তাদের প্রথম পরিচয় তারা জমিদার জায়গীরদার, নবাব, আমীর ও হাকেম। ধর্মের প্রশ্ন দেখা দিলে পরে মুসলমান। মুসলমান পরিচয়টা ছিল তাদের তৃতীয় এবং গৌন। তাদের ধর্ম পরিচয় যদিও ছিল, ছিল তা ক্ষমতা আর জায়গীরদারীর জন্য। এটাই তাদের ঈমান। তারা ইসলামী ঐক্যের কথা ভাবত না। তারা যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিল। কেননা, তাদের আশংকা ছিল, খৃস্টানরা তাদের জায়গীরদারী কেড়ে নেবে। তাদের মনে এই ভয়ও ছিল যে, তাদের প্রজারা যদি দুশমনের পরিচয় পেয়ে যায়, তাহলে তাদের মধ্যে জাতীয় চেতনা ও ঈমানী শক্তি জেগে উঠবে। তারা তাদের নবাবীর জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে। বস্তুত প্রজারা তাদের জন্য স্বতন্ত্র এক হুমকিই ছিল। তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ছিল বিদ্যমান। জঙ্গীর বাহিনী তাদেরই ভাই-বন্ধু ছিল। জঙ্গীর মুজাহিদরা নিজেদের অপেক্ষা দশগুণ বেশী সৈন্যের মোকাবেলা করেছে। এ ছিল চেতনার ফল। এই চেতনা দুচোখে সহ্য করতে পারত না আমীরগণ। তাই নুরুদ্দীন জঙ্গী ছিলেন তাদের অপ্রিয়। আর সালাহুদ্দীন আইউবীকেও তারা দুশমন ভাবত। এখন জঙ্গী মারা গেছেন। তারা আনন্দিত। তারা মনে করত, এই জগত দ্বিতীয় আর কোন জঙ্গীর জন্ম দেবে না। জঙ্গীর সঙ্গে জিহাদও দাফন হয়ে যাবে।
জঙ্গীকে দাফন করা হয়েছে। খৃস্টানদের মনে মুসলমানদের যে ভীতি ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। এখন আর একটি কাটা অবশিষ্ট আছে, সে হল সুলতান। আইউবী। কিন্তু এ কাটা নিয়ে তাদের তেমন কোন ভাবনা নেই। সুলতান আইউবী এখন নিঃসঙ্গ। তাকে সাহায্যদাতা জঙ্গী মারা গেছেন। খৃস্টানদের বড় আনন্দ এই জন্য যে, জঙ্গীর মৃত্যুর পর তাদের অনুগত আমীর-উজীরগণ জঙ্গীর অপ্রাপ্ত বয়স্ক পুত্র আল মালিকুস সালিহকে সিংহাসনে বসিয়েছে। বয়স তার এগার বছর। খেলাফতের মূল সিংহাসন এখন খৃস্টানদের হাতে।
খৃস্টানদের অনুগত আমীরদের মধ্যে একজন হলেন গোমস্তগীন। একজন মওসেলের গবর্নর সাইফুদ্দীন। একজন দামেস্কের শাসক শামসুদ্দীন ইবনে আবদুল মালেক। আল জাজীরা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার রাজত্ব নুরুদ্দীন জঙ্গীর ভাতিজার হাতে। তাছাড়া আরো কয়েকজন জায়গীরদার আছেন। তারা সকলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তারা সকলেই আনন্দিত। কিন্তু এই বুঝ তাদের নেই যে, বালি-কণার ন্যায় বিক্ষিপ্ত হয়ে এখন তারা খৃস্টানদের সহজ শিকারে পরিণত।
জঙ্গীর মৃত্যুতে ইসলামী দুনিয়ার যে ক্ষতি হয়েছে, জঙ্গীর স্ত্রী তা অনুধাবন করতে পেরেছেন। উপলব্ধি করেছেন সুলতান আইউবীও। আর বুঝেছে তারা, যাদের অন্তরে ইসলামের মর্যাদা জাগ্রত ছিল।
***
নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর বেশ কদিন পর। সুলতান আইউবী নিজ কক্ষে পায়চারী করছেন। কক্ষে বসে কথা বলছেন মোস্তফা জুদাত।
মোস্তফা জুদাত একজন ঊর্ধ্বতন তুর্কী সেনা অফিসার। নুরুদ্দীন জঙ্গীর সেনাবাহিনীতে তিনি মিনজানীকের কমান্ডার ছিলেন। জঙ্গীর ওফাতের পর ইসলামী দুনিয়ায় তিনি যে ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন, তা তাকে কাঁপিয়ে তুলেছে। তিনি এই বলে ছুটি নিয়ে এসেছেন যে, বাড়ি গিয়েছি কয়েক বছর হয়ে গেল; এবার একটু বাড়ি যাওয়া দরকার। দামেস্ক থেকে রওনা হয়ে তিনি কায়রোতে সুলতান আইউবীর নিকট চলে আসেন। মোস্তফা জুদাত সেই অফিসারদের একজন, যারা আগে মুসলমান পরে অফিসার। তিনি জানতেন, নুরুদ্দীন জঙ্গীর পর সুলতান আইউবীই ইসলামের মর্যাদা সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম এবং করবেনও। তার আশংকা ছিল, সুলতান আইউবী এদিককার খবর হয়ত জানেন না, তাই তাকে তিনি দামেস্কের কারগুজারী শুনাতে এসেছেন।
.. আর ফৌজ কি অবস্থায় আছে? সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করেন।
মহামান্য জঙ্গী ফৌজের মধ্যে যে জযবা সৃষ্টি করেছিলেন, তা অটুট আছে- মোস্তফা জুদাত জবাব দেন। কিন্তু এই জযবা বেশীক্ষণ টিকবে না। আপনি জানেন, খৃস্টানদের সয়লাব শুধু সেনাবাহিনীই রোধ করে রেখেছে। মাননীয় জঙ্গীর জীবদ্দশায় কার্যত সেনাবাহিনীই দেশ শাসন করত। যুদ্ধ পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীরই হাতে ছিল। কিন্তু সেই পদক্ষেপ ছিল খেলাফতের অপছন্দনীয় ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী। এখন আমরা খেলাফতের অনুগত। আমরা এখন নিজেদের মত করে কোন পদক্ষেপ নিতে পারি না। খলীফা যদি কোন যুদ্ধ পরিকল্পনা হাতে না নেন, তাহলে সেনাবাহিনীর কিছুই করার নেই। জাতীয় ও ধর্মীয় স্বার্থে লড়াই করার ও জীবন দেয়ার মত আত্মমর্যাদাবোধ মুসলিম আমীরদের মধ্যে নেই। আমীরদের জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনাবোধ খৃস্টানরা ক্রয় করে নিয়েছে। এবার তারা আমাদের সেনাপতিদের ক্রয় করার অভিযানে নেমেছে। তাদের এই ধ্বংসাত্মক তৎপরতা ফৌজ ও জনগণ উভয় ক্ষেত্রেই শুরু হয়ে গেছে। এই অপতৎপরতা যদি অতিদ্রুত প্রতিহত করা না যায়, তাহলে খৃস্টানরা যুদ্ধ ছাড়াই সালতানাত ইসলামিয়ার মালিক হয়ে যাবে। আমাদের সালতানাতে ইসলামী জায়গীর-জমিদারীতে বিভক্ত হয়ে গেছে। আমীরদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়। তারা মদে আকণ্ঠ ডুবে গেছে। খৃস্টানরা ওখানে নারীর ফাঁদ ছড়িয়ে দিয়েছে। আপনি শুনে অবাক হবেন যে, এই মেয়েরা আমাদের আমীরদের হেরেমে অবস্থান করছে। তারা হেরেমে বিনোদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। সেই অনুষ্ঠানে আমাদের সেনাঅফিসারদের নিমন্ত্রণ করে তাদেরকে বেহায়াপনার ফাঁদে আটক করছে।
