আলী বিন সুফিয়ান ঘোষণা করে দেন, দশটি ঘোড়াও বিক্রি হবে। এই ভীড়ের মধ্যে দামেস্কের ব্যবসায়ী-দোকানদাররাও আছে। দুচার ঘন্টার মধ্যে লোক সমাগম এক মেলার রূপ ধারণ করে। আলী বিন সুফিয়ান তার লোকদেরকে বলে দেন, যেন তারা মালপত্র দ্রুত বিক্রি না করে আটকে রাখে। তিনি তার কয়েকজন বিচক্ষণ লোককে বলে দেন, তোমরা জনতার মধ্যে মিশে যাও এবং সুযোগমত তাদের মনমানসিকতা জেনে নাও। তারা পরিধানের চোগা খুলে ফেলে ছদ্মবেশে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। দুতিনজন চলে যায় শহরে।
আলী বিন সুফিয়ান ও তার সকল লোকজন মাগরিবের নামায বিভিন্ন মসজিদে আদায় করে নেয়। তিনি খৃস্টান দলটিকে তাঁবুতে রেখে যান। তারা মসজিদে স্থানীয় লোকদেরকে জানায়, আমরা ব্যবসায়ী, কায়রো থেকে এসেছি। গল্প-গুজবের মধ্যদিয়ে তারা লোকদের মনোভাব জেনে নেয়। লোকদের চিন্তাধারা ও চেতনা আশাব্যঞ্জক। কিছু লোককে ভীত-সন্ত্রস্ত পাওয়া যায়। তারা নতুন খলীফা ও আমীরদের বিরুদ্ধে কথা বলে। তাদের মধ্যে সমাজের উঁচু স্তরের লোকও আছে। অধিকাংশেরই বিশ্বাস, খৃস্টশক্তি ইসলামী দুনিয়ার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং খেলাফত বিলাসী আমীরদের হাতে চলে গেছে। তারা অত্যন্ত বিচলিত ও হতাশাগ্রস্ত। তারা বলে, জঙ্গীর পর এখন একমাত্র সালাহুদ্দীন আইউবীই অবশিষ্ট আছেন, যিনি ইসলামের নাম জীবিত রাখতে সক্ষম হবেন।
আলী বিন সুফিয়ান তার লোকদেরকে বলে দিয়েছেন, এই নারী ও পুরুষগুলো খৃস্টান এবং তাদের নিকট এক কথাই প্রকাশ করতে হবে যে, আমরা সবাই ক্রুশের মিশন নিয়ে এসেছি। আমাদের প্রতি তাদের কোন সন্দেহ নেই। তিনি তাদেরকে বলে দিয়েছেন, এ রাতটা তোমরা বিশ্রাম কর এবং আমার নির্দেশের অপেক্ষা কর।
আলী বিন সুফিয়ান রাতে তাওফীক জাওয়াদের ঘরে চলে যান। বেশভূষা বণিকের। মুখমণ্ডলে কৃত্রিম দাড়ি। তিনি দারোয়ানকে বললেন, ভেতরে সংবাদ দাও, কায়রো থেকে আপনার এক বন্ধু এসেছেন। দারোয়ান ভেতরে সংবাদ পাঠায়। আলী বিন সুফিয়ানকে ভেতরে ডেকে নেয়া হয়। তাওফীক জাওয়াদ আলীকে চিনতে পারলেন না। আলী কথা বললে এবার তিনি চিনে ফেলেন এবং দাঁড়িয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন। এই লোকটার প্রতি আলী বিন সুফিয়ানের আস্থা আছে। তিনি তার আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেন এবং বললেন, আমি কয়েকজন খৃস্টান গোয়েন্দাকে ফাঁদে আটকিয়েছি। এখন ভাবতে হবে তাদেরকে কিভাবে কাজে লাগান যায়।
তার আগে বলুন এখানকার পরিস্থিতি কী?- আলী বিন সুফিয়ান জিজ্ঞেস করলেন- কায়রোতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংবাদ পৌঁছেছে।
সুলতান জঙ্গীর মৃত্যু পরবর্তী পরিস্থতি সম্পর্কে কায়রো যেসব সংবাদ পৌঁছেছে, তাওফীক জাওয়াদ তার সবগুলোরই সত্যতার স্বীকৃতি প্রদান করেন। তিনি বললেন
আলী ভাই! তুমি একে হয়ত গৃহযুদ্ধ বলবে; কিন্তু খৃস্টানদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে হলে সালাহুদ্দীন আইউবীকে খেলাফতের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালনা করতেই হবে।
আচ্ছা, আমরা যদি কায়রো থেকে সেনা অভিযান পরিচালনা করি, তাহলে এখানকার ফৌজ কি আমাদের মোকাবেলা করবে? আলী বিন সুফিয়ান জিজ্ঞেস করেন।
তোমরা হামলার ভাব নিয়ে এস না- তাওফীক জাওয়াদ জবাব দেন সালাহুদ্দীন আইউবী উপরে উপরে প্রকাশ করবেন, তিনি খলীফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন এবং খলীফার সম্মানার্থে সঙ্গে সৈন্য নিয়ে এসেছেন। এমতাবস্থায় আমীরদের উদ্দেশ্য যদি ভাল হয়, তাহলে তারা সুলতানকে স্বাগত জানাবে। অন্যথায় তারা যে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, তা সময়মত দেখা যাবে। আমি পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারি, এখানকার ফৌজ তোমাদের মোকাবেলা করবে না, বরং সঙ্গ-ই দেবে। তবে এ কথাও মাথায় রাখতে হবে, তোমরা সময় যত নষ্ট করবে, এই ফৌজ তোমাদের থেকে ততই দূরে সরতে থাকবে। এখানকার ফৌজের যে জযবা-চেতনা এখনো বিদ্যমান আছে, তা নষ্ট করার প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আর এই জযবাই তো ইসলামী ফৌজের আসল শক্তি। তুমি তো জান আলী ভাই! যে শাসক ভোগ বিলাসিতায় নিমজ্জিত হয়, সে সর্বপ্রথম দুশমনের সঙ্গে সমঝোতা করে। তারপর দেশের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে এবং এমন সব সালারদেরকে আপন বানিয়ে নেয়, যারা আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে তার অনুগত হয়। এই কর্মধারা, এখানে শুরু হয়ে গেছে। আমাদের উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনা অফিসার ইতিমধ্যেই জাতীয় চেতনা ও ঈমানী জযবা হারিয়ে ফেলেছেন। তবে এখনো আমার মত এমন কিছু সালারও আছেন, যারা খৃস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেননি এবং নুরুদ্দীন জঙ্গীর জিহাদী চেতনাকে জীবিত রাখতে প্রস্তুত। কিন্তু খেলাফতের নির্দেশ ছাড়া নিজের থেকে তারা কিই-বা করতে পারবে?
তাহলে কি আমি সুলতান আইউবীকে নিশ্চিতভাবে একথা বলতে পারি যে, এখানকার সৈন্যরা আমাদের সঙ্গ দেবে? আলী বিন সুফিয়ান জিজ্ঞেস করেন।
অবশ্যই বলতে পারেন- তাওফীক জাওয়াদ জবাব দেন। তবে খলীফা ও আমীরদের দেহরক্ষীরা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তাদের সংখ্যাও কম নয় এবং তারা ফৌজের বাছা বাছা সৈনিক। সম্ভবত তাদেরকে গৃহযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এখানকার জনসাধারণের মধ্যে আমি যে জাতীয় চেতনা লক্ষ্য করেছি, তাতে আমি আশান্বিত যে, আমরা যদি এখানে আসি, তাহলে সফল হব। আলী বিন সুফিয়ান বললেন।
