সুলতান আইউবী গভীর ভাবনা-চিন্তার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, তিনি যথাসম্ভব কম সৈন্য নিয়ে দামেস্ক যাবেন। যদি একজন সুলতানের ন্যায় তাকে স্বাগত জানানো হয়, তবে তো ভাল, মৌখিক আলাপ-আলোচনায়-ই সমস্যার সমাধান হবে। আর যদি সংঘর্ষ বাধে, তাহলে এই সল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারাই মোকাবেলা করবেন। আলী বিন সুফিয়ান তাঁকে নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন যে, খলীফা ও আমীরদের রক্ষীবাহিনী যদি সংঘাতে লিপ্ত হয়, তাহলে সালার তাওফীক জাওয়াদ তার বাহিনীকে সুলতানের হাতে তুলে দিবেন। জঙ্গীর স্ত্রীও নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন, নগরবাসী সুলতান আইউবীকে স্বাগত জানাবে। কিন্তু সুলতান আইউবী নিজেকে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হতে দেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ধরে নিয়েছিলেন যে, দামেস্কের প্রত্যেক সৈনিক ও জনতা তাঁর দুশমন। তাই তিনি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী থেকে এমন সাতশত সৈন্য বেছে নেন, যারা অসংখ্য যুদ্ধে লড়াই করেছে। তাদের মধ্যে আছে এমন সব গেরিলা যোদ্ধাও, যারা দুশমনের পিছনে যুদ্ধ লড়ায় অভিজ্ঞ। সামরিক দক্ষতা ছাড়াও এসব সৈন্য জাতীয় ও ঈমানী চেতনায় বলীয়ান। খৃস্টানদের নাম শুনলেই লাল যায় হয়ে তাদের চোখ।
সুলতান আইউবী কায়রো থেকে এই সৈন্যদেরকে রাতের আঁধারে গোপনে বের করে এনেছেন। তারা এক-দুজন করে কায়রো থেকে বেরিয়ে আসে এবং কায়রোর অনেক দূরে পূর্ব নির্ধারিত একস্থানে সমবেত হয়। সুলতান আইউবীও কায়রো থেকে বের হন অতি গোপনে। বিষয়টা জানতেন শুধু আলী বিন সুফিয়ান ও সুলতানের দুই খাস উপদেষ্টা। সুলতান আইউবীর রক্ষী বাহিনী যথারীতি কায়রোতে তার বাসগৃহ ও হেডকোয়ার্টার পাহারা দিচ্ছে। তারা জানে, সুলতান এখানেই আছেন।
সকল ইউরোপীয় ও মুসলমান ঐতিহাসিক একমত যে, সুলতান আইউবী শত শত অশ্বারোহী বেছে নিয়ে শহর থেকে গোপনে বের হয়ে দামেস্ক রওনা হয়েছিলেন। কায়রো এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় খৃস্টান গোয়েন্দারা তৎপর ছিল। তাদের মধ্যে এমন মিসরী মুসলমানও ছিল, যারা সরকারী কর্মচারী। কিন্তু কেউ টের পায়নি যে, কায়রো থেকে সুলতান আইউবী এবং সাতশ অশ্বারোহী উধাও হয়ে গেছেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান আইউবী দামেস্ক প্রবেশ করা পর্যন্ত তার সকল তৎপরতা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। সে জন্য তিনি পথ চলতেন রাতে। দিনের বেলা কোথাও লুকিয়ে থাকতেন। সাতশ ঘোড়া ও সাতশ আরোহীকে লুকিয়ে রাখা কঠিন ছিল না। তিনি এমন পথে অতিক্রম করেন, যে পথে কোন কাফেলা চলাচল করে না। দুজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, সুলতান আইউবী এই গোপন সফরে সৈন্যদের সঙ্গে একজন সাধারণ সৈনিকেরই ন্যায় মিলেমিশে অবস্থান করেন। সকলের সঙ্গে খোশ-গল্প করতে থাকেন এবং কথা দিয়ে তাদেরকে শক্রর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে থাকেন। পাশাপাশি তাদেরকে বুঝাতে থাকেন যে, পরিস্থিতি কেমন এবং কিরূপ হতে যাচ্ছে। তিনি তার সৈনিকদেরকে আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হতে দেননি, মিথ্যা আশ্বাস দেননি। তাদেরকে তিনি সমস্যা ও বিপদ সম্পর্কে অবহিত করতে থাকেন। তার ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের প্রভাবে প্রত্যেক সৈন্য প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তারা উড়ে দামেস্কে পৌঁছে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিকদের মধ্যে অবশ্য এ ব্যাপারে দ্বিমত পাওয়া যায় যে, সময়টা ১১৭৪ সালে কোন্ মাস ছিল। কারো মতে জুলাই মাস। কারো মতে নবেম্ভর মাস। ইতিহাস পাঠে বুঝা যায়, সুলতান আইউবী সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে দামেস্কের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি মিসরের নির্বাহী ক্ষমতা গোপনে দুজন উপদেষ্টার হাতে সোপর্দ করে এসেছিলেন। সুদানের দিককার সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা মজবুত করে রেখে এসেছিলেন। উত্তরদিকের নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়, সর্বক্ষণ দিনে-রাতে সমুদ্রে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত নৌযান টহল দিতে থাকবে এবং নৌসেনাদের নিয়ে নৌজাহাজ সারাক্ষণ প্রস্তুত হয়ে থাকবে। সুলতান আইউবী তাঁর স্থলাভিষিক্তদের বলে এসেছেন, কোনদিক থেকে আক্রমণ আসলে আমার অপেক্ষা না করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি এই নির্দেশও প্রদান করে যান যে, কোন সীমান্তে দুশমন সামান্য গড়বড় করলেও কঠোর জবাব দেবে। সর্বক্ষণ আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত থাকবে। প্রয়োজন হলে সুদানের অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়ে মিশরের প্রতিরক্ষা অটুট রাখবে।
সুলতান আইউবী মিসরকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে সাতশ অশ্বারোহী নিয়ে চুপিসারে দামেস্ক অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছেন।
***
দামেস্কের দুর্গের প্রধান ফটকে সান্ত্রীরা টহল দিয়ে ফিরছে। হঠাৎ তারা দূর দিগন্তে ধূলিবালির মেঘ দেখতে পায়। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মেঘগুলো দামেস্কের দিকে ধেয়ে আসছে। সান্ত্রীরা কিছু সময় সেদিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, ব্যবসায়ী ও মুসাফিরদের কাফেলা হবে বোধ হয়। কিন্তু তাতে তো এত ধূলি উড়তে পারে না। সম্ভবত এগুলো ঘোড়া। মেঘমালা অনেক নিকটে চলে আসে। এবার মেঘের ভেতরে আবছা আবছা ঘোড়া দেখা যায়। তারপর ঊর্ধ্বে উঁচিয়ে ধরা বর্শার ফলা নজরে আসতে শুরু করে। প্রতি বর্শার মাথায় পতাকা বাধা। নিঃসন্দেহে এরা সৈন্য হবে। কিন্তু খলীফার ফৌজ হতে পারে না। এক সান্ত্রী নাকারা বাজিয়ে দেয়। দুর্গের অন্যান্য ফটক থেকেও নাকারা বেজে উঠে। দুর্গে যেসব সৈন্য ছিল, তারা প্রস্তুত হয়ে যায়। তীরন্দাজরা ধনুকে তীর সংযোজন করে পাঁচিলের উপর উঠে যায়। দুর্গের কমান্ডারও উপরে উঠে আসে। ধূলি উড়াতে উড়াতে আরোহীরা দুর্গের নিকটে চলে আসে এবং আক্রমণের বিন্যাসে এসে থেমে যায়। দুর্গের কমান্ডার অশ্বারোহীদের কমান্ডারের ঝাণ্ডা দেখে চমকে উঠেন। এত সালাহুদ্দীন আইউবীর ঝাণ্ডা! দুর্গের কমান্ডারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বলে দেয়া হয়েছিল, সুলতান আইউবী স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তিনি যদি এদিকে আসেন, তাহলে যেন তিনি শহরে ঢুকতে না পারেন।
