সাহার অস্থির হয়ে যায়। নর্তকী ক্ষোভের সাথে বের হওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায় এবং দরজার দিকে হাঁটা দেয়। অমনি সাহার তার কামিজের নীচে হাত ঢুকিয়ে কটিবন্ধ থেকে খঞ্জর বের করে নর্তকীর পিঠে এক ঘা বসিয়ে দেয়। আহত হয়ে মেয়েটি ঘুরে যায়। সাহার খঞ্জরের আরেকটি আঘাত করে নর্তকীর হৃদপিন্ডে। তারপর দাঁত কড়মড় করে বলে উঠে, তুমি আমাকে খুন করাতে চাচ্ছিলে। কিন্তু তোর মরণই যে হল আমার হাতে।
সাহার নর্তকীর পরিধানের কাপড় দ্বারাই খঞ্জর পরিষ্কার করে। লাশটা তার খাটের উপর তুলে কম্বল দ্বারা ঢেকে রাখে। তারপর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে নিজের কক্ষে চলে যায়। পরনের রক্তাক্ত পোশাক পরিবর্তন করে এবং খঞ্জরটা আবার কটিবন্ধে সেঁটে কামিজের নিচে লুকিয়ে রাখে।
***
রাতে সরাইখানার মালিক ছাড়াও আরো সাতজন লোক এই পাতাল কক্ষে আসে। মালিক সাহারকে পুরাতন নর্তকীর কথা জিজ্ঞেস করে, ও কোথায়? সাহার নাক ছিটকে, ভ্রু কুচকে বলল, ও এই নতুন মেয়েদের দেখে জ্বলে-পুড়ে মরছে। নিজেকে সে এদের চেয়েও বেশী রূপসী মনে করে। আজ রাত সে এখানে না আসলেই ভাল হবে। আসর রং ধরবে।
লানত পড় ক ওর উপর মালিক বলল- ওকে ওর কক্ষেই পড়ে থাকতে দাও।
সাহার ছয় মেহমানকে উদ্দেশ করে বলল, এই মেয়েদের সঙ্গে ভাল পোশাক নেই; আপনারাই এদের উপযুক্ত পোশাকের ব্যবস্থা করতে হবে। এই রাতটা এখন ওরা যে পোশাকে আছে, সে পোশাকেই আপনাদের সামনে আসবে।
তারা যখন মেয়েদের দেখল, তখন ভুলেই গেল, ওরা কোন্ পোশাকে আছে। মেয়েগুলোকে পেশাদার নর্তকীর মত মনে হয় না। চেহারার রং তাদের একদম টাটকা এবং নিষ্পাপ বলে মনে হয়। তাদের মাথার চুলগুলোও পরিপাটি করা হয়নি। তাদের আচরণ প্রমাণ করে যে, তারা পেশাদার নর্তকী নয়। ভাবসাব তাদের সহজ-সরল। সাহার তাদেরকে উদ্দেশ করে বলল, এবার মেহমানদের মদ পরিবেশন কর। তারা সোরাহী থেকে পেয়ালায় মদ ঢালতে শুরু করে। এক মেহমান একটি মেয়েকে খানিকটা উত্যক্ত করে। মেয়েটি লাফ মেরে পেছনে সরে যায়। তার চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করে।
সাহার!- লোকটি বলল- এদেরকে কোথা থেকে এনেছ? এরা কার কাছে ছিল?
সাহার অট্টহাসি হেসে বলল, বিদ্যা ভুলে গেছে। ঐ সালাহুদ্দীন আইউবীর ভয়। অল্প পরেই ঠিক হয়ে যাবে, ধৈর্য ধরুন।
সালাহুদ্দীন আইউবী!- তাচ্ছিল্যের সাথে একজন বলল- এবার বেটা আমাদের জালে এসেছে। আমরা তাকে তারই আমীর-সালারদের হাতে খুন করাব। লোকটি তার এক সঙ্গীর কাঁদে চাপড় মেরে বলল, এর খঞ্জর সালাহুদ্দীন আইউবীর খুনের পিয়াসী। চিন তো একে? এ হাসান বিন সাব্বাহর দলের লোক- ফেদায়ী। লোকটি এক মেয়ের গালে আলতো আঘাত করে বলল, আইউবীর ভয় মন থেকে ঝেড়ে ফেল। ও তো দিন কয়েকের মেহমান মাত্র।
কিছুক্ষণ পর। মদপান শুরু হল। নাচের ফরমায়েশ হল। মেয়েরা সোরাহী ও পেয়ালাগুলো এদিক-ওদিক সরিয়ে রাখার ভান করে ছয়জন লোকের পেছনে চলে যায়। অকস্মাৎ সবাই যার যার কামিজের তলে হাত ঢুকায়। প্রত্যেকে একটা করে খঞ্জর বের করে। একটি খঞ্জর বের করে নেয় সাহারও। প্রথমে সাহার সরাইখানার মালিকের উপর আঘাত হানে। অন্যরা ছয় পুরুষের উপর উপর্যুপরি আঘাত হানতে থাকে। সবাই ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। একজনও নিজেকে সামলানোর সুযোগ পেল না। সাহার এক এক করে প্রত্যেকের গায়ে আঘাত করতে থাকে, যেন মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে। মেয়েটা প্রতিশোধ নিয়ে নেয়।
এই মেয়েগুলো সম্ভ্রান্ত পরিবারের সেইসব মেয়ে, যারা সুলতান আইউবীর নিকট নিবেদন পেশ করেছিল যে, আমাদেরকে পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ দিন। তারাই সাহারকে একটি জীর্ণ গৃহ থেকে উদ্ধার করে এনেছিল। সাহার যখন মেয়েগুলোকে সমর বিষয়ক কাজ করতে দেখল, তখন তার সরাইখানার মালিকের কথা মনে পড়ে যায়। তাদেরকে অবহিত করে যে, সরাইখানার পাতাল কক্ষটি খৃস্টান গোয়েন্দা ও দুবৃত্তদের আখড়া; তোমরা সহযোগিতা করলে আমি তাদেরকে ধরিয়ে দিতে পারি। এই পরিকল্পনা দিয়ে সে ওখানে গেল। কিন্তু সরাইখানার মালিক তাকে আটকে ফেলল। এক পর্যায়ে গোয়েন্দারা ফরমায়েশ করল নতুন মেয়ে নিয়ে আস। সাহার সুযোগ পেয়ে যায়। সে নতুন মেয়ে নিয়ে আসার জন্য বের হওয়ার অনুমতি লাভ করে।
বেরিয়ে এসে সে মেয়েদেরকে বিষয়টা অবহিত করে এবং বলে, তোমরা নর্তকী সেজে চল এবং লোকগুলোকে হত্যা কর। মেয়েরা প্রস্তুত হয়ে যায়। পরিকল্পনা ঠিক করে সাহারের সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু তারা এই চিন্তা করল না যে, লোকগুলোকে ফাঁদে ফেলে গ্রেফতার করাতে পারলে অনেক লাভ হবে তাদের কাছ থেকে অনেক মূল্যবান তথ্য উদ্ধার করা যাবে। মেয়েরা আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। তারা এতটুকুই জানত যে, দুশমনকে খুন করাই বড় কাজ। তারা তাদের জিহাদী চেতনাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছিল। সাহারের বক্ষও প্রতিশোধ স্পৃহায় ফেটে যাচ্ছিল। ওদেরকে সে নিজ হাতে হত্যা করতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে।
সাহার পুরাতন নর্তকীকে এ জন্য খুন করে ফেলে, তার দ্বারা মেয়েদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছিল। বস্তুত তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার উপক্রমও হয়েছিল। এ জাতীয় নোংরামীপূর্ণ আসরের রীতি নীতি ও মদপান করানোর পন্থা-পদ্ধতি সম্পর্কে তারা অবহিত ছিল না। ভাগ্য ভাল যে, তারা যথাসময়ে খঞ্জর বের করে ফেলে এবং উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায়।
