লোকটি চকিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, তা তুমি এই কাফেরদের সঙ্গে কিভাবে আসলে?
আমি বারটি বছর ধরে এদের সঙ্গে আছি- মেয়েটি জবাব দেয়- আমি জেরুজালেমের বাসিন্দা। তখন আমার বয়স ছিল বার বছর। আমার পিতা যখন আমাকে বিক্রি করে দেন, তখন আমি জানতাম না, আমার খরিদ্দার খৃস্টান। তারা আমাকে সেই কাজের প্রশিক্ষণ দেয়, এই আজ যে কাজের জন্য আসলাম। আমি দামেস্ক ও বাগদাদের নাম শুনেছি। নামগুলো আমার কাছে বেশ ভাল লাগে। এই ভূখণ্ডে পা রাখা মাত্র এর আবহাওয়া আমার ভেতরে ধর্মীয় চেতনা জাগিয়ে দিয়েছে। আমি মুসলমান, মুসলমানদের ধ্বংসের জন্য আমি কাজ করতে পারব না।
মেয়েটি অতিশয় আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠে। বলল- আমার হৃদয় কাঁদছে। আমার আত্মা কাঁদছে। লোটটির হাত দুটো চেপে ধরে টেনে নিজের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে বলল, তুমিও মুসলমান, চল আমরা পালিয়ে যাই। তুমি আমাকে যেখানে নিয়ে যাবে, আমি সেখানেই যাব। ধু ধু মরু প্রান্তরে নিয়ে যাবে? আমি সহাস্যবদনে সেখানে যাব। তুমিও স্বজাতিকে ধোঁকা দেয়া থেকে ফিরে আস। আমাদের কাছে অনেক স্বর্ণমুদ্রা আছে; আমি সেগুলো নিয়ে নেব। চল, আমরা পালিয়ে যাই।
আলী বিন সুফিয়ানের এই লোকটি বুদ্ধিমান ছিল বটে, কিন্তু এখন মেয়েটির রূপ ও কথার ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। তার ডিউটির কথা মনে পড়ে। সে মদপান করেনি, হাশীশও নয়। হাশীশের ঘ্রাণ কেমন তার জানা আছে। সে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, তোমরা এখানে কেন এনেছ? মেয়েটি তাদের মিশনের কথা জানায়। লোকটি বলল, আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, এখানে তোমরা মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিতে পারবে না। সত্য সত্যই যদি তুমি এ- কাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে থাক, তাহলে তোমার সৌভাগ্য যে, তুমি আমাদের হাতে এসে পড়েছ। পালাতে হবে না, তুমি আমাদের সঙ্গেই থাকতে পারবে। আমরা কেউ খৃস্টানদের গুপ্তচর নই। আমরা সবাই মিসরের যুদ্ধবাজ গোয়েন্দা।
মেয়েটি আনন্দের আতিশয্যে লোকটিকে জড়িয়ে ধরে। লোকটি বলল, আমি আমার কমান্ডারকে বলব, তোমাকে যেন অন্য মেয়েদের থেকে আলাদা রাখা হয় এবং কোন আমীর বা অন্য কারো হাতে সোপর্দ না করেন।
মেয়েটি অস্থিরচিত্তে লোকটির হাতে চুমো খেতে শুরু করে। মিশন তার সফল। আলী বিন সুফিয়ানের এত সতর্ক একজন গোয়েন্দা একটি খৃস্টান গোয়েন্দা মেয়ের প্রতারণার শিকার হয়ে পড়ল।
একটু অপেক্ষা করুন- মেয়েটি বলল- আমি দেখে আসি আমার সঙ্গীরা ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা। .. .।
মেয়েটি তাবু থেকে বেরিয়ে যায়।
***
আলী বিন সুফিয়ান সালার তাওফীক জাওয়াদের ঘরে বসে নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রীর অপেক্ষা করছেন। ইসলামের মহান মুজাহিদের স্ত্রী দূত মারফত সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট তার চিন্তা-চেতনা ও আবেগের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তারপরও আলী বিন সুফিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা জরুরী। তার নিকট থেকে অনেক তথ্য জানতে হবে এবং পরিকল্পনা ঠিক করতে হবে।
কিছুক্ষণ পর সম্মানিতা মহিলা এসে উপস্থিত হন। তিনি কালো ওড়নায় আবৃতা। মুখে কৃত্রিম দাড়ি থাকার কারণে আলী বিন সুফিয়ানকে প্রথমে চিনতে পারেননি। পরক্ষণে পরিচয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন
এমন একটি সময়ও আমাদের ভাগ্যে লেখা ছিল যে, আমরা দুজন এভাবে লুকিয়ে ও ছদ্মবেশ ধারণ করে পরস্পর সাক্ষাৎ করব। তুমি এখানে মাথা উঁচু করে আসতে। এবার এসেছ এমনভাবে, যেন তোমাকে কেউ চিনতে না পারে। আর আমিও ঘর থেকে এমন সাবধানে বের হয়েছি, যেন কেউ আমার পিছু না নেয় যে, আমি কোথায় যাচ্ছি।
আলী বিন সুফিয়ানও অশ্রু সংবরণ করতে পারলেন না তিনি। আবেগে এতই আপ্লুত হয়ে পড়েন যে, দীর্ঘক্ষণ কোন কথাই তার মুখ থেকে বেরুল না। নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী বললেন
আলী বিন সুফিয়ান! এই পোশাক আমি স্বামীর শোক পালনের জন্য পরিধান করিনি। আমি শোক পালন করছি ইসলামের সেই মর্যাদার জন্য, যা আমার জাতির অলংকার। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদেশের শাসকরা আমার পুত্রকে ক্রীড়নকে পরিণত করে জাতীয় মর্যাদাকে খৃস্টানদের পায়ে অর্পণ করেছে। তুমি সম্ভবত জান না, যে খৃস্টান সম্রাটকে সুলতান জঙ্গী বন্দী করে রেখেছিলেন, গতকাল খলীফার নির্দেশে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
এই সেই সম্রাট রেজােল্ড, যাকে মাস কয়েক আগে নুরুদ্দীন জঙ্গী বেশ কজন খৃস্টান সৈন্যের সঙ্গে এক লড়াইয়ে গ্রেফতার করেছিলেন। নুরুদ্দীন জঙ্গী তাকে ও অন্যান্য বন্দীদেরকে কার্ক থেকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন।
এ ঘটনায় জঙ্গী বেশ আনন্দিত ছিলেন। তিনি বলতেন, আমি খৃস্টানদের সঙ্গে এমন একটি চাল খেলে এই সম্রাটকে মুক্ত করব, যে চাল তাদের কোমর ভেঙ্গে দেবে। একজন সম্রাট ও উচ্চপদস্থ কমান্ডারের গ্রেফতারি সাধারণ কোন ব্যাপার ছিল না। আমরা তার পরিবর্তে খৃস্টানদের থেকে আমাদের অনেক দাবি-দাওয়া আদায় করে নিতে পারতাম। কিন্তু গতকাল আমার পুত্র আনন্দের সাথে আমাকে বলল, মা! আমি খৃস্টান সম্রাট এবং তার সঙ্গীসহ সব খৃস্টান বন্দীকে মুক্ত করে দিয়েছি। সংবাদটি আমার মনে প্রচণ্ড একটা আঘাত হানে। আমি অনেকক্ষণ পর্যন্ত আত্মভোলার ন্যায় বসে থাকি। তারপর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে পুত্রকে জিজ্ঞেস করলাম, বিনিময়ে নিজের বন্দীদের ছাড়িয়ে এনেছ কি? পুত্র জবাব দেয়, ওদেরকে ফিরিয়ে এনে আমরা আর কি করব। আমরা তো আর কারো সঙ্গে যুদ্ধ করব না। আমি পুত্রকে বললাম, তুমি এখন থেকে আর তোমার বাপের কবরের নিকট যাবে না। আর তুমি মারা গেলেও তোমার পিতার কবরস্থানে তোমাকে দাফন করব না। সেই করবস্থানে এমন বহু মুজাহিদও শুয়ে আছেন, যারা খৃস্টানদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তোমাকে সেখানে দাফন করে আমি তাদের অবমাননা করতে চাই না। তুমি নুরুদ্দীন জঙ্গীর কলংক…।
