লোকটির মাথা ও মুখের অর্ধেকটা চাদর দিয়ে ঢাকা। তিনি বললেন, এখানে ধারে-কাছে কোন সরাইখানা নেই।
আছে এখান থেকে অনেক দূরে- নগরীর ওই প্রান্তে। বলে লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, এত রাতে আপনি সরাইখানা খুঁজছেন কেন? এখন তো আর আপনার জন্য কেউ সরাইখানার দরজা খুলবে না।
খৃস্টান বলল, এই আজই আমি একটি বণিক কাফেলার সঙ্গে এসেছি। সঙ্গে চারটি মেয়ে আছে; ওদেরকে তো আর তাঁবুতে রাখা যায় না।
হ্যাঁ, এটা তো সমস্যা- আগন্তুক বলল- আপনাকে সন্ধ্যার আগেই এর ব্যবস্থা করে রাখা আবশ্যক ছিল। যা হোক, আসুন, আমি আপনার সাহায্য করব। আপনি বিদেশী মানুষ, এখান থেকে গিয়ে যাতে বলতে না হয় যে, দামেস্কে আমার মেয়েরা খোলা মাঠে রাত কাটিয়েছে। আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলুন। মেয়েদেরকে নিয়ে আসুন, আমি সরাইখানা খুলিয়ে আপনাদের রাত যাপনের ব্যবস্থা করে দেব।
আগন্তুক খৃস্টান লোকটির সঙ্গে হাঁটা দেয়। দুজন কাফেলার তাঁবুর নিকট চলে যান। খৃস্টান তাকে একস্থানে দাঁড় করিয়ে বলল, আপনি এখানে দাঁড়ান, আমি ওদেরকে নিয়ে আসছি। বলেই সে তাঁবুর একদিক থেকে চক্কর কেটে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।
খৃস্টানদের তাঁবু এখান থেকে সামান্য দূরে অন্য জায়গায়। তাঁবুতে পৌঁছে সে সঙ্গীদের বলল, একজন লোক আমার সঙ্গে এসেছে, তিনি আমাদেরকে সরাইখানায় জায়গার ব্যবস্থা করে দেবেন। সঙ্গীরা কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। পাছে এই লোকটিও ধোঁকা দিয়ে বসে কিনা। কিন্তু ভয় পেয়ে লাভ নেই। যে জালে আটকা পড়েছে, সেখান থেকে যে কোন মূল্যে হোক বের তাদের হতেই হবে। মিসরী গোয়েন্দা মেয়েটিকে এতটুকুও বলে দিয়েছে যে, খলীফা ও আমীরগণ খৃস্টানদের পদানত হয়ে পড়েছেন। সে জন্য আলী বিন সুফিয়ান ছদ্মবেশে একশ যুদ্ধবাজ গোয়েন্দা নিয়ে এখানে এসেছেন। তার মিশন হল, এখানকার পরিস্থিতি যাচাই করা যে, খৃস্টানদের প্রভাব কতটুকু বিস্তার লাভ করেছে এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর জন্য সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী কিনা।
মেয়েটি আলী বিন সুফিয়ানের এই মিশনের কথা তার সঙ্গীদের অবহিত করেছিল। তাদের কাছে এটা এতই মূল্যবান তথ্য যে, রাতারাতি খলীফার কানে দিতে পারলে প্রশংসা লাভ করা যেত। তাছাড়া খৃস্টান শাসকদের নিকটও সংবাদটা পৌঁছানো দরকার, যাতে তারা সময়মত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তারা এমনও সংকল্প করে যে, আলী ও তার এই দলটিকে খলীফাকে দিয়ে ধরিয়ে দিতে পারলে মন্দ হত না।
তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, আলী বিন সুফিয়ানের লোকেরা তো ঘুমিয়ে আছে; আমরা সবাই একত্রে বেরিয়ে যাব। মালপত্র ও পশুগুলোকে এখানেই রেখে যাব। ভোর পর্যন্ত তো এই মিশরী দলটি খলীফার হাতে ধরা পড়ছেই। পরে আমাদের মালামাল আমরা নিয়ে নেব।
সব কজন একত্রে তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসে। পা টিপে টিপে আড়ালে আড়ালে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে সেই স্থানে গিয়ে পৌঁছে, সেখানে সাহায্যকারী লোকটিকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন লোকটা জায়গায় নেই। সবাই এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। ঠিক এমন সময় উটের আড়াল থেকে বেশ কজন লোক উঠে দাঁড়ায় এবং খৃস্টান দলটিকে ঘিরে ফেলে। তাদেরকে হাঁকিয়ে একদিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকটি প্রদীপ জ্বালান হয়। আলী বিন সুফিয়ান তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, দোস্তরা, কোথায় যাচ্ছ? তারা মিথ্যা জবাব দেয়। আলী বিন সুফিয়ান জিজ্ঞেস করেন, সরাইখানার সন্ধানে দিশেহারার ন্যায় ঘুরছিল যে লোকটি, সে কে?
একজন বলল, আমি।
আর যার নিকট সরাইখানার সন্ধান জিজ্ঞাসা করেছিলে- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- সে হলাম আমি।
এ এক আকস্মিক ঘটনা। আলী বিন সুফিয়ান তাওফীক জাওয়াদের ঘর থেকে ফিরছিলেন আর একই পথে খৃস্টান লোকটি সরাইখানার সন্ধানে যাচ্ছিল। লোকটি আলী বিন সুফিয়ানকে সরাইখানার পথ জিজ্ঞেস করে। আলো থাকলে লোকটি আলীকে চিনে ফেলত। কিন্তু একে তো ছিল অন্ধকার, দ্বিতীয়ত আলী বিন সুফিয়ানের মাথা ও মুখমণ্ডল ছিল রুমাল দ্বারা ঢাকা। লোকটির দুএকটি কথা শুনেই তিনি বুঝে ফেললেন, ওরা জেনে ফেলেছে যে, ওরা ফাঁদে আটকা পড়েছে; তাই পালাবার পথ খুঁজছে। আলী বিন সুফিয়ান নিশ্চিত ছিলেন, এই খৃস্টানরা গোয়েন্দা। কিন্তু এখানে আমীরদের কেউ না কেউ তাদেরকে আশ্রয় দেবেন। তাই তিনি সাহায্যের ফাঁদ পেতে তাকে আটকে ফেলেছেন এবং তার সঙ্গে তাঁবু পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। তিনি ভাবছিলেন, এ মুহূর্তে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়। খৃস্টান লোকটি তাঁর প্রতি করুণাই করেছে যে, তাকে তাবু থেকে অনেক দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে গেছে।
আলী বিন সুফিয়ান তৎক্ষণাৎ তাঁর দুতিনজন লোককে জাগিয়ে তোলেন এবং নেহায়েত দ্রুততার সাথে তাদেরকে তাদের কর্তব্য বুঝিয়ে দিলেন। দিক নির্দেশনা দিয়ে তিনি নিজে খৃস্টানদের তাঁবুর নিকটে নিয়ে যান। মেয়েদেরসহ তারা সবাই একটি তাঁবুতে জড়ো হয়েছে। আলী বিন সুফিয়ান পা টিপে টিপে সন্নিকটে গিয়ে তাদের কথোপকথন শ্রবণ করেন। তিনি এতটুকু জানতে পারেন যে, খৃস্টান গোয়েন্দারা তার মিশন জেনে ফেলেছে। কিন্তু এই গোপন তথ্য কিভাবে ফাঁস হল, তা জানতে পারলেন না।
ইত্যবসরে আলী বিন সুফিয়ানের লোকেরা তার নির্দেশনা মোতাবেক বর্শাসজ্জিত হয়ে উটপালের আড়ালে গিয়ে বসে পড়েছে। খৃস্টানদের এখানেই আসবার কথা। যেইমাত্র তারা এখানে এসে উপস্থিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে আলী বিন সুফিয়ানও এসে হাজির হন এবং সবাইকে ঘিরে ফেলে বন্দী করে ফেলেন।
