সুলতান আইউবী তখনই জবাব দিয়ে দূতকে বিদায় করে দেন। তিনি জঙ্গীর স্ত্রীকে এই নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, আমি অতিশয় কঠোর পদক্ষেপ হাতে নিচ্ছি। কিন্তু পা ফেলব বুঝে-শুনে।
দূত রওনা হওয়ার পরপর সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে দামেস্ক, মওসেল, হাব, ইয়েমেন ও অন্যসব ইসলামী অঞ্চলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ প্রদান করেন। আলী বিন সুফিয়ানের এ সফর কোন সরকারী সফর ছিল না। তিনি গুপ্তচরের বেশে এলাকাগুলোতে চলে যান। তার দায়িত্ব হল, যেসব মুসুলিম আমীর একনায়কত্ব ঘোষণা করেছে, তারা কী চায়, খৃস্টানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আছে কি-না, খলীফার বাহিনীর মতিগতি কেমন, এই বাহিনীকে খলীফার এমন সব নির্দেশের বিরুদ্ধাচারণের জন্য প্রস্তুত করা যায় কি-না, যা ইসলামের জন্য ক্ষতিকর, দুশমনের জন্য লাভজনক। আলী বিন সুফিয়ানের এ-ও জানার বিষয় ছিল যে, ও-সব এলাকার জনগণের মতিগতি ও চিন্তাধারা কী এবং ফেদায়ীরাও খলীফার সঙ্গে মিশে গেছে কি-না। তাকে এ ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করতে হবে যে,সুলতান আইউবী দামেস্ক কিংবা অন্য কোন মুসলিম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করলে জনগণের প্রতিক্রিয়া কী হবে।
সুলতান আইউবী অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েন না। কোথাও যেতে হলে বা অভিযান পরিচালনা করতে হলে আগে গোয়েন্দা মারফত সেখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি, সুবিধা ও সমস্যা সম্পর্কে আগে তথ্য-পরিসংখ্যান জেনে নেন। এখানেই ছিল তার সাফল্য। সুলতান জঙ্গীর মৃত্যুর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন নিশ্চিত হওয়ার জন্য একই ধারায় তিনি আলী বিন সুফিয়ানকে প্রেরণ করেন। আলী বিন সুফিয়ান রিপোর্ট নিয়ে আসবেন, তারপর তিনি সে মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এখন অপেক্ষা শুধু আলী বিন সুফিয়ান কবে ফিরবেন।
***
সুলতান আইউবীর নির্দেশ প্রাপ্তির পর আলী বিন সুফিয়ান এক মুহূর্ত নষ্ট করে একশ যুদ্ধবাজ গোয়েন্দা বাছাই করে ফেলেন। তিনি তাদেরকে মিশন সম্পর্কে অবহিত করেন এবং বলেন, ইসলামের আব্রু-ইজ্জত তোমাদের থেকে বিরাট কুরবানী তলব করছে। এই মিশনে তোমাদেরকে পূর্ণ যোগ্যতা ও দক্ষতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে।
এই একশ গোয়েন্দাকে বণিকের পোশাক পরানো হয়। আলী বিন সুফিয়ান কাফেলার সরদার সাজেন। তারা কতগুলো উটের পিঠে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বোঝাই করে। দামেস্ক ইত্যাদির বাজারে নিয়ে এগুলো বিক্রি করা হবে এবং তৎপরিবর্তে অন্য মাল ক্রয় করা হবে। বেশকিছু উট ছাড়াও তাদের সঙ্গে আছে কয়েকটি ঘোড়া। বাণিজ্যিক পণ্যের অভ্যন্তরে তারা তরবারী, বর্শা ইত্যাদি অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে। তন্মধ্যে আছে দাহ্যপদার্থ ও আগুন জ্বালানোর অন্যান্য বস্তু। আলী বিন সুফিয়ানের নেতৃত্বে কাফেলা রাতের বেলা কায়রো থেকে রওনা হয় এবং রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত বহুদূর এগিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার পর কাফেলা আবার রওনা হয়। আলী বিন সুফিয়ান যথাশীঘ্রই গন্তব্যে পৌঁছুতে চাচ্ছেন।
কাফেলা দিনভর চলতে থাকে। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরও কাফেলা কোথাও থামেনি। রাত গম্ভীর হতে চলেছে। এবার একটি উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেল। এলাকাটা সবুজ-শ্যামল। বিস্তৃত এলাকা জুড়ে উঁচু-নীচু টিলা আছে এখানে। আছে পানিও। বিশ্রাম ও পানির জন্য কাফেলা থেমে যায়।
লোকগুলো আসলে বণিক নয়- সৈনিক। তাদের চাল-চলনে শৃঙ্খলা আছে। আছে সতকর্তা। তাদের উট-ঘোড়াগুলো এমনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যে, মানুষগুলোর ন্যায় ওরাও সুশৃঙ্খল। কারো মুখে টু-শব্দ নেই। না মানুষের মুখে, না পশুগুলোর মুখে। আলী বিন সুফিয়ান টিলা ও পর্বতের অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়ে বাইরেই ছাউনী ফেলেন। দুব্যক্তিকে পানির সন্ধানে প্রেরণ করা হয়। এখন সবারই হাতে অস্ত্র। কারণ, এই সফরে দুটি ভয় রয়েছে। এক. মরুদস্যুর ভয়, দুই. খৃস্টান কমান্ডোদের ভয়।
পার্বত্য এলাকার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে লোক দুজন। পানির সন্ধান ছাড়াও তাদের দেখতে হবে, এখানে দুশমনের কোন কমান্ডো কিংবা কোন টহল বাহিনী অবস্থান নিয়ে আছে কিনা। তারা কিছুদূর চলে যায়। একস্থানে আলোর মত কিছু একটা দেখতে পায়। চলে যায় আরো সম্মুখে একটি টিলার উপরে উঠে যায়। এখানে মাঠের ন্যায় মনোরম একটি জায়গা। পানি আছে। সবুজ-শ্যামল এলাকা। আছে খেজুর বাগানও। দুটি প্রদীপ জ্বলছে এখানে। সেই প্রদীপের আলোতে দশ-এগারজন মানুষ চোখে পড়ে তাদের। ছয় সাতজন পুরুষ। অন্যরা নারী। মেয়েগুলো অতিশয় সুন্দরী। তারা আগুন জ্বালিয়ে গোশত ভুনা করছে আর পেয়ালায় করে কি যেন পান করছে। বোধ হয় মদ। খানিকটা আড়ালে একটি ঘোড়া ও কয়েকটি উট বাঁধা। অনেকগুলো সামানও একদিকে পড়ে আছে।
আলী বিন সুফিয়ানের লোক দুজন লুকিয়ে লুকিয়ে নিকটে চলে যায়। রাতের নীরবতায় তাদের কথাবার্তা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তাদের হাসি-কৌতুক প্রমাণ করছে, তারা মুসলমান নয়। মেয়েগুলো অশ্লীল আচরণ করছে।
লোক দুজন ফিরে এসে আলীকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করে। এবার আলী বিন সুফিয়ান নিজে যান। লুকিয়ে লুকিয়ে কাছে থেকে দেখেন। আলী লোকগুলোর ভাষা বুঝতে পারছেন না। ওরা খৃস্টান। আলী বিন সুফিয়ান ভাবছেন, তিনি তাদের নিকটে চলে যাবেন এবং জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন, তারা কারা, কোথায় যাচ্ছে। আবার ভাবছেন, গিয়ে কাজ নেই, এখান থেকেই তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করি। তার সঙ্গে একশ যুদ্ধবাজ গোয়েন্দা আছে। এই ছয়-সাতজন পুরুষ আর চারটি মেয়েকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।
