কিন্তু যা-ই বলি, পুত্র তো আমার নাবালক, এখনো সবকিছু বুঝে উঠার বয়স হয়নি। আমার পুত্র যেসব আমীর দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আছে, আমি তাদের নিকটও গিয়েছি। তারা আমাকে শ্রদ্ধা করে বটে, কিন্তু মান্য করতে প্রস্তুত নয়। তারা আমার কথা মানছে না। খৃস্টানরা তাদের সম্রাট ও বন্দী সৈন্যদের মুক্তি দিয়ে ইসলামের মুখে চপেটাঘাত করেছে। আমার নিকট অবাক লাগে যে, সুলতান আইউবী কায়রোতে বসে কী করছেন। তিনি আসছেন না কেন? সালাহুদ্দীন আইউবী কী ভাবছেন আলী বিন সুফিয়ানঃ তুমি তাকে বলবে, তোমার এক বোন তোমার আত্মমর্যাদার জন্য মাতম করছে। তাকে বলবে, আমি এই কালো পোশাক সেইদিন খুলব, যেদিন তোমরা দামেস্কে প্রবেশ করে বিলাসপ্রিয় ও ঈমান বিক্রেতাদের হাত থেকে মিল্লাতে ইসলামিয়ার মর্যাদাকে রক্ষা করবে। অন্যথায় আমি এই পোশাকেই মৃত্যুবরণ করব আর অসিয়ত করে যাব, যেন আমাকে এই পোশাকেই দাফন করা হয়। আমি কিয়ামতের দিন আমার স্বামী ও আল্লাহর সম্মুখে সাদা পোশাকে উপস্থিত হতে চাই না।
আমি আপনার মনের কথা বুঝতে পারছি- আলী বিন সুফিয়ান বললেন আসুন আমরা কাজের কথা বলি। সুলতান আইউবীও আপনারই ন্যায় অস্থির বেকারার। আবেগ ও উত্তেজনাবশত আমাদের কোন পদক্ষেপ নেয়া ঠিক হবে না। এখানকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা আবশ্যক। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে গৃহযুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারি। তার পন্থা একটাই যে, দেশের জনগণ আমাদের পক্ষে থাকবে। আর সেনাবাহিনীর ব্যাপারে ভাই তাওফীক জাওয়াদ আমাকে নিশ্চয়তা দিয়েছে যে, ফৌজ আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে না। তবে খলীফা ও আমীরদের রক্ষীবাহিনী মোকাবেলা করতে পারে।
দেশের জনগণ আপনাদের সঙ্গে আছে- জঙ্গীর স্ত্রী বললেন- আমি মহিলা মানুষ; ময়দানে গিয়ে যুদ্ধ করতে পারব না। তবে আমি অন্য অঙ্গনে লড়ে যাচ্ছি। আমি দেশের নারী সমাজের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগ্রত করে রেখেছি যে, আপনি যে কোন সময় তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যেতে পারবেন। আমার ব্যবস্থাপনায় এখানকার যুবতী মেয়েরা তরবারী চালনা ও তীরন্দাজীতে দক্ষতা অর্জন করেছে। তারা তাদের পুত্র, পিতা, স্বামী ও ভাইদেরকে স্ফুলিঙ্গ বানিয়ে রেখেছে। আমি যেসব মহিলাদের দ্বারা প্রশিক্ষণ দিয়েছি, তারা আমার অনুগত। পরিস্থিতি যদি গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে প্রতিটি গৃহকে মহিলারা খলীফার ফৌজের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করে ফেলবে। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি ফৌজ নিয়ে আসেন, তাহলে আমার খলীফা পুত্র ও তার চাটুকাররা নিজেদেরক সঙ্গীহীন দেখতে পাবে। তুমি যাও ভাই আলী! ফৌজ নিয়ে আস। এখানকার পরিস্থিতি আমার উপর ছেড়ে দাও। তুমি নিশ্চিত থাক, জনগণের দিক থেকে একটি তীরও তোমাদের গায়ে বিদ্ধ হবে না। যদি আমার পুত্রকে হত্যা করে ফেলার প্রয়োজন মনে কর, তাহলে। ভুলে যেও সে আমার ও নুরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্র। আমি আমার পুত্রকে খণ্ডবিখণ্ড করাতে রাজি আছি, সালতানাতে ইসলামিয়াকে টুকরো টুকরো করতে দিতে রাজি নই।
তাওফীক জাওয়াদও আলী বিন সুফিয়ানকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, গৃহযুদ্ধ হবে না। তারপর তিনজন মিলে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন যে, সুলতান আইউবী কিভাবে আসবেন এবং এসে কি করবেন। সিদ্ধান্ত হল, সুলতান আইউবী আসনে নীরবে, খলীফা ও তার চাটুকারদের অজান্তে।
***
আলী বিন সুফিয়ানের লোকটিকে তাঁবুতে বসিয়ে রেখে খৃস্টান মেয়েটি তার সঙ্গীদের নিকট গিয়ে বলে, শিকার জালে আটকা পড়েছে। এরা সবাই মিসরী ফৌজের যুদ্ধবাজ গোয়েন্দা। বিখ্যাত গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান তাদের কমান্ডার।
এই তথ্য খৃস্টানদের চমকে দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে যে, এখন কি করা যায়। এখানে থাকা তাদের জন্য নিরাপদ নয়।
মেয়েটি পুনরায় মিসরী গোয়েন্দার কাছে ফিরে যায়। এক খৃষ্টান বাইরে বেরিয়ে আলী বিন সুফিয়ানকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু আলীকে পায় না সে। তিনি তো তখন তাওফীক জাওয়াদের ঘরে বসা। আলী এখানে আছে কি নেই, এটাই লোকটির জানা দরকার। আলীকে অনুপস্থিত দেখে মনে ভয় জাগে যে, তিনি তাদেরকে গ্রেফতার করার ব্যবস্থা করছেন। সঙ্গীদের নিকট গিয়ে সে জানায়, বিলম্ব না করে এক্ষুণি এখান থেকে পালাতে হবে।
এখন মধ্য রাত। এরা এই নগরী সম্পর্কে অজ্ঞ। দিনের বেলা হলে গন্তব্য একটা ঠিক করে নিতে পারত। তাছাড়া এই রাত দুপুরে মেয়েদের নিয়ে চলাও অনুচিত।
একজন পরামর্শ দিল, চল আমরা কোন একটা সরাইখানায় গিয়ে উঠে। বলব, আমরা কায়রোর ব্যবসায়ী; বাইরে খোলা মাঠে ঘুমুতে পারি না, তাই সরাইখানায় রাত কাটাতে চাই। তার এই মতের উপরই সিদ্ধান্ত হল। কিন্তু সরাইখানা কোথায়, সেটা তাদের জানা নেই।
একজন লুকিয়ে লুকিয়ে সরাইখানার সন্ধানে বের হয়। লোকটি হাঁটছে। রাস্তাঘাট, হাটবাজারে কোথাও জনমানুষের চিহ্ন নেই। একজন মানুষও তার নজরে পড়ল না, যাকে জিজ্ঞেস করবে এখানে সরাইখানার কোথায়।
লোকটি এলোপাতাড়ি ঘুরছে। হঠাৎ সামনে একজন লোককে এগিয়ে আসতে দেখে। অন্ধকারে এতটুকুই বুঝতে পারে, একজন মানুষ আসছে। নিকটে আসলে খৃস্টান লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করে, ভাই এদিকে সরাইখানা কোথায় বলতে পারেন কি?
