***
নূরুদ্দীন জঙ্গী রেজনাল্ট ও অন্যান্য খৃস্টান বন্দীদেরকে কার্ক নিয়ে যান। সুলতান আইউবী নুরুদ্দীন জঙ্গী থেকে বিদায় নিয়ে কায়রো ফিরে যান। নুরুদ্দীন জঙ্গীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎই যে তার শেষ সাক্ষাৎ, সুলতান আইউবী তা কল্পনাও করেননি। নুরুদ্দীন জঙ্গী রেজনাল্টের ন্যায় মূল্যবান কয়েদীকে কঠিন শর্ত আদায় না করে মুক্ত করবেন না, এই আনন্দ নিয়েই তিনি কায়রো ফেরেন। জঙ্গীও মনে মনে পরিকল্পনা একটা স্থির করে রেখেছেন নিশ্চয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন।
১১৭৪ সালের শুরুর দিক। বাগদাদের একটি এলাকায় প্রচণ্ড ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তাতে ছয়-সাতটি জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়। রাজধানী বাগদাদের কিছু ক্ষতি হয়। ঐতিহাসিকগণ এই ভূমিকম্পকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ভূকম্পন বলে অভিহিত করেছেন।
দেশের জনসাধারণের প্রতি নুরুদ্দীন জঙ্গীর এত আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা ছিল যে, দূরে বসে দুর্গতদের সাহায্যের নির্দেশ না পাঠিয়ে তিনি স্বয়ং কার্ক ত্যাগ করে ছুটে যান। দুর্গত জনতার সেবা তিনি নিজ হাতে করতে চান। তিনি কার্ক থেকে রেজল্ট ও অন্য কয়েদীদের সঙ্গে করে নিয়ে যান।
নুরুদ্দীন জঙ্গী বাগদাদ পৌঁছে সর্বপ্রথম ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের প্রতি মনোনিবেশ করেন। দারুল খেলাফতের বাইরে সময় কাটাতে শুরু করেন তিনি। তিনি হৃদয়-মন দিয়ে দুর্গত মানুষদের সেবা-শুশ্রূষা করে যাচ্ছেন। যেখানে রাত হচ্ছে, সেখানেই তিনি অবস্থান করছেন। নিজের নিরাপত্তার কথা তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন। খাবার কোত্থেকে আসছে, রান্না কে করছে, তার প্রতি তিনি কোনই ভ্রূক্ষেপ করছেন না।
এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ দুর্গত সব মানুষের পুনর্বাসনের কাজ সমাপ্ত হয়। টানা ব্যস্ততা থেকে তিনি অবসর হন। ডাক্তারকে বললেন, আমার গলায় কিসের যেন একটা ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। ডাক্তার ওষুধ প্রয়োগ করেন। কিন্তু কণ্ঠনালীর জ্বালা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ডাক্তার নানাভাবে চিকিৎসা করেন; কিন্তু সুলতান জঙ্গীর অবস্থা খারাপ হতে হতে এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়ায় যে, এখন আর তিনি কথাই বলতে পারছেন না। অবশেষে ১১৭৪ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়ে যান। হাসান বিন সাব্বাহর ফেদায়ী গোষ্ঠী খাদ্যে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীকে।
নুরুদ্দীন জঙ্গী মৃত্যুর সময় কোন অসিয়ত করে যেতে পারেননি। সুলতান আইউবীর জন্য কোন পয়গামও রেখে যেতে পারেননি। সুলতান আইউবী যখন সংবাদ পান, ততক্ষণে জঙ্গীর দাফন সম্পন্ন হয়ে গেছে।
পরদিনই বাগদাদ থেকে এক দূত সংবাদ নিয়ে আসে, নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে মওসেল, হালব ও দামেস্কের আমীরগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সুলতান আইউবী এ সংবাদও পান যে, বাগদাদের আমীর-উজীরগণ নুরুদ্দীন জঙ্গীর এগার বছর বয়সের পুত্র আল মালিকু সালিহকে সালতানাতে ইসলামিয়ার খলীফা নিযুক্ত করেছেন। সুলতান বুঝে ফেললেন, আমীরগণ এই নাবালক খলীফাকে কোন্ পথে পরিচালিত করবে এবং কোন্ কূপের পানি পান করাবে।
সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে ডেকে বললেন– পাঁচ মাস আগে তুমি আমাকে সংবাদ দিয়েছিলে যে, আক্ৰায় তোমার একজন গোয়েন্দা শহীদ হয়েছে, একজন ধরা পড়েছে। তখনই আমার মন বলছিল এবং অনুভূত হচ্ছিল যে, এই বছরটা ইসলামী দুনিয়ার জন্য শুভ হবে না।… বস আলী! আমার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শোন। এখন থেকে আমাদেরকে আমাদের ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
৩.৫ দুর্যোগের ঘনঘটা
দুর্যোগের ঘনঘটা
১১৭৪ সালের মে মাস। সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী মৃত্যুবরণ করলেন এই মাসের কোন একদিন। এটি ইসলামের ইতিহাসের একটি অন্ধকার দিন। নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃতদেহকে এখনো গোসলও দেয়া হয়নি। তার আগেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বেশকিছু মানুষের চেহারা। এরা খৃস্টান নয়। কথাটা এভাবেও বলা যায় যে, নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুতে যারা আনন্দিত হয়েছিল, তারা শুধু খৃস্টানই ছিল না, তাদের মধ্যে এমন কতিপয় মুসলমানও ছিল, যাদের আনন্দ ছিল খৃস্টানদের অপেক্ষা বেশী। এরা মুসলিম রিয়াসত ও জমিদারির আমীর-শাসক। জঙ্গীর মৃত্যু সংবাদ শোনামাত্র এরা সকলেই জঙ্গীর বাসভবনে ছুটে এসেছে। এসেছে জঙ্গীর জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য। তাদের মধ্যে কতিপয়কে এমন অস্থির দেখাচ্ছিল, যেন তারা জঙ্গীর মৃত্যুতে শোকাহত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের অস্থিরতা ছিল জঙ্গীকে দ্রুত সন্ধ্যার আগেই দাফন করার জন্য। তাদের তর সইছে না।
জঙ্গীর মৃত্যুতে তারা সকলেই সমবেত হয়েছে। এদিক থেকে তারা ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু তাদের হৃদয় শতধা-বিভক্ত। একজন অপরজনকে সন্দেহের চোখে দেখছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। তাদের ধর্ম এক, আল্লাহ এক, রসূল এক, কুরআন এক, দুমশনও এক। কিন্তু অন্তর তাদের একটি থেকে অপরটি আলাদা। তাদের দৃষ্টান্ত কোন গাছের এমন কতগুলো ডালের ন্যায়, যেগুলো গাছ থেকে ভেঙ্গে আলাদা হয়ে পড়ে গছে।
যুগটা ছিল মূলত নবাবী ও জামিদারীর। কিছু মুসলিম রিয়াসত সামান্য বিস্তৃত হলেও অন্যগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। তাদের শাসকদেরকে আমীর বলা হত। তারা ছিল কেন্দ্রীয় খেলাফতের অধীন। ইসলামের কোন দুশমনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে এই আমীরগণ খেলাফতকে আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা দিত। কিন্তু এই সাহায্য শুধুমাত্র সাহায্য পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। তাতে কোন জাতীয় চেতনা ছিল না। তারা জমিদারী টিকিয়ে রাখার জন্য খেলাফতের দাবি পূরণ করত। আবার সেই একই লক্ষ্যে ইসলামের একমাত্র দুশমন খৃস্টানদের সঙ্গে তলে তলে বন্ধুত্ব গড়ে তুলত। তাদের কেউ কেউ গোপনে খৃস্টানদের সঙ্গে চুক্তিও করে রেখেছিল। কিন্তু নুরুদ্দীন জঙ্গীর অস্তিত্ব খৃস্টানদের অগ্রগতির পথে বিরাট এক প্রতিবন্ধক ছিল। তিনি এই মুসলিম আমীরদেরকে বহুবার সতর্কও করেছিলেন। তাদেরকে একথা বুঝাবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন যে, খৃস্টানরা তোমাদেরকে ইসলামী ঐক্য থেকে সরিয়ে নিয়ে হজম করে ফেলবে। কিন্তু খৃস্টানদের পরিবেশিত ইউরোপীয় মদ, সুন্দরী নারী আর চকচকে সোনার টুকরোর মধ্যে এতই শক্তি ছিল যে, এগুলো তাদের কানে তুলা ও বিবেকে অর্গল এঁটে দিয়েছিল। জঙ্গীর আহ্বান পাথরের সঙ্গে টক্কর খেয়ে ফিরেই আসে শুধু।
