তুমি কি তোমার ক্রুশ দেখাতে পারবে? প্রমাণ চায় মেয়েরা।
তুমি পারবে আমাকে তোমার ক্রুশ দেখাতে? আলী বিন সুফিয়ান পাল্টা প্রশ্ন করেন এবং সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন, আমি জানি, তোমরা একজনও ক্রুশ দেখাতে পারবে না। তোমাদের সঙ্গে ক্রুশ নেই। কারণ, তোমরা যে কাজে যাচ্ছ, সেখানে ক্রুশ সঙ্গে রাখা যায় না। আমি তোমাদের কাছে তোমাদের নামও জিজ্ঞেস করব না, নিজের নামও বলব না। আর আমার মিশন কি তাও বলব না। শুধু এতটুকুই বলব যে, আমরা একই পথের পথিক। আর আমাদের কারুরই জানা নেই যে, আমাদের মধ্য থেকে কে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারবে। যীশুখৃস্ট যেভাবে আমাকে ও আমার লোকদেরকে তোমাদের সাহায্যার্থে প্রেরণ করেছেন, তা প্রমাণ করে তোেমরা। সঠিক পথে আছ এবং তোমরা কামিয়াব হবে। নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুতেই স্পষ্ট প্রমাণিত হয়ে গেছে, সমগ্র পৃথিবীতে ক্রুশের রাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। মুসলমানদের কোন্ আমীর এমন আছে, যে আমাদের জালে আটকা পড়েনি? আমি তোমাদের উপদেশ দেব, তোমরা দৃঢ়পদ থাক।
আলী বিন সুফিয়ান মেয়েদের প্রতি তাকিয়ে বললেন, তোমাদের কাজ সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ। খোদাও ঈসা মসীহ তোমাদের কুরবানীকে বিফল করবেন না। আমরা যারা পুরুষ, তারা জীবন বিলিয়ে দুনিয়ার ঝক্কি ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে যাই। কিন্তু কেউ তোমাদের জীবন হরণ করে না- হরণ করে তোমাদের সম্ভ্রম। আর তোমাদের পক্ষে এটাই সবচেয়ে বড় কুরবানী।
আলী বিন সুফিয়ান ঝানু অতিশয় সুদক্ষ গোয়েন্দা। মুখের ভাষা তার জাদুমাখা। সবাই তন্ময় হয়ে শুনছে তার কথাগুলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি তাদের থেকে স্বীকৃতি আদায় করে নেন যে, তারা খৃস্টান এবং নাশকতামূলক কাজের উদ্দেশ্যে দামেস্কসহ অন্যান্য অঞ্চলে যাচ্ছে। তারা বণিকের বেশে।
আলী বিন সুফিয়ান খৃস্টানদের গুপ্তচরবৃত্তির নিয়ম-নীতি, গোপন সংকেত ও পরিভাষাসমূহ সম্পর্কে অবহিত। এ পর্যন্ত বহু খৃস্টান গুপ্তচরকে গ্রেফতার করে তিনি অপরাধের স্বীকৃতি আদায় করেছেন। এবার যখন তিনি তাদেরই পরিভাষায় কথা বলছেন, তখন মেয়েরা ও তাদের সঙ্গী পুরুষরা শুধু নিশ্চিতই হয়নি যে, তিনি খৃস্টান, বরং তাকে খৃস্টান গোয়েন্দা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলে বিশ্বাস করে নেয়। তিনি ওদেরকে অবহিত করলেন যে, আমার সঙ্গে একশ লোক আছে। তাদের মধ্যে যুদ্ধবাজ গোয়েন্দাও আছে। আছে ফেদায়ীও। আমরা দামেস্কসহ অন্যান্য এলাকায় মুসলমানদের সেসব উধ্বতন অফিসারদের খুন কিংবা গুম করতে যাচ্ছি, যারা সালাহুদ্দীন আইউবীর চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। তিনি তাদেরকে আরো জানালেন, আমি দীর্ঘদিন যাবত মিসরে কাজ করেছি, এবার আমাকে ওদিকেই পাঠানো হয়েছে।
খৃস্টান দলটি আলী বিন সুফিয়ানের সামনে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে একটি সমস্যার কথা ব্যক্ত করে। সমস্যাটা হল, তাদের কমান্ডার দস্যুদের হাতে নিহত হয়েছে। এরা যেসব এলাকায় যাচ্ছে, ঐসব এলাকায় সে আগে গিয়েছিল। কিন্তু তার মৃত্যুতে এরা এখন দিশেহারা। এদেরক পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন লোকের প্রয়োজন।
আলী বিন সুফিয়ান তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, অসুবিধা হবে না, প্রয়োজনে আমি নিজের কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়ে হলেও তোমাদের পথ-নির্দেশনা করব। তোমাদের মিশন কি আমাকে খুলে বল।
তারা আলী বিন সুফিয়ানকে তাদের মিশন খুলে বলে। তাদেরকে কয়েকজন মুসলিম সালারের নাম দিয়ে বলা হয়েছে, তাদের কাছে উপঢৌকন পৌঁছিয়ে দেবে এবং প্রয়োজন অনুপাতে মেয়েদের ব্যবহার করবে। তাদের এমন কতিপয় সালার ও আমীর পর্যন্ত পৌঁছতে হবে, যারা খৃস্টানদেরকে দুশমন মনে করে। তাদেরকে খৃস্টানদের বন্ধু বানাতে হবে।
দেখ, এই স্তরে এসে তোমাদের ও আমার কাজ এক হয়ে যাচ্ছে–আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আমাকেও ঐসব সালার ও নেতাদের খতম করতে হবে, যারা অন্তর থেকে খৃস্টানদের দুশমনী দূর করছে না।.. আচ্ছা, তোমরা দামেস্কে কোথায় থাকবে?
আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন যে, আমরা বণিকের বেশে যাচ্ছি- একজন জবাব দেয়- দামেস্কের নিকেট গিয়ে এই মেয়েরা পর্দানশীল মুসলিম নারীতে রূপান্তরিত হবে। আমরা সরাইখানায় অবস্থান নেব। ওখান থেকে বণিকের বেশ ধারণ করে সালার প্রমুখদের নিকট যাব।
***
পরদিন ভোরবেলা। আলী বিন সুফিয়ানের কাফেলা দামেস্ক অভিমুখে এগিয়ে চলছে। খৃস্টান দলটিও এই কাফেলার শামিল হয়ে গেছে। পশুর মধ্যে ডাকাতদের ঘোড়াগুলো এখন অতিরিক্ত। খৃস্টান নারী-পুরুষরা আলী বিন সুফিয়ানকে তাদের নেতা মেনে নিয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে তিনিও খৃস্টান। তিনি তাদেরকে বলে দিয়েছেন, তোমরা আমার লোকদের সঙ্গে কথা বলবে না। কারণ, তাদের মধ্যে মুসলমানও আছে, যারা ফেদায়ী ও হাশীশী বটে, কিন্তু তাদের উপর ভরসা রাখা যায় না। পথে আলী বিন সুফিয়ান খৃস্টানদেরকে নিজের সঙ্গে রাখেন এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলতে থাকেন। এই ফাঁকে তার অনেক কাজের কথা জানা হয়ে গেছে।
পরদিন কাফেলা দামেস্ক প্রবেশ করে। আলী বিন সুফিয়ানের নির্দেশ মোতাবেক কাফেলা সরাইখানায় অবস্থান নেয়ার পরিবর্তে একটি মাঠে তাঁবু স্থাপন করে। মাঠে মানুষের ভীড় জমে যায়। বাহির থেকে কোন বণিক কাফেলা আসলে এলাকার মানুষ এভাবেই ভীড় জমায়। তারা চেষ্টা করে, পণ্য বাজারে যাওয়ার আগেই সরাসরি কাফেলার কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে সংগ্রহ করতে।
