আর আমি জানি তারপর কী হবে- সুলতান আইউবী বললেন আমাদের সৈন্যদেরকে অপকর্মে অভ্যস্ত করা হবে।
অভ্যস্ত করা হচ্ছেও- মোস্তফা জুদাত বললেন- আর হাশীশীরাও তাদের তৎপরতা পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে। এখন হবে কি জানেন? আমাদের যে সালার বা নায়েব সালার মন থেকে খৃস্টানদের দুশমনী ঝেড়ে না ফেলবে এবং জিহাদের পক্ষে কাজ করবে, তাদেরকে হাশীশীদের পেশাদার ঘাতকদের দিয়ে রহস্যময় উপায়ে হত্যা করা হবে।
কোন আমীর কী করছেন, মোস্তফা জুদাত সুলতান আইউবীকে তার বিস্তারিত বিবরণও প্রদান করেন। তার সারাংশ হল, নিজ নিজ অঞ্চলে স্বাধীনতা ঘোষণাকারী আমীরগণ একে অপরকে দুশমন ভাবতে শুরু করেছেন। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খৃস্টানরা মুসলিম আমীরদের এই কপটতা ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে ইন্ধন যোগাচ্ছে।
আপনি আমাকে ওখানকার পরিস্থিতি জানাতে এসে ভালই করেছেন সুলতান আইউবী বললেন- আপনি না আসলে আমি এতকিছু জানতাম না। তবে আমার এতটুকু অনুমান করা কঠিন ছিল না যে, এগার বছরের বালককে খলীফা নিযুক্ত করে মানুষ কী করতে চায়।
আর আপনি কী করতে চান?- মোস্তফা জুদাত জিজ্ঞেস করেন- আপনি যদি অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তাহলে মনে করুন সালতানাতে ইসলামিয়ার সূর্য ডুবে গেছে। আর আপনার পদক্ষেপ হওয়া উচিত শুধুই যুদ্ধ।
আহ! সেই দিনটিও আমাকে প্রত্যক্ষ করতে হল যে, আজ আমাকে আমার ভাইদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার কথা ভাবতে হচ্ছে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুলতান আইউবী বললেন- আমি আশংকা করছি, আমার মৃত্যুর পর গাদ্দাররা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করবে যে, সালাহুদ্দীন আইউবী গৃহযুদ্ধের অপরাধে অপরাধী ছিল।
কিন্তু আপনি যদি এই ভয়ে কায়রো বসে থাকেন, তাহলে ইতিহাস আপনার পথে এই লজ্জাজনক অভিযোগ আরোপ করবে যে, নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুবরণ করার পর সালাহুদ্দীন আইউবীরও দম বেরিয়ে গিয়েছিল। তিনি মিসরের কজা অটুট রাখার জন্য সালতানাতে ইসলামিয়াকে কুরবান করে দিয়েছিলেন।
তা ঠিক- সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন- এই অভিযোগ বেশী অপমানজনক। আমি সবদিকেই চিন্তা করেছি মোস্তফা! শোন, আমি যদি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য বের হই, তাহলে আমি দেখব না আমার ঘোড়ার পদতলে কে পিষ্ট হচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে সেই কালেমাগো মানুষগুলো কাফেরদের চেয়েও বেশী ঘৃণ্য, যারা কাফেরের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতে…।
আপনি ফিরে যান। আমি আলী বিন সুফিয়ানকে ওখানে পাঠিয়ে দিয়েছি। তিনি গেছেন গোয়েন্দাবেশে। ওখানকার কেউ টের পাবে না যে, আলী বিন সুফিয়ান তাদের মাঝে ঘোরাফেরা করছে এবং পরিসংখ্যান নিচ্ছে যে, এখানে কোন্ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার। আপনি গিয়ে দেখুন, কোন্ কোন সালার সন্দেহভাজন। আলী বিন সুফিয়ানের সঙ্গে আরো অনেক লোক গেছে। ওখানে তাদের করণীয় কী, তা তারাই ভাল জানে। পাশাপাশি আমি আমীরদের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আহ্বান সম্বলিত বার্তা দিয়ে দূতও প্রেরণ করেছি। তারা আমার পয়গাম বুঝবার চেষ্টা করবে, সেই আশা আমি করি না। আমি শুধু তাদেরকে সোজা পথটা শেষবারের মত দেখিয়ে দিতে চাই। আমি তাদেরকে একথা বলব না, তারা যদি আমার নির্দেশমত কাজ না করে, তাহলে আমি কী করব।
মোস্তফা জুদাত বিদায় নিয়ে যান। সুলতান আইউবী দারোয়ান ডাকেন। দারোয়ান আসলে তিনি কয়েকজন সালার ও প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বললেন, এদেরকে জলদি আমার কাছে আসতে বল।
এরা সকলেই সুলতান আইউবীর হাইকমান্ডের সদস্য।
***
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন
আল্লাহ সালাহুদ্দীন আইউবীকে কঠিন হৃদয় দান করেছেন। তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রকে এত শক্ত করে তৈরি করেছিলেন যে, পাহাড় সমান বেদনাও তিনি হাসিমুখে সহ্য করে নিতেন। তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রত্যয়ী ও স্বতন্ত্র মেজাজের অধিকারী। আমীর-গোলাম সকলকে তিনি সমান মর্যাদা প্রদান করতেন। একজনের উপর আরেকজনকে প্রাধান্য দিতেন বীরত্ব ও বাহাদুরীর ভিত্তিতে। যারা তাঁর কাছে ঘেঁষত, তারা তার থেকে দুরকম প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করত। প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ভালবাসা। তার সৈনিকরা যুদ্ধের ময়দানে তাঁকে দেখলে এতই উজ্জীবিত হয়ে উঠত যে, তারা শত্রুর উপর বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ত। একবার তাঁর এক খাদেম অপর খাদেমের গায়ে জুতা নিক্ষেপ করে। তিনি তখন কক্ষ থেকে বের হচ্ছিলেন। ঘটনাক্রমে জুতাটি এসে তার গায়ে পড়ে। খাদেমরা ভয়ে থর থর করে কাঁপতে শুরু করে। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান, যেন কিছুই হয়নি। এ ছিল তার চরিত্র মাধুরী। বন্ধু তো ভাল, শত্রুও তার সম্মুখে উপস্থিত হলে তার ভক্ত-অনুরক্তে পরিণত হয়ে যেত।
নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যু সালতানাতে ইসলামিয়াকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যায় ফেলে দিয়েছিল। সেই সমস্যার সর্বাপেক্ষা গুরুতর দিক ছিল, মুসলমানদের নিজেদেরই আমীর-উজীরগণ খৃস্টানদের বন্ধু ও ইসলামের দুশমনে পরিণত হয়েছিল।
মিসরের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সালাহুদ্দীন আইউবী এখনো মিসর থেকে বের হতে পারছেন না। এমনি পরিস্থিতিতে তার সাধ্য এতটুকুই ছিল যে, তিনি সালতানাতে ইসলামিয়ার প্রতিরক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে শুধু মিসরের প্রতিরক্ষাকে অটুট রাখবেন। তার চেয়ে বেশী কিছু করার সাধ্য তাঁর ছিল না। কিন্তু আমার এই বন্ধুটি বিন্দু পরিমাণ ঘাবড়ালেন না। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, আমি যদি ইসলামের সংরক্ষণের দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নেই, তাহলে কিয়ামতের দিন আমাকে খৃস্টানদের সঙ্গে হাশর করা হবে। তিনি ইসলামের সংরক্ষণ ও প্রচার-প্রসারকে তাঁর জীবনে সবচে বড় কাজ মনে করতেন। তিনি কখনো নিজেকে শাসক ভাবেননি। সালাহুদ্দীন আইউবীর যৌবনকালের কথা আমার স্মরণ আছে। যৌবনে তিনি পূর্ণরূপে ভোগ-বিলাসিতায় ডুবে গিয়েছিলেন। তিনি মদপান করতেন, নাচ-গানের আসর বসাতেন। বাদ্য-বাজনা ও নাচের খুঁটিনাটি বুঝতেন। আরো দশজন বিপথগামী যুবক যা করে থাকে, তিনি তার কোনটিই বাদ দিতেন না। কেউ কখনো কল্পনাও করেনি যে, এই যুবক অল্প কবছরেই ইসলামের সবচেয়ে বড় পতাকাবাহী ও ইসলামের দুশমনের যমদূতে পরিণত হবেন। চাচার সঙ্গে প্রথমবারের মত খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে এসেই তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি সর্বপ্রথম বিলাসিতা পরিত্যাগ করলেন এবং নিজের জীবনকে ইসলামের জন্য কুরবান করে দিলেন। তিনি দেশের জনগণ ও সৈন্যদেরকে শিক্ষা দেন যে, ইসলামের কোন সীমানা-সরহদ নেই…।
