এই তামাশা আমাদের দেখাতেই হবে মহামান্য সুলতান!- এক সালার বলল- মুখের ভাষা যদি আমাদের ভাইদের উপর ক্রিয়া না করে, তাহলে তরবারী ব্যবহার করতেই হবে। আমাদের কারো মধ্যে খেলাফতের গদির মোহ নেই। আমরা যা কিছু করব, ইসলামের খাতিরেই করব- ব্যক্তি স্বার্থে নয়।
***
সুলতান আইউবী ইতিপূর্বে দামেস্ক, হাব, মওসেল এবং আরো দুতিনটি রিয়াসতের আমীরদের নিকট দুজন দূত প্রেরণ করেছিলেন। সকলের নিকট তিনি দীর্ঘ পয়গাম প্রেরণ করেছেন। তাতে তাদের প্রত্যেককে খৃস্টীয় ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে ইসলামী ঐক্যের পক্ষে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দূতদ্বয় ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। একজন আমীরও সুলতানের পয়গাম গ্রহণ করেননি, বরং অনেকে বিদ্রুপের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
দূতগণ সুলতান আইউবীকে জানায়, আমরা প্রথমে খলীফার দরবারে গমন করি। পয়গাম পেশ করলে তা খলীফা নিজে পাঠ না করে তাকে ঘিরে রাখা আমীরদের পড়তে দেন। এই আমীরগণই তাকে খেলাফতের গদিতে বসিয়েছে। তারা আপনার পয়গাম পাঠ করে পরস্পর ফিসফিস করতে থাকে। একজন খলীফাকে বললেন, সালাহুদ্দীন আইউবী খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বাহানা দেখিয়ে সকল মুসলিম রিয়াসতকে এক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাচ্ছেন। তারপর তিনি নিজেই হবেন সেই রাজ্যের অধিপতি। আরেকজন মুখ খুললেন। তিনিও এগার বছর বয়সী খলীফাকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে উস্কে দিলেন এবং বললেন, আপনি তাকে নির্দেশ দিতে পারেন যে, যুদ্ধ করা না করার সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক একমাত্র খলীফা। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি খলীফার আদেশ অমান্য করেন, তাহলে আপনি তাকে বরখাস্ত করতে পারেন; মিসরের নেতৃত্ব অন্য কাউকে দিতে পারেন।
বালক খলীফা আমাদেরকে এই নির্দেশই প্রদান করেন এবং বললেন, সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলবে, সে যেন আমার নির্দেশের অপেক্ষা করে। ইসলামী ঐক্যের প্রয়োজন আছে কিনা, আমিই তার সিদ্ধান্ত জানাব।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট যে ফৌজ আছে, তন্মধ্যে মরহুম জঙ্গীর প্রেরিত অনেক বাহিনীও আছে– এক আমীর খলীফাকে বললেন আপনি তাকে নির্দেশ প্রেরণ করুন, যেন তাদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। নিজের মর্জিমত ফৌজ ব্যবহার করার সুযোগ তার থাকা উচিত নয়।
তাকে আরো বলবে, খেলাফতের পক্ষ থেকে যে বাহিনী প্রেরণ করা হয়েছিল, তাদেরকে যেন ফেরত পাঠায়- দূতদের উদ্দেশে খলীফা বললেন আর তোমরা এবার যেতে পার।
আইউবীকে আরো বলবে, ভবিষ্যতে যেন তিনি খলীফাকে এরূপ পয়গাম পাঠানোর দুঃসাহস না দেখান। অন্য এক আমীর বললেন।
দূতরা সুলতান আইউবীকে জানায়, আমরা অন্যান্য আমীরদের নিকটও গমন করি। সবাই অবজ্ঞার সাথে আপনার পয়গাম প্রত্যাখ্যান করে। কেউ কেউ আপনার বিরুদ্ধে অবমাননাকর উক্তিও করে।
রিপোর্টে সুলতান আইউবীর চেহারায় কোন পরিবর্তন আসল না, যেন তিনি এরূপই হওয়ার আশা করছিলেন। তিনি মূলত আলী বিন সুফিয়ানের অপেক্ষা করছিলেন। গোয়েন্দা প্রধান আলী একশত যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে দামেস্ক চলে গেছেন। গিয়েছেন বণিক ও বণিক কাফেলার বেশে। সুলতান এখনো তার কোন সংবাদ পাননি। নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পরপর-ই সুলতান আইউবী সংবাদ পেয়ে যান যে, বিভিন্ন রিয়াতের আমীরগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছেন। সংবাদটা পেয়েছেন স্বয়ং নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রীর মাধ্যমে, যিনি বর্তমান খলীফার মা। তিনি অতি সঙ্গপনে একজন দূত কায়রো পাঠিয়ে দেন এবং সুলতান আইউবীকে জঙ্গীর মৃত্যুর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি সুলতান আইউবীকে বলে পাঠান
ইসলামের ইজ্জত এখন আপনার হাতে। আমার অপ্রাপ্ত বয়স্ক পুত্রকে খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছে। মানুষ আমাকে সম্মান করতে শুরু করেছে। কেননা, আমি খলীফার মা। তারা মনে করছে, আমি সৌভাগ্যশীল মা। কিন্তু আমার হৃদয় থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে আমার পুত্রকে খলীফা বানানো হয়নি তাকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। মওসেলের আমীর সাইফুদ্দীন ও অন্যসব আমীর আমার পুত্রের চারপাশ ঘিরে রেখেছে। আমার স্বামীর ভ্রাতুস্পুত্ররাও স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। তারপরও এই আমীরদের মধ্যে যদি ঐক্য থাকত, তাহলে আমি এতটুকু বিচলিত হতাম না। প্রকৃতপক্ষে তারা একে অপরের দুশমন। আপনি যদি বলেন, তাহলে আমি নিজ হাতে পুত্রকে হত্যা করে ফেলব। কিন্তু তার পরিণতিকে আমি ভয় করি। ভাল হবে, আপনি এসে পড় ন। কিভাবে আসবেন, এসে কী করবেন, তা আপনিই ভাল জানেন। আমি আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, আপনি যদি এদিকে দৃষ্টি না দেন কিংবা যদি বিলম্ব করে ফেলেন, তাহলে প্রথম কেবলা তো খৃস্টানদের কজায় আছেই, পবিত্র কাবাও তাদের হাতে চলে যাবে। সেই লাখো শহীদের খুন কি বৃথা যাবে, যারা জঙ্গী ও আপনার নেতৃত্বে জীবন কুরবান করেছে? আপনি হয়ত আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমার পুত্রকে আমি কেন নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখলাম না? তার জবাব আমি দিয়েছি। আমীরগণ আমার পুত্রকে ছিনিয়ে নিয়েছে। পিতার মৃত্যুর পর একবার মাত্র সে আমার কাছে এসেছে। এখন তাকে আমার পুত্র মনে হয় না। বোধ হয় তাকে হাশীশ খাওয়ানো হয়েছে। সে ভুলে গেছে, আমি তার মা। ভাই সালাহুদ্দীন! আপনি জলদি এসে পড় ন; দামেস্কের জনগণ আপনাকে স্বাগত জানাবে। আমার এই দূতের নিকটই জবাব দিন, আপনি কী করবেন কিংবা কিছুই করবেন কিনা!
