রক্ষীদেরকে বাইরে বের করে নিয়ে যাও- ক্ষুব্ধ কণ্ঠে এক আমীর বলল দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা কর।
অল্পক্ষণের মধ্যেই রক্ষী বাহিনী প্রস্তুত হয়ে যায়। এতক্ষণে নগরবাসীদের ভীড় আরো বেড়ে গেছে। মহিলারা চিৎকার করে বলছে, ফটক খুলে দাও। আমাদের ইজ্জতের মোহাফেজ এসেছেন। পুরুষরা উচ্চকণ্ঠে ধ্বনি দিচ্ছে। রক্ষী বাহিনী সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পথ পাচ্ছে না।
খেলাফতের কাজী (প্রধান বিচারপতি) কামালুদ্দীন তৎপর হয়ে ওঠেন। তিনি খলীফার দরবারে ছুটে যান। তিনি খলীফাকে বললেন, আপনি যদি সালাহুদ্দীন আইউবীর মোকাবেলায় ফৌজ প্রেরণ করেন, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ তাদের মোকাবেলা করবে। বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে। গৃহযুদ্ধ বাঁধবে। তার চেয়ে বেশী ক্ষতি এই হবে যে, আশপাশে অবস্থানরত খৃস্টান ফৌজ বিনা যুদ্ধে ভেতরে ঢুকে পড়বে, খৃস্টানরা দেশটা দখল করে নেবে। তারপর না থাকবে আপনার খেলাফত, না থাকবেন আপনি নিজে। দেশটা তছনছ হয়ে যাবে। শরীয়তের নির্দেশ হল, ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ করা যায় না। আপনি একটুখানি বাইরে এসে মানুষের উৎকণ্ঠা দেখুন। আপনি এই স্রোত কিভাবে প্রহিত করবেন? ভাল হবে, নগরীর চাবি আমার হাতে দিয়ে দিন; আমি একটা সুন্দর সমাধান করে ফেলি।
চাবি কাজী কামালুদ্দীনের হাতে তুলে দেয়া হল। তিনি নিজ হাতে নগরীর ফটক খুললেন। চাবিটা সুলতান আইউবীর হাতে তুলে দেন। সুলতান আইউবী অবনত মস্তকে তার হাতে চুম্বন করেন এবং তারই সঙ্গে শহরে প্রবেশ করেন। নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী সুলতান আইউবীর সম্মুখে এসে উপস্থিত হন। সুলতান আইউবী ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন। জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী আবেগের অতিশয্যে সুলতান আইউবীকে জড়িয়ে ধরেন এবং শিশুর ন্যায় হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। মহিলারা সুলতান আইউবী ও তার সৈন্যদের উপর ফুল ছিটিয়ে দেয় এবং স্লোগান দিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়।
দুর্গের চাবিও সুলতান আইউবীর হাতে তুলে দেয়া হয়। তিনি সর্বপ্রথম নিজে বাড়িতে যান। আইউবী দামেস্কেরই সন্তান। একসময় তিনি এ বাড়িতে বাস করতেন। বড় আবেগের সাথে তিনি পুরাতন ঘরটিতে প্রবেশ করেন, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল।
***
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার পর সুলতান আইউবী ছোট-বড় কমান্ডারদেরকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠান। তাদের সঙ্গে কথা বলে আন্দাজ করে নেন,তাদের উপর কতটুকু নির্ভর করা যায়। ফৌজের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন এবং নির্দেশ জারি করেন।
এ সময়ে তিনি সংবাদ পান যে, খলীফা তার অনুগত আমীর ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে পালিয়ে গেছেন। ফৌজের উচ্চপদস্থ দুতিনজন কর্মকর্তাও তাদের সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী তৎক্ষণাৎ তৎপর হয়ে যান এবং পালিয়ে যাওয়া লোকদের ঘরে ঘরে তল্লাশী অভিযান প্রেরণ করেন। এ গৃহগুলো মূলত বালাখানা। পলাতকরা শুধু আপন আপন জীবন নিয়েই পালিয়েছে। বিত্তবৈভব সবই পড়ে আছে। হেরেমের নারী, নর্তকী ও বিলাস সামগ্রী সবই পেছনে রয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী সমস্ত মাল-দৌলত কজা করে নেন। তার একাংশ বাইতুলমালে জমা দেন, অবশিষ্টগুলো গরীব ও পঙ্গুদের মাঝে বন্টন করে দেন। সুলতান আইউবী খলীফা ও ফেরার আমীর প্রমুখদের ধাওয়া করা প্রয়োজন মনে করলেন না। তিনি মিসর ও সিরিয়ার একীভূত হওয়ার ঘোষণা দিয়ে দেন এবং আপন ভাই তকিউদ্দীনকে দামেস্কের গবর্নর নিযুক্ত করেন। অন্যান্য প্রদেশগুলোতেও নতুন গবর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি নিজে সালতানাতের সুরক্ষা ও ভিত শক্ত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু তার ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টসমূহ তাকে জানান দিয়ে যাচ্ছে যে, তার আমীরগণ যারা আল-মালকুস্ সালিহের অফাদার- তাকে শান্তিকে বসতে দেবে না। ইউরোপীয় রাজ্যসমূহ থেকে আসা তথ্যাদি থেকে জানা গেল, খৃস্টানরা সুবিশাল সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করছে, যাদের নিয়ে ইসলামী বিশ্বের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানবে। সুলতান আইউবীর জন্য সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যা হল, তার আমীরগণ তাকে পরাস্ত করার জন্য খৃস্টানদের পথপানে চেয়ে আছে। তাই তার জন্য আবশ্যক হল, প্রথমে এই বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করা। কাজটা অত সহজ নয়। দামেস্কের ফৌজের যোগ্যতা কেমন, তাও তিনি জানেন না। তাই কালবিলম্ব না করে তিনি এই ফৌজের প্রশিক্ষণ শুরু করে দেন। যে অঞ্চলে তাকে লড়তে হবে, জায়গাটা পর্বতময়। শীতের মওসুমে ঐসব পাহাড়ে বরফ জমে যায়। আর এখন শীতকাল।
সুলতান আইউবী কায়রো ও দামেস্কের মধ্যে একটি পার্থক্য লক্ষ্য করেন। কায়রোতে খৃস্টান ও সুদানী গোয়েন্দা ও দুবৃত্তদের একাধিক গোপন আখড়া আছে। সেসব এলাকার মানুষের উপর সুলতান আইউবীর পূর্ণ আস্থা নেই। পক্ষান্তরে দামেস্কেও খৃস্টান দুবৃত্ত আছে বটে; কিন্তু এখানকার সাধারণ নাগরিক, এমনকি অবুঝ শিশুরা পর্যন্ত তার সহযোগী বরং তারা তার আঙ্গুলের ইশারায় আগুনে ঝাঁপ দিতেও প্রস্তুত। তাই এখানকার সাধারণ মানুষদের ব্যাপারে এই আশংকা কম যে, তারা দুশমনের গোয়েন্দা ও দুবৃত্তদের ক্রীড়নকে পরিণত হবে। দামেস্ক ও সিরিয়ার মানুষ নুরুদ্দীন জঙ্গীর আমলে মর্যাদাপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাদের সেই ব্যক্তি মর্যাদা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নতুন শাসকরা তাদেরকে প্রজায় পরিণত করেছে। আমীর-উজীরগণ ভোগ-বিলাসিতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ জনগণের জন্য আপদে রূপান্তরিত হয়েছে। আইনের শাসন ও মর্যাদা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বেশ্যালয় ও শরাবখানা চালু হয়ে গেছে। মাত্র চার-পাঁচ মাসেই মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাজারে সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে এবং মানুষ অভাব ও দুর্ভিক্ষ অনুভব করতে শুরু করেছে।
