দেখ, দেশের জনসাধারণ অত তাড়াতাড়ি বোধ হারায় না- তাওফীক জাওয়াদ বললেন- যে জাতি তাদের সন্তানদেরকে কুরবানী দিয়েছে, তারা দুশমনকে কখনো ক্ষমা করতে পারে না। আবার যে সেনাবাহিনী দুশমনের মুখোমুখি লড়াই করেছে, তারাও এত দ্রুত দমে যায় না। কিন্তু শাসকদের হাতে এমন সব অস্ত্র থাকে, যা দেশের জনগণ ও সেনাবাহিনীকে লাশে পরিণত করে ফেলে। এখন জনগণ ও ফৌজের মধ্যে নেফাঁকের বীজ বপন করা হচ্ছে। ফৌজকে জনগণের চোখে হেয় করা হচ্ছে।
আমি মোহতারাম নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই– আলী বিন সুফিয়ান বললেন- তিনি খলিফর মা-ও বটে। সুলতান আইউবীর নিকট তিনি বার্তা প্রেরণ করেছিলেন যে, আপনি ইসলামের মর্যাদা রক্ষা করুন। তাকে কি এখানে ডেকে আনা সম্ভব?
এই তো কাল-ই তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল- তাওফীক জাওয়াদ জবাব দেন- ঠিক আছে, তাকে ডেকে পাঠাচ্ছি। তোমার নাম শুনলে তিনি ছুটে আসবেন।
তাওফীক জাওয়াদ তার চাকরানীকে ডেকে বললেন, খলীফার আম্মার কাছে গিয়ে আমার সালাম জানাবে এবং কানে কানে বলবে, কায়রো থেকে একজন মেহমান এসেছেন।
***
আলী বিন সুফিয়ান যখন তাওফীক জাওয়াদের গৃহে বসে কথা বলছেন, সে সময় তার তাঁবু এলাকায় চলছিল সরগরম অবস্থা। রাত অনেক হয়েছে। ক্রেতাদের ভীড় শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ হল। আলীর একশ লোক এসেছে দীর্ঘ সফর করে। বাজার থেকে বকরী ও দুম্বা কিনে এনেছে। এখন তারা রান্না করে সেগুলো আহার করছে। চলছে হাসি-কৌতুক। মেয়েগুলো আলাদা একটি তাঁবুতে অবস্থান নিয়েছে। খৃস্টান পুরুষরা বসে আছে আলীর লোকদের সঙ্গে। আসরের পূর্ণতা লাভের জন্য মদের পাত্র বের করে নিয়েছে তারা। সবাইকে মদপান করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আলীর লোকেরা সকলেই না করে দেয়। খৃস্টানরা অবাক হয়। আলী বিন সুফিয়ান তাদেরকে বলেছিলেন, আমার লোকদের মধ্যে মুসলমানও আছে, খৃস্টানও আছে। যারা মুসলমান তাদের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, এরা ফেদায়ী। আর ফেদায়ীরা তো নামের মুসলমান। হাসান ইবনে সাব্বাহর দলের মানুষ, যারা মদকে হারাম ভাবে না। অথচ এদের একজনও মদপান করতে রাজি হল না! ব্যাপারটা কি? খৃস্টানদের মনে সন্দেহ জাগে। পরিস্থিতি যাই হোক, এরা তো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গোয়েন্দা। তারা আরো এমন দুচারটি লক্ষণ দেখতে পায়, যার ভিত্তিতে তাদের সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। তারা এক এক করে আসর থেকে উঠতে শুরু করে, যেন তাঁবুতে ঘুমাতে যাচ্ছে।
আসর থেকে উঠে গিয়ে তারা মেয়েদেরকে বলে, তোমরা তোমাদের যোগ্যতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন কর, দেখ, আসলে এরা কারা। একটি মেয়ে স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় এবং এই বলে বাইরে চলে যায় যে, এই তবুটি খালি করে দাও। মেয়েটি উঠে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক পায়চারি করতে থাকে। অবশেষে আলী বিন সুফিয়ানের এক লোক উঠে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যায়। লোকটি কেন গেল বুঝা গেল না। মেয়েটি তাকে থামিয়ে বলল, তাঁবুতে বসে বসে ভয় পাচ্ছিলাম, তাই একটু বাইরে বেড়াতে আসলাম। মেয়েটা পুরুষদেরকে আঙ্গুলে করে নাচাতে জানে। তার মোহনীয় কথা ও ভঙ্গিমায় লোকটা ভুলেই যায় যে, সে কোথায় যেতে উঠেছিল। মেয়েটি বলল, আমাদের সঙ্গে যে লোকগুলো আছে, ওরা বড় খারাপ মানুষ। আমরা এখানে তোমাদের ন্যায় অন্য এক কাজে এসেছিলাম। কিন্তু লোকগুলো আমাদেরকে বেজায় উত্যক্ত করে ফিরছে। আচ্ছা, তুমি কি আমার তাঁবুতে এসে ঘুমাতে পার? তাহলে আমি ওদের থেকে রক্ষা পাই। বলে মেয়েটি এমন কিছু আচরণ করে, যার ফলে লোকটি মোমের মত গলে যায় এবং মেয়েটির তাঁবুতে চলে যায়।
তাঁবুর মধ্যে মিটমিট করে একটি প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় মেয়েটি লোকটির আপাদমস্তক এক নজর দেখে নিয়ে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলল, উহ! তুমি তো বড় সুশ্রী পুরুষ। তুমিই আমার হেফাজত করতে পারবে। এই বলে এক পেয়ালা মদ লোকটির প্রতি এগিয়ে দিয়ে বলল- নাও, পান কর।
না।
কেন?
আমি মুসলমান।
এত পাক্কা মুসলমানই যদি হয়ে থাক, তাহলে ক্রুশের জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করতে আসলে কেন?
লোকটি চমকে উঠে বলল, এর বিনিময় পাই।
মেয়েটা যতটা না রূপসী, তার চেয়ে বেশী চতুর। এই উভয় অস্ত্র ব্যবহার করে সে আলী বিন সুফিয়ানের এই লোকটির দেল-দেমাগ কজা করে ফেলে। মেয়েটি বলল, মদপান না কর তো শরবত এনে দেই। বলেই সে অন্য তাবুতে চলে যায় এবং একটি পেয়ালা হাতে নিয়ে আসে। শরবতের পেয়ালাটা লোকটির দিকে বাড়িয়ে দেয়। লোকটি পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মুখের সঙ্গে লাগিয়েই মুচকি একটা হাসি দিয়ে পেয়ালাটা রেখে দেয়। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, এর মধ্যে হাশীশ কতটুকু দিয়েছ?
অকস্মাৎ মেয়েটি নিরুত্তর হয়ে যায়। কিন্তু তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, বেশী নয়; এই যতটুকুতে কিছু সময়ের জন্য তোমাকে আত্মভোলা করে রাখা যায়।
কেন?
আর কেন? আমি তোমাকে হাত করতে চাই- ধীর কণ্ঠে মেয়েটি বলল আমার কথাগুলো যদি তোমার কাছে খারাপ লাগে, তাহলে তোমার খঞ্জরটা আমার বুকে বিদ্ধ করে দাও। আমি তোমাকে হঠাৎ পেয়ে যাইনি। আমি তোমার ওদিকে আসা দেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সফরকালে আমি তোমাকে গভীর মনে দেখেছিলাম। মনে হচ্ছিল, তুমি আর আমি কোথায় যেন কখনো একত্রে ছিলাম এবং একজন আরেকজনের পরিচিত। তোমাকে আমার মনে ধরেছে। দেখলে না, আমি তোমাকে মদ পেশ করেছি, কিন্তু নিজে পান করিনি। কারণ, আমি মুসলমান। এরা আমাকে জোর করে মদপান করায়।
