তার এই পরিবর্তিত চরিত্র দেখে কারো বিশ্বাস করার উপায় ছিল না যে, একসময় তিনি বিলাসী ছিলেন। প্রবৃত্তিকে দমন করে রাখারই নাম চরিত্রের উঁচুতা ও আদর্শের পরিপক্কতা। এই পরিপক্কতা সালাহুদ্দীন আইউবীর মধ্যে ছিল। বন্ধুদের আসরে তিনি বলতেন, আমাকে কাফেররা মুসলমান বানিয়েছে। আমরা যদি আমাদের বিপথগামী যুবকদেরকে খৃস্টানদের মন-মানসিকতা বুঝাতে পারি, তাহলে তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। দুশমনের সঙ্গে যে বন্ধুত্বের দীক্ষা তাদেরকে দেয়া হচ্ছে, তা তাদেরকে জাতীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করছে। আমি আপনাদেরকে রাসূল (সাঃ)-এর একটি হাদীস স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। নবীজী (সাঃ) বলেছেন, তোমরা নিজেদেরকে চিনে নাও যে, তোমরা কী এবং কারা। আর দুশমনকেও ভাল করে চিনে নাও যে, তারা কারা এবং তাদের লক্ষ্য কী। সালাহুদ্দীন আইউবীর চরিত্র ও আদর্শের মোড় দুশমনই পরিবর্তন করে দিয়েছিল। তিনি নিজ কাজে এতই নিমগ্ন থাকতেন যে, কখনো ভাববারই সময় পাননি, তিনি ইসলামী দুনিয়ার বড় মাপের একজন নেতা, মিসরের প্রতাপান্বিত শাসক এবং এমন একজন বীরযোদ্ধা যে, খৃস্টানদের বড় বড় কমান্ডাররা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরও তার ভয়ে তটস্থ থাকছে। তার আর্থিক অবস্থা এমন ছিল যে, তিনি অর্থাভাবে জীবনে কখনো হজ্ব করতে পারেননি। জীবনের শেষ মুহূর্তে তার একটিই বাসনা ছিল- হজ্ব করা। কিন্তু তার কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল মাত্র পঁয়তাল্লিশ দেরহাম রূপা ও একখণ্ড সোনা। সম্পদ বলতে ছিল একটি ঘর, তা-ও পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত।
তার চারিত্রিক পরিপক্কতার বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ ছিল যে, তিনি যখন তাঁর সালার প্রমুখকে বৈঠকের তলব করলেন, তখন তার চেহারায় ভীতি বা পেরেশানীর লেশমাত্র ছিল না। উপস্থিত পারিষদবর্গ নীরব-নিস্তব্ধ। তাদের ধারণা ছিল, এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে তিনি ঘাবড়ে গিয়ে থাকবেন। কিন্তু না, তিনি মুচকি হেসে সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন এবং বললেন, আমার বন্ধুগণ! তোমরা অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময় পরিস্থিতিতেও আমার সঙ্গ দিয়েছ। আজ এমন এক পরিস্থিতি আমাকে বিচলিত করে তুলেছে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবার মত নয়। কিন্তু স্মরণ রেখ, তারপরও যদি আমরা পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তা হবে আমাদের জন্য দুনিয়াতেও অপমান, আল্লাহর দরবারেও অপমান। ইতিহাস আমাদের উপর অভিশম্পাত করবে এবং কিয়ামতের দিন সেই শহীদগণ আমাদেরকে লজ্জা দেবে, যারা ইসলামের মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন কুরবান করেছে। এখন আমাদের প্রত্যেককে জীবন কুরবান করার সময় এসেছে।
এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর সুলতান আইউবী তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ দেন এবং বললেন, আমাদেরকে এখন আমাদের ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
এই বলে তিনি সকলের চেহারা নিরিক্ষণ করেন। কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। সকলের চেহারার রং বিবর্ণ হয়ে গেছে। সুলতান নিশ্চিত বুঝে নেন যে, হ্যাঁ, আমার এই কর্মকর্তাগণ যে কোন পরিস্থিতিতে আমার সঙ্গ দেবে। তিনি বললেন, আমার প্রথম পদক্ষেপ হল, আমি আমার স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে যাচ্ছি। আমি আর কেন্দ্রীয় খেলাফতের অনুগত থাকতে চাই না। কিন্তু এই ঘোষণা আমি তোমাদের প্রত্যেকের সম্মতি ছাড়া করব না। এ ব্যাপারে মতামত দেয়ার আগে তোমরা আরো দুটি বিষয় নিয়ে ভেবে দেখ। প্রথমত, খেলাফত কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তোমরাই বলেছ যে, খলীফা এখন এগার বছরের বালক, তিন-চারজন আমীর তাকে ঘিরে রেখেছে। আর এই আমীরগণ খৃস্টানদের বন্ধু। কাজেই বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, খেলাফত এখন খৃস্টানদের মুঠোয়। তাই এবার আমাদের সংঘাত হবে খেলাফতের বিরুদ্ধে। এমতাবস্থায় তোমরা যদি স্বাধীন না হও, তাহলে তোমাদের খলীফাকে মান্য করতে হবে আর এই মান্যতা হবে সালতানাতে ইসলামিয়ার জন্য ধ্বংসাত্মক। তোমরাই বল, এমন পরিস্থিতিতে আমাদের এই পদক্ষেপ কি সঠিক হবে না যে, আমি মিসরের খেলাফতকে কেন্দ্রীয় খেলাফত থেকে স্বাধীন করে ফেলব এবং তারপর আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হবে স্বাধীন, যা এখন ইসলামের জন্য অত্যাবশ্যক?
তাহলে কি আপনি খেলাফতের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে চান? এক সালার জিজ্ঞেস করেন।
এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি- সুলতান আইউবী জবাব দেন- কাল-পরশু পর্যন্ত আমার দূত ফিরে আসবে। পরিস্থিতি যদি আমাকে খেলাফতের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য করে, তাহলে আমি কুণ্ঠিত হব না।
আপনি মিসরকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে দিন- এক কর্মকর্তা বলল আমরা এগার বছরের বালককে খলীফা মানতে পারি না।
তো তোমরা কি সকলে আমাকে মিসরের সুলতান হিসেবে মেনে নেবে? সালাহুদ্দীন আইউবী জিজ্ঞেস করেন।
সর্বান্তকরণে উপস্থিত সকলে একবাক্যে বলে উঠলেন, হ্যাঁ, আমরা আপনাকে মিসরের সুলতান হিসেবে মেনে নেব। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তখনই মিসরের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর থেকেই সালাহুদ্দীন আইউবী সুলতান অভিধায় ভূষিত হন।
আমি রাসূলের উম্মতের নয়- রনাঙ্গনের বাদশাহ- সুলতান আইউবী বললেন- তোমরা তো দেখেছ, আমি খৃস্টান সৈন্যদের অভ্যন্তরে ঘোরাফেরা করে থাকি। আমি দশ দশজন জানবাজ দিয়ে দশ দশ হাজার দুশমন সৈন্যকে পরাভূত করেছি। কিন্তু যখন আমি আপন ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা ভাবি, তখন আমার সব রণকৌশল মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়, আমার তরবারী তখন কোষ থেকে বেরুতে চায় না। দুর্ভাগ্য, আমাকে ও তোমাদেরকে সেই দিনটিও প্রত্যক্ষ করতে হল যে আমরা পরস্পর লড়াই করব আর খৃস্টানরা বসে বসে তামাশা দেখবে!
