দোস্তরা! আলী বিন সুফিয়ান বললেন- তোমাদের চরবৃত্তি অনেক দুর্বল। এখনো তোমাদের অনেক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। গুপ্তচর কি এভাবে সুনসান- জনমানবশূন্য অলিগলিতে ঘোরাফেরা করে? আর গুপ্তচর কি কোন অজানা লোকের সঙ্গে তার পরিচয় না পাওয়া পর্যন্ত কথা বলে? এই বিদ্যা তোমাদের আমার নিকট থেকে শিখতে হবে।
এই বিদ্যা আপনি আপনার লোকদেরই শিক্ষা দিন- এক খৃস্টান বলল আপনি কি আমাদের এই দক্ষতার প্রশংসা করবেন না যে, আমরা আপনারই একজন থেকে আপনাদের আসল পরিচয় জেনে নিয়েছি? এতো ভাগ্যের লীলা। আজ আপনি জিতে গেছেন, আমরা হেরে গেছি। আমাদের কমান্ডার যদি মৃত্যুবরণ না করতেন, তাহলে আজ আমরা এভাবে ধরা খেতাম না।
আমার সেই লোকটি কে, যে আমার গোপন তথ্য ফাঁস করে দিল? আলী বিন সুফিয়ান জিজ্ঞেস করলেন।
ঐ যে ঐ তাঁবুতে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটি একটি তাঁবুর প্রতি ইশারা করে উত্তর দিল- ও আমার ফাঁদে এসে পড়েছিল।
যাক গে, এসব আলাপ কায়রো গিয়ে হবে। আলী বিন সুফিয়ান বললেন।
ভোর হল। জনতা দেখতে পেল, একটি বণিক কাফেলা এগিয়ে চলছে। অনেকগুলো উটের পিঠে যেখানে ব্যবসার পণ্য বোঝাই করা, সেখানে কয়েকটি তাঁবুও পেঁচিয়ে রাখা আছে। আলী বিন সুফিয়ান ও তার একশ লোক ব্যতীত কেউ জানে না, এই তাঁবুগুলোর মধ্যে চারটি মেয়ে ও চারজন পুরুষ শুয়ে আছে। রওনা হওয়ার প্রাক্কালে আলী বিন সুফিয়ান শেষ রজনীর আলো আঁধারীতে এক একজন খৃস্টানকে এক একটি তাঁবুর মধ্যে পেঁচিয়ে উটের পিঠে বোঝাই করে বেঁধে নিয়েছেন। ওরা দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে, নাকি জীবিত থাকবে, তার কোন ভাবনা নেই আলী বিন সুফিয়ানের।
কাফেলা দামেস্ক অতিক্রম করে বেরিয়ে যায়। এখন আর পেছনের দিকে তাকালে শহরটা দেখা যায় না। আলী বিন সুফিয়ান বন্দী খৃস্টান গোয়েন্দাদেরকে তাঁবুর মধ্য হতে বের করেন। সকলেই জীবিত। তিনি মেয়েগুলোকে উটের পিঠে আর পুরুষদেরকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে নেন। তারা মুক্তির জন্য তাদের সমুদয় মণি-মাণিক্য ও সোনাদানা আলী বিন সুফিয়ানকে দিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করে। এগুলো তারা খলীফা ও আমীদেরকে উপঢৌকন দেয়ার জন্য এনেছিল। আলী বিন সুফিয়ান মুখে হাসির রেখা টেনে বললেন, এসব দৌলত তো আমার সঙ্গে যাচ্ছেই।
***
সে সময়ে রেমান্ড নামক এক খৃস্টান ত্রিপোলীর শাসক ছিলেন। বর্তমানকার লেবাননকে সে যুগে ত্রিপোলী বলা হত। অন্যান্য খৃস্টান শাসকরা অবস্থান করতেন জেরুজালেম ও তার আশপাশের এলাকায়। নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুতে তারা সকলেই আনন্দিত। ইতিমধ্যে তারা একটি বৈঠক করে ফেলেছেন। পরিকল্পনাসমূহকে পুনর্বিবেচনা করে দেখেন, ঠিক আছে কিনা। সে মোতাবেক খৃস্টান কমান্ডার আইরিজ তার বাহিনী নিয়ে হাল্ব পৌঁছে যান। হাবের আমীর হলেন শামসুদ্দীন। আইরিজ শামসুদ্দিনের নিকট বার্তা প্রেরণ করেন, আপনি হাবকে আমাদের হাতে তুলে দিন কিংবা চুক্তিনামায় সই করে আমাদেরকে কর প্রদান করুন। শামসুদ্দিন এই ভয়ে খৃস্টানদের কাছে। আত্মসমর্পণ করেন যে, দামেস্ক ও মওসেলের আমীরগণ আমাকে যুদ্ধে লিপ্ত দেখলে আমার রাজ্য কজা করে নেবে।
এই একটি মাত্র সাফল্যে খৃস্টানরা দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। তারা বুঝে ফেলে যে, এই মুসলমান আমীরগণ পরস্পর সহযোগী হওয়ার স্থলে একে অপরের দুশমন। তাই তারা বিনা যুদ্ধেই মুসলমানদেরকে পদানত করার পরিকল্পনা প্রস্তুত করে ফেলে। তাদের ভয় ছিল শুধু সালাহুদ্দীন আইউবীকে। আইউবীর নীতি ও চরিত্র সম্পর্কে তারা অবহিত। তাদের আশংকা ছিল, সুলতান আইউবী যদি দামেস্ক বা অন্য কোন এলাকায় এসে পড়েন, তাহলে তিনি সব আমীরকে ঐক্যবদ্ধ করে ফেলবেন। তিনি সকল আমীরকে অতিদ্রুত ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছিলেনও। রেমান্ড খলীফা আল-মালিকুস্ সালিহকে দূত মারফত মূল্যবান উপঢৌকনসহ এই প্রস্তাব পেশ করেছিলেন যে, প্রয়োজন হলে আমি আপনাকে সামরিক সহেযাগিতাও প্রদান করব।
ইসলামের অস্তিত্ব ও মর্যাদা প্রচণ্ড হুমকির সম্মুখীন। এ মুহূর্তে ইসলামের বাঁচা-মরা নির্ভর করছে সুলতান আইউবীর পদক্ষেপের উপর। বিলীয়মান প্রতিটি মুহূর্ত ইসলামকে ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। সুলতান আইউবী কায়রোতে আলী বিন সুফিয়ানের অপেক্ষা করছেন। তাকে আলীর রিপোর্ট অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তিনি বাগদাদ, দামেস্ক, ইয়ামান প্রভৃতি অঞ্চলে সেনা অভিযান প্রেরণের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। তার জন্য সমস্যা হল, মিসরের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ভাল নয় এবং সৈন্যও প্রয়োজনের তুলনায় কম। মিসর থেকে তিনি বেশী সৈন্য নিয়ে যেতে পারবেন না। এ মুহূর্তে এটাই তার বড় সমস্যা, যার জন্য তিনি অতিশয় বিচলিত যে, এত সামান্য সৈন্য দিয়ে কি তিনি সাফল্য অর্জন করতে পারবেন! কিন্তু তবুও সেনা অভিযান ছাড়া তরি গত্যন্তর নেই। সুলতান আইউবী প্রতিদিন দুএকবার ঘরের ছাদে উঠে একনাগাড়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন, যেদিক থেকে আলী বিন সুফিয়ান আসবেন। দিগন্তে দৃষ্টি মেলে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকছেন তিনি।
এভাবে একদিন তিনি দূর দিগন্তে ধূলিবালির কুন্ডলী দেখতে পান। ধূলির কুন্ডলী জমিন থেকে উত্থিত হয়ে যেন উপরদিকে উঠে যাচ্ছে। সুলতান আইউবী বাড়ির ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। ধূলির কুন্ডলী ধীরে ধীরে নিকটে এগিয়ে আসছে। একসময় ধূলির ভেতর ঘোড়া ও উটের কায়া নজরে আসে। এটা আলী বিন সুফিয়ানেরই কাফেলা। দামেস্ক থেকে রওনা হওয়ার পর পথে তিনি কমই যাত্রাবিরতি দিয়েছেন। মিসরের মিনার চোখে পড়া মাত্র তিনি উট ঘোড়ার গতি আরো বাড়িয়ে দেন। এ পরিস্থিতিতে একটি মুহূর্তের মূল্য কত, তা তিনি জানেন। তাঁর অপেক্ষায় যে সুলতান আইউবীর রাতে ঘুম আসছে না, সেই অনুভূতিও তার আছে।
