আপাদমস্তক ধূলিমলিন আলী বিন সুফিয়ান সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সম্মুখে দণ্ডায়মান। সুলতান আইউবী তাকে নাওয়া-খাওয়ার সময়ও দিলেন না। রিপোর্ট শোনার জন্য তিনি অস্থির-বেকারার। এখানেই তার খাওয়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়ে তাকে দফতরে নিয়ে যান। আলী বিন সুফিয়ান সুলতান আইউবীকে বিস্তারিত রিপোর্ট শোনান। নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীর পয়গাম, তার আবেগ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সালার তাওফীক জাওয়াদের সঙ্গে যে কথপোকথন হয়েছে, তারও বিবরণ দেন। শেষে বললেন, দামেস্ক থেকে আমি একটি উপঢৌকন নিয়ে এসেছি। এই উপঢৌকন হল চারজন খৃস্টান গোয়েন্দা পুরুষ ও চারটি মেয়ে। তিনি সুলতান আইউবীকে বললেন, আমি সন্ধ্যার আগে আগে তাদের থেকে কিছু মূল্যবান তথ্য উদ্ধার করব।
তার মানে আমাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেই হবে! সুলতান আইউবী বললেন।
হ্যাঁ, করতে হবে এবং আমরা অবশ্যই করব- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- তবে আমার আশা, গৃহযুদ্ধ হবে না।
সুলতান আইউবী তাঁর দুজন উপদেষ্টাকে তলব করেন। এই উপদেষ্টাদ্বয়ের উপর তার পূর্ণ আস্থা আছে। সুলতান তাদেরকে বললেন, এই মুহূর্তে আমি তোমাদেরকে যে কথাগুলো বলব, সেগুলো মনে গেঁথে নেবে। তোমরা দুজন ব্যতীত আলী বিন সুফিয়ানও এই গোপন ভেদ সম্পর্কে অবহিত থাকবে।
সুলতান আইউবী তাদেরকে দামেস্ক ও অন্যান্য ইসলামী রিয়াসত ও জায়গীরের পরিস্থিতির বিবরণ প্রদান করেন। আলী বিন সুফিয়ানের নিয়ে আসা রিপোর্ট শুনিয়ে বললেন, আল্লাহর সেনারা তাঁরই হুকুম তামিল করে থাকে। আমীর ও খলীফাদের আনুগত্য আমাদের উপর ফরজ। কিন্তু আমীর খলীফা যদি ইসলাম ও মুসলমানের দুশমনে পরিণত হয়, তখন ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা আল্লাহর সৈনিকদের জন্য ফরয হয়ে দাঁড়ায়। আমার অস্তিত্ব যদি দেশ ও জাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া কিংবা পায়ে শিকল পরিয়ে বন্দীশালায় আবদ্ধ করে রাখা তোমাদের জন্য কর্তব্য হয়ে পড়বে। আজ এমনি একটি কর্তব্য আমাদের সম্মুখে উপস্থিত। আমাদের খলীফা ইসলাম ও সার্বভৌমত্বের কথা ভুলে গিয়ে দুশমনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তিনি আজ ইসলামের দুশমনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছেন, তাদের গুপ্তচরদের আশ্রয় প্রদান করছেন। তার আশপাশের লোকেরা ভোগ-বিলাসিতায় ডুবে আছে। তারা সালতানাতে ইসলামিয়াকে বিক্রি করে খাচ্ছে। হাব-এর গবর্নর শামসুদ্দীন খৃস্টানদের হাতে আত্মসমর্পণ করে কর প্রদান করছে এবং তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। খৃস্টজগত চতুর্দিক থেকে আলমে ইসলামকে ঘিরে ফেলছে। এমতাবস্থায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে খলীফাকে গদিচ্যুত করে ইসলামের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের জন্য ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিনা পরামর্শ দিন।
অবশ্যই ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় উপদেষ্টা একবাক্যে জবাব দেন।
আমাদের পদক্ষেপ-পরিকল্পনা এই চারজনের মধ্যেই গোপন থাকবে। সুলতান আইউবী বললেন এবং তাদেরকে নিয়ে পরিকল্পনা প্রস্তুত করার কাজ শুরু করে দেন।
খৃস্টান গোয়েন্দা ও মেয়েদেরকে আলী বিন সুফিয়ান একটি বিশেষ পাতাল কক্ষে নিয়ে যান এবং বললেন, তোমরা এমন একটি জাহান্নামে এসে প্রবেশ করেছ, যেখানে তোমরা জীবিতও থাকবে না, মরবেও না। তোমাদের দেহগুলোকে কংকালে পরিণত করে আমি তোমাদের থেকে যেসব তথ্য উদ্ধার করব, ভালোয় ভাল আগেই সব বলে দাও। তবেই এই জাহান্নাম থেকে তোমরা মুক্তি পেয়ে যাবে। তোমাদেরকে চিন্তা করার জন্য কিছুক্ষণ সময় দিলাম। আমি একটু পরে আসছি।
আলী বিন সুফিয়ান যখন তাদেরকে বেড়ী পরানোর নির্দেশ প্রদান করেন, তখুন তাদের একজন বলল, আমরা আপনাকে সব কথা বলে দেব। আমরা বেতনভোগী কর্মচারী। শাস্তি যদি দিতেই হয়, আমাদেরকে না দিয়ে যারা আমাদেরকে খাটায়, তাদেরকে দিন। তাছাড়া আমরা পুরুষরা না হয় শাস্তি বরদাশত করতে পারব; কিন্তু এই মেয়েগুলোকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করুন।
কেউ তাদের গায়ে হাত দেবে না- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- তোমরা যদি আমার কাজ সহজ করে দাও, তাহলে তোমাদের মেয়েরা তোমাদেরই সঙ্গে থাকবে। এই পাতাল প্রকোষ্ঠ থেকে তোমাদেরকে বের করে নেয়া হবে এবং সসম্মানে নজরবন্দী করে রাখা হবে।
খৃস্টান গোয়েন্দারা যেসব তথ্য প্রদান করে, তাতে নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পর উদ্ভূত পরিস্থিতির সত্যতা প্রমাণিত হয়ে যায়।
***
তিন দিন পর।
মিসরের সীমান্ত থেকে অনেক দূরে- উত্তর-পশ্চিমে বিস্তীর্ণ একটি ভূখণ্ড। এলাকাটি পর্বতময়, উঁচু-নীচু টিলায় পরিপূর্ণ। মাঝে-মধ্যে সবুজ গাছগাছালী। আছে পানিও। এলাকাটা কাফেলা ও সেনা চলাচলের সাধারণ রাস্তা থেকে ভিন্ন। তার-ই অভ্যন্তরে এক স্থানে অনেকগুলো ঘোড়া বাঁধা আছে। ঘোড়াগুলোর সামান্য দূরে আড়ালে শুয়ে আছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। সেখান থেকে খানিক ব্যবধানে একটি তাঁবু। তাঁবুর ভিতরে শুয়ে আছেন এক ব্যক্তি। তিন চারজন লোক বিভিন্ন টিলার উপর হাঁটাহাটি করছে। এলাকার বাইরে বিক্ষিপ্তভাবে টহল দিয়ে ফিরছে আরো জন চারেক লোক।
তাঁবুর ভিতরে শায়িত লোকটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। টিলার উপরে-নীচে যারা ঘোরাফেরা করছে তারা প্রহরী। বেঁধে রাখা অশ্বপালের অদূরে শুয়ে থাকা লোকগুলো সুলতান আইউবীর সৈন্য। তারা সংখ্যায় সাতশত।
