের জযবা এত তাড়াতাড়ি বিলুপ্ত হওয়ার নয়। মানুষ লুকিয়ে লুকিয়ে পরস্পর মিলিত হয়ে মতবিনিময় করতে শুরু করে যে, এমন অবস্থায় আমরা কী করতে পারি।
নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী মহিলাদের একটি দল গঠন করেছিলেন। এই কঠিন পরিস্থিতিতে তারা জানতে পারে যে, সালাহুদ্দীন আইউবী এসেছেন এবং তিনি ফৌজ নিয়ে এসেছেন। তারা সুলতানকে স্বাগত জানানোর জন্য বেরিয়ে আসে। যখন তারা জানতে পারে যে, খলীফা সুলতান আইউবীকে সামরিক শক্তি প্রযোগ করে প্রতিহত করতে চাচ্ছেন, তখন তারা খলীফার বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত হয়ে যায়। খলীফার রক্ষীবাহিনী তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করে। আর এই কারণেই খলীফা আল-মালিকু সালিহ ও তার সহযোগিরা চোরের ন্যায় দলবলসহ পালাতে বাধ্য হয়েছিল। এখন মানুষ সুলতান আইউবীর নির্দেশে জীবন দিতে প্রস্তুত। জনগণের এই আবেগ-উচ্ছ্বাস সুলতান আইউবীর মিশনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।
***
দামেস্কের মুসলিম নারীদের মধ্যে ঈমানী জযবা ও জাতীয় চেতনা পূর্ব থেকেই বিদ্যমান। এখন সেই জযবা জ্বলন্ত অঙ্গারের রূপ লাভ করেছে। যুবতী মেয়েদের একটি প্রতিনিধি দল সুলতান আইউবীর নিকট এসে নিবেদন জানায়, মহামান্য সুলতান! আপনি আমাদেরকে ফৌজের সঙ্গে রণাঙ্গনে প্রেরণ করুন এবং আমরদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিন। আমরা আহত মুজাহিদদের সেবা চিকিৎসা ছাড়া লড়াইও করতে চাই। সুলতান আইউবী তাদেরকে বললেন, যেদিন প্রয়োজন হবে, তোমাদেরকে ঘর থেকে বের করে আনব। আপাতত তোমাদের ময়দান হল ঘর। আমি তোমাদেরকে ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখতে চাই না। তোমরা যদি মা হয়ে থাক, তাহলে স্বামী-সন্তানদেরকে মুজাহিদরূপে গড়ে তোেল। যদি বোন হও, ভাইদেরকে ইসলামের মোহাফেজ বানাও। ওয়াদা দিচ্ছি, আমি তোমাদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। কিন্তু তোমরা একথা ভুল না যেন, তোমাদেরকে নিজ নিজ ঘর সামলাতে হবে।
এরূপ আরো কিছু কথা বলতে বলতে সুলতান আইউবীর হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে যায়। তিনি বললেন, আরো একটি ময়দান আছে, যেখানে তোমরা কাজ করতে পার। তোমরা হয়ত শুনেছ, খলীফার মহল এব আমীর-উজীর ও শাসকদের বাসভবন থেকে অনেকগুলো মেয়ে উদ্ধার হয়েছে। তাদের সংখ্যা দু- তিনশ। আমি তাদেরকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম। তারা এই শহরেই কিংবা শহরের আশপাশে কোথাও অবস্থান নিয়ে থাকবে। তারা কে কোথাকার বাসিন্দা আমার জানা নেই। এখনইবা কোথায় কোথায় ঘুরে ফিরছে, নিজেদের জীবন বরবাদ করছে, তাও আমি বলতে পারব না। এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। আমার সম্মুখে বিশাল বিশাল কাজের পাহাড় পড়ে আছে। এই কাজটা আমি তোমাদের উপর সোপর্দ করছি যে, তোমরা তাদেরকে খুঁজে বের কর। তাদের মধ্যে অনেকে এমনও থাকবে, যাদেরকে ক্রয় কিংবা অপহরণ করে আনা হয়েছিল। এখন তাদের ভবিষ্যৎ এই যে, তারা বেশ্যালয়ে ঢুকে পড়বে, সরাইখানায় মুসাফিরদের সেবা করবে এবং এভাবে লাঞ্ছিত হয়ে জীবনের অবসান ঘটাবে। তাদেরকে কেউ বিয়ে করবে না। তোমরা তাদেরকে খুঁজে বের কর এবং তাদের বিয়ের ব্যবস্থা কর।
মেয়েরা কালবিলম্ব না করে অভিযান শুরু করে দেয়। তারা নিজ নিজ ঘরের পুরুষদের থেকে সহযোগিতা নেয় এবং কয়েকদিনের মধ্যেই বেশকটি মেয়েকে খুঁজে বের করে নিজেদের ঘরে রেখে তাদের চরিত্র শোধরানোর প্রশিক্ষণ শুরু করে দেয়।
হতভাগা মেয়েগুলোর মধ্যে একটি মেয়ের নাম সাহার। সাহারকে জোরপূর্বক নর্তকী বানানো হয়েছিল। তাকে এক আমীরের ঘর থেকে উদ্ধার করে মুক্ত করা হয়েছিল। মুক্তি পেয়ে মেয়েটি এক দরিদ্র পরিবারে আশ্রয় নেয়। উদ্ধারকারী মেয়েরা খোঁজ পেয়ে তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসে।
সাহার যখন দেখল, দামেস্কের মেয়েরা নিয়মতান্ত্রিক সেনাবাহিনীর ন্যায় কাজ করছে, তখন তার ঘুমন্ত মর্যাদাবোধ জেগে ওঠে। জাগ্রত হয়ে উঠে তার প্রতিশোধস্পৃহাও। সে মেয়েদেরকে জানায়, আমার সঙ্গের এক নর্তকী সরাইখানার মালিকের নিকট থাকে। সাহার সরাইখানার মালিককে চেনে। সে জানায়, এই লোকটি খৃস্টানদের গুপ্তচর। লোকটি একটি পাতাল কক্ষ তৈরি করে রেখেছে। সেখানে ফেদায়ী ও খৃস্টান গোয়েন্দারা রাত কাটায়। সেখানে নাচ হয়, মদের আসর বসে। আমাকেও এক রাত সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমি সেই গোয়েন্দাদেরকে ধরিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমি তা করতে চাই না। আমি সরাইখানার মালিককে তাদের সঙ্গে নিজ হাতে হত্যা করতে চাই। একাকী করা সম্ভব নয়। তোমরা আমার সঙ্গ দাও।
