লোকগুলোকে গোয়েন্দার দৃষ্টিতে দেখছেন আলী বিন সুফিয়ান। তার মনে সন্দেহ জাগে, তারা খৃস্টান গুপ্তচর ও সন্ত্রাসী এবং কোন ইসলামী ভূখন্ডে অভিযানে যাচ্ছে। তা-ই যদি হয়, তাহলে আলীকে তাদেরই তো প্রয়োজন।
আরো নিকটে যাওয়ার জন্য তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যান। চলে যান টিলার একেবারে শেষপ্রান্তে। এখান থেকে চোখ পড়ে তার নীচে। আরো দুজন লোক দেখতে পান তিনি। তাদের মুখমণ্ডল ও মাথা কালো কাপড়ে ঢাকা। তারা টিলার আড়াল থেকে ঐ লোকগুলোর প্রতি বারবার তাকাচ্ছে। আলী বিন সুফিয়ান বুঝে ফেললেন, ওরা মরুদ্যু। ওদের দৃষ্টি মেয়েগুলোর প্রতি।
লোকগুলো আস্তে আস্তে পেছন দিকে সরে যায়। পরস্পর কথা বলে। আলী বিন সুফিয়ান তাদের কথা শুনতে পান, বুঝতেও পারেন। আলীর ভাষায়-ই কথা বলছে তারা।
ওদের কাছে কি অস্ত্র আছে? এক দস্যু জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ, আছে- অপরজন বলল- আমি দেখেছি। তাদের তরবারী সরু। তারা খৃস্টান।
তারা সাধারণ মুসাফির বলে মনে হয় না।
ঠিক আছে, ওরা ঘুমিয়ে পড় ক, আমি সবাইকে ডেকে নিয়ে আসি।
আমরা তো আটজন; ঘুমন্ত অবস্থায়ই আমরা ওদেরকে ধরে ফেলতে পারব।
ধরার প্রয়োজন কি। পুরুষদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে ফেলব আর মেয়েগুলোকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে যাব।
তারা সঙ্গীদের ডেকে আনতে চলে যায়। আলী বিন সুফিয়ান লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের অনুসরণ করেন। তারা অন্য একটি পথে বের হয়ে যায়। ওখানে তাদের ঘোড়া দণ্ডায়মান। তারা ঘোড়ায় আরোহন করে অন্ধকালে অদৃশ্য হয়ে যায়।
আলী বিন সুফিয়ান ভাবেন কী করা যায়। লোকগুলোকে সাবধান করে দেবেন, নাকি নিজ কাফেলায় নিয়ে যাবেন। গভীর ভাবনা-চিন্তার পর তিনি একটি পন্থা উদ্ভাবন করেন। নিজ কাফেলার লোকদের নিকট ফিরে আসেন। জনাবিশেক লোককে বর্শাসজ্জিত করে সঙ্গে করে নিয়ে যান। তাদেরকে উপযুক্ত স্থানে প্রস্তুত অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখেন এবং কর্তব্য বুঝিয়ে দেন। নিজেও সতর্ক অবস্থায় এদিক-ওদিক টহল দিতে থাকেন। দস্যুরা কখন আসবে তিনি জানেন না। তিনি দেখতে পান যে, মেয়েরা ও তাদের সঙ্গের পুরুষরা ঘুমিয়ে পড়েছে। মাত্র একজন লোক বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছে। তাতে বুঝা গেল, লোকগুলো প্রশিক্ষিত। প্রদীপগুলো জ্বলছে।
রাতের শেষ প্রহর ঘনিয়ে আসছে। পার্বত্য এলাকার অভ্যন্তরে ঘোড়ার পায়ের শব্দ কানে আসে। সবাই সতর্ক হয়ে যায়। মেয়েদের প্রহরীও বদল হয়। এবার পাহারা দিচ্ছে অন্যজন। দস্যুরা পার্বত্য এলাকার মাঝামাঝিতে এসে পড়েছে। আলী বিন সুফিয়ান ও তার লোকেরা টিলার উপরে। খানিক পর আট-নয়জন দস্যু সেই স্থানে ঢুকে পড়ে, যেখানে তাদের শিকার ঘুমিয়ে আছে। প্রহরী ভয় পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি ঘুমন্ত সঙ্গীদের জাগিয়ে তোলে। দস্যুরা তাদের চারপাশ ঘিরে ফেলে এবং ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে। মেয়েদের সঙ্গী পুরুষরা জেগে ওঠে। কিন্তু দস্যুরা তাদেরকে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ না দিয়েই চিৎকার করে বলে, সব মালপত্র ও মেয়েগুলোকে আমাদের হাতে তুলে দাও এবং নিজেদের প্রাণ বাঁচাও। দুজন দস্যু তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে একদিকে সরিয়ে দেয়। লোকগুলো নিরস্ত্র। তারপরও দুজন মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক। বীর বিক্রমে লড়ে যায় অনেকক্ষণ।
সংকেত দেন আলী বিন সুফিয়ান। বাজের ন্যায় ছুটে আসে তার লোকেরা। এরা কারা ডাকাত দল তা বুঝে ওঠার আগেই এক একটি বর্শা এক একজন দস্যুর দেহে গিয়ে বিদ্ধ হয়। তার আগে দস্যুদের হাতে মেয়েদের সঙ্গের দুজন লোক মারা পড়েছে। তবে এর জন্য আলী বিন সুফিয়ানের কোন দুঃখ নেই।
আলী বিন সুফিয়ান মেয়েদের কাছে চলে যান। মেয়েগুলো ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। তাদের সামনে এগারটি লাশ পড়ে আছে। দুটি তাদের দুসঙ্গী পুরুষের। নয়টি দস্যুদের। আলী বিন সুফিয়ান তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। আলীর প্রতি মেয়েরা অতিশয় কৃতজ্ঞ। তিনি তাদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
আলী বিন সুফিয়ান জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কারা? কোথা থেকে এসেছ? কোথায় যাচ্ছ? তাদের জবাব শুনে সুলতান আইউবীর প্রখর ধীশক্তিসম্পন্ন বিচক্ষণ গোয়েন্দা প্রধান আলী মুচকি হাসলেন এবং বললেন, তোমরাও যদি আমাকে এরূপ প্রশ্ন করতে, আমিও তোমাদেরকে এমন অসত্য জবাব-ই দিতাম। আমি তোমাদের প্রশংসা করছি যে, এমনি এক ভীতিপ্রদ অবস্থায়ও তোমরা নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছ।
আপনি কোথা থেকে এসেছেন?- আলী বিন সুফিয়ানকে পাল্টা প্রশ্ন করে একজন- আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
তোমরা যেখান থেকে এসেছ- আলী বিন সুফিয়ান জবাব দেন- আর যাবও সেখানে, যেখানে তোমরা যাচ্ছ। আমাদের কাজ ভিন্ন; কিন্তু গন্তব্য এক।
তারা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ী করে। সবিস্ময়ে তাকায় আলীর প্রতি। আলীর মুখে মুচকি হাসির রেখা। তিনি বললেন, দেখেছ তো কেমন চাল খেলে দস্যুদের হত্যা করে ফেললাম। কোন সাধারণ পথিক-মুসাফির কি এমন চাল খেলতে পারে? আমি যে দক্ষতা প্রদর্শন করলাম, তাকি একজন সুশিক্ষিত সেনা কমান্ডারের ওস্তাদীকর্ম নয়?
তুমি মুসলমান সৈনিকও হতে পার। এক মেয়ে বলল।
আমি ক্রুশের সৈনিক। আলী বিন সুফিয়ান জবাব দেন।
