আপনি কী উদ্দেশ্যে এসেছেন? দুর্গের কমান্ডার জিজ্ঞাসা করে- খলীফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সৈন্যদের পেছনে দূরে কোথাও নিয়ে রেখে আসুন এবং আপনি একা সম্মুখে অগ্রসর হোন।
খলীফাকে এখানে ডেকে নিয়ে আস- সুলতান আইউবী উচ্চকণ্ঠে বললেন- আর তুমি শুনে নাও, আমার সৈন্যরা পেছনে হটবে না- শহরে প্রবেশ করবে। খলীফাকে সংবাদ পাঠাও, সে যদি বাইরে না আসে, তাহলে অনেক মুসলমানের রক্ত ঝরবে এবং তার দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে।
নাজমুদ্দীন আইউবের পুত্র সালাহুদ্দীন!- দুর্গের কমান্ডার বলল- আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, তোমার একজন সৈন্যও জীবিত ফিরে যেতে পারবে না। আমি খলীফার হুকুমের পাবন্দ। তোমার জন্য নগরীর দ্বার খোলা হবে না।
দুর্গের বাইরে প্রহরারত সৈন্যরা সংবাদ দেয়ার জন্য এক সিপাইকে খলীফার নিকট প্রেরণ করে। সুলতান আইউবীও তার সৈন্যদেরকে কি যেন নির্দেশ প্রদান করেন। সৈন্যরা বিদ্যুতের ন্যায় দ্রুত নড়েচড়ে ওঠে। তারা আরো বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ধনুক বের করে হাতে নেয়। তাতে তীর সংযোজন করে।
ওদিকে দামেস্কের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শহরের পাঁচিলে তীরন্দাজ সৈন্যরা প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দুর্গের কমান্ডার সম্ভবত খলীফার নির্দেশ কিংবা ভেতর থেকে বাহিনী আসার অপেক্ষা করছে। কোন পদক্ষেপ নেয়নি সে। কিন্তু মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
খলীফা ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন। বাচ্চা মানুষ। একবার প্রচণ্ড ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন। পরক্ষণেই আবার ঘাবড়ে যান। তার উপদেষ্টাগণ তাকে সাহস দেয় এবং তার থেকে এই নির্দেশ আদায় করে নেয় যে, ফৌজ বাইরে গিয়ে সুলতান আইউবীকে ঘিরে ফেলবে এবং অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করিয়ে তাকে গ্রেফতার করবে।– ইতিমধ্যে নগরবাসীও জেনে যায় যে, সুলতান আইউবী ফৌজ নিয়ে এসেছেন। নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তার প্রশিক্ষিত মহিলারাও তৎপর হয়ে ওঠে। ঘরে ঘরে সংবাদ পৌঁছে যায় যে, সুলতান আইউবী এসেছেন। মহিলারা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে এবং স্লোগান তুলে, সালাহুদ্দীন আইউবী জিন্দাবাজ, সালাহুদ্দীন আইউবীর আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম। অনেকে আইউবীকে উপহার দেয়ার জন্য ফুল সংগ্রহ করে। পুরুষরাও রাস্তায় নেমে আসে, তাকবীর ধ্বনিতে দামেস্কের আকাশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
খলীফার চাটুকারদের এ দৃশ্য পছন্দ হল না। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়ছে নগরীর প্রধান ফটকের উপর। বানের মত ছুটে আসছে মানুষ। অনেকে পাঁচিলের উপর উঠে যায় আর স্লোগান দেয়, খোশ আমদেদ সালাহুদ্দীন আইউবী।
দামেস্কের ফৌজ সুলতান আইউবীর মোকাবেলা করতে অস্বীকৃতি জানায়। সংবাদ চলে আসে খলীফার কানে। খলীফা ও আমীরগণ ভাবনায় পড়ে যান। আমীরদের অনুগত কমান্ডাররা নিজ নিজ বাহিনীকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেয়। খলীফার বিরোধী কমান্ডাররা তাদেরকে সাবধান করে দেয় যে, সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করলে পরিণতি ভাল হবে না। ঘোড়ার পেছনে বেঁধে তোমাদেরকে শহরময় টেনে-হেঁচড়ে খুন করা হবে। তিন চারজন কমান্ডার পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়। এমন সময়ে জঙ্গীর স্ত্রী এসে উপস্থিত হন। মহিলা পাগলের ন্যায় দৌড়ে আসেন। আসেন ঘোড়ায় চড়ে। ঘোড়াটাও হাঁফাচ্ছে তার। তিনি দেখতে এসেছেন, ফৌজ কী করছে। পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের রূপ ধারণ করছে না তো? তিনি দেখতে পান যে, তিন-চারজন কমান্ডার তরবারী উঁচিয়ে একে অপরকে শাসাচ্ছে। তাওফীক জাওয়াদও আছেন তাদের মধ্যে। জঙ্গীর স্ত্রীকে দেখেই তিনি তার দিকে এগিয়ে যান এবং বললেন, আপনি এখানে কেন এসেছেন?
এখানে কী হচ্ছে?- জঙ্গীর স্ত্রী জিজ্ঞেস করেন- ফৌজ সালাহুদ্দীন আইউবীকে স্বাগত জানাতে যাচ্ছে, নাকি মোকাবেলা করতে?
ফৌজ যাচ্ছে না- তাওফীক জাওয়াদ জবাব দেন- আমরা খলীফার নির্দেশ অমান্য করেছি। আর এরা পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হতে চাচ্ছে। এদের মধ্যে দুজন আছে খলীফার অনুগত।
জঙ্গীর স্ত্রী ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নেমে যান এবং বিবদমান কমান্ডারদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে যান। তিনি নিজের মাথাটি উলঙ্গ করে চিৎকার দিয়ে বললেন, ওহে আত্মমর্যাদাহীন লোক সকল! তোমরা আগে এই মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন কর, আপন মায়ের মস্তক মাটিতে ছুঁড়ে মার। তারপর কাফেরদের পক্ষে যুদ্ধ কর। তোমরা ঐসব কন্যাদের কথা ভুলে গেছ, যাদেরকে কাফেররা তুলে নিয়ে গেছে। তোমরা ভুলে গেছ ঐসব শিশু কন্যাদের কথা, যারা কাফেরদের নির্মমতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। বল, তোমরা কার সমর্থনে একে অন্যের বিরুদ্ধে তরবারী উত্তোলন করেছ? আমার পুত্রের অনুগতরা কাফের। তোমরা আস, আগের আমার গর্দানটা উড়িয়ে দাও, তারপর আইউবীর মোকাবেলায় গমন কর।
জঙ্গীর স্ত্রী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তার দুচোখ বেয়ে ঝর ঝর করে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে আসে। কমান্ডারগণ তরবারী কোষবদ্ধ করে মাথানত করে কেটে পড়ে।
ফৌজ কি নির্দেশ অমান্য করল? খলীফার এক উপদেষ্টার ভীতিপ্রদ কণ্ঠস্বর। এক ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে খলীফার দরবারে।
